https://www.a1news24.com
২৬শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১২:১৬

পতিত জলাবদ্ধ জমিতে কৃষকের স্বপ্ন

নিজস্ব প্রতিনিধি : সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলায় কৃষকদের মাঝে বৃদ্ধি পেয়েছে মৌসুমি পানিফল (স্থানীয় ভাষায় ‘পানি সিঙ্গারা’ নামে পরিচিত) চাষে। এরই মধ্যে লাভজনক এই ফল চাষ করে পরিবারের সুদিন ফিরেছে প্রায় দুই শতাধিক প্রান্তিক চাষির। উপজেলার জলাবদ্ধ পতিত জমিতে এখন শোভা পাচ্ছে পানিফলের গাছ।

পাশর্^বর্তী জেলাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে প্রতিদিন ভোরে মৌসুমী ব্যবসায়ীরা যাত্রীবাহি বাস, ইজিবাইকের মাধ্যমে এই পানিফল বিক্রির জন্য নিচ্ছেন সাতক্ষীরা সদর, যশোর, বাগেরহাট, খুলনা, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন বাজার গুলিতে। এছাড়া কলারোয়া পৌরসদরের মুরারীকটি থেকে যুগিবাড়ী পর্যন্ত সাতক্ষীরা-ঢাকা মাহাসড়কের দুইপাশে সারিবদ্ধভাবে পানিফল বিক্রি করছে স্থানীয় কৃষকরা।

খোঁজনিয়ে জানাগেছে, বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি পানিফল প্রকারভেদে বিক্রি হচ্ছে ৪০/৪৫ টাকা। এদিকে ডোবা আর বদ্ধ জলাশয়, পতিত জমিতে পানিফল চাষ করে পরিবারের সুদিন ফিরেছে উপজেলার প্রায় দুই শতাধিক হতদরিদ্র কৃষকের। স্থানীয় কৃষকদের জানান, কলারোয়ায় প্রথম বাণিজ্যিকভাবে পানিফল চাষ শুরু হয়। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় দিনে দিনে এই চাষে আগ্রহী হচ্ছেন দরিদ্র প্রান্তিক কৃষকরা। বৃদ্ধি পাচ্ছে আবাদের এলাকা। কৃষকদের দাবি, কলারোয়ায় পানিফল চাষে সফলতা পাওয়ায় দেশের অন্যান্য উপজেলার চাষিরা অনুপ্রাণিত হয়ে এমনকি অনেকে সরজমিনে এসে চাষাবাদ পদ্ধতি শিখে তাদের পতিত জমিতে চাষ শুরু করছেন।

এদিকে কলারোয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম এনামুল ইসলাম আমাদের সময়কে বলেন, পানিফল একটি বর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। পানিফলের পুষ্টিরমান অনেক বেশি। চলতি বছর প্রায় ৪২ হেক্টরেও বেশি পতিত জমিতে পানিফল চাষ হয়েছে। মুলত কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় এ ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছে এখানকার কৃষকেরা। যার কারনে আবাদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে পানিফলের চাষ। তিনি আরও বলেন, প্রতিবছর বোরো ধান কাটার পর, জলাবদ্ধ পতিত জমি, পানি জমে থাকা ডোবাসহ খাল-বিলে এই ফলের লতা রোপণ করা হয় (জমে থাকা পানিতে)। তিন থেকে সাড়ে তিন মাসের মধ্যে গাছে ফল আসে। এ ফল চাষে সার-কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না।

কলারোয়া পৌরসদরের মুরারীকাটি গ্রামের পানিফল চাষী রেজাউল ও আবু হাসান জানান, অল্প খরচে অধিক লাভ হওয়ায় দিন দিন বাড়ছে পানি ফলের চাষ। সুস্বাদু এ ফলটি জলাবদ্ধ এলাকায় পতিত জমিতে খুব সহজেই চাষ করা যায়। এছাড়া অল্প খরচ করে উৎপাদন বেশি ও লাভজনক হওয়ায় পানি ফলের চাষে ঝুঁকছে এখানকার চাষীরা। তারা বলেন, ফলটি বাজারে তৈরি সিঙ্গারার মতো দেখতে হওয়ায় স্থানীয় ভাষায় ‘পানি সিঙ্গারা’ নামেই পরিচিত হয়ে উঠেছে।

উপজেলার যুগিবাড়ী গ্রামের পানিফল চাষী আব্দুর রাজ্জাক, আমিনুরসহ কয়েক কৃষক বলেন, ১৫ বছর ধরে কলারোয়া পৌর সদরের গোপিনাথপুর ও যুগিবাড়ী এলাকায় পতিত ও জলাবদ্ধ জমিতে পানিফল চাষ করে আসছেন। পানি ফলে সার কীটনাশকের তেমন প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য ফসলের থেকে এর পরিচর্যাও কম করতে হয়। এছাড়া অল্প খরচে লাভ বেশী। খেতেও সুস্বাদু।

কৃষক আবু হাসান বলেন, এবছর তাঁর ৮বিঘা জমিতে পানিফল চাষে খরচ হয়েছে প্রায় ৯৬ হাজার টাকা। এরইমধ্যে পানিফল তোলা শুরু হয়েছে। আশা করছি এবছর ৮বিঘা জমিতে প্রায় ২ লাখ ৫০হাজার টাকা ফল বিক্রয় হবে। তিনি আরও বলেন, গত মৌসুমে ৫ বিঘা জমিতে খরচ বাদে পানিফল চাষ করে প্রায় ৯০ হাজার টাকা লাভ করেছি। এবার ফলন ও বাজারমূল্য দুটোয় ভালো। তাই গতবারের চেয়ে বেশি লাভের আশা করছি।

এদিকে পানিফল চাষী মুনসুর আলী, নাজির গাজী, আব্দুল মাজেদসহ অধিকাংশ কৃষকরা জানান, সরকারি-বেসরকারি খাত থেকে ঋণ সহায়তা পেলে আরো অনেক প্রান্তিক কৃষকরা পানিফল চাষের সুযোগ পাবে। ফলে একদিকে নিজেরা যেমন স্বাবলম্বী হতে পারবে ঠিক তেমনই গ্রামীণ অর্থনীতিতেও অবদান রাখা সম্ভব হবে এমনটাই দাবি করেন এসব কৃষকেরা।

কলারোয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা এস এম এনামুল ইসলাম জানান, বর্তমানে পানিফল কৃষিতে নতুন এক সম্ভাবনাময় ফসল। আমাদের কৃষি বিভাগ সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে পানিফল চাষের বিস্তার ঘটাতে। যে কোন পতিত পুকুর, ডোবা অথবা জলাশয়ে পানিফল চাষ করা সম্ভব। তুলনামূলক এর উৎপাদন খরচ কম। তিনি বলেন, চলিত বছর প্রায় প্রায় ৪২ হেক্টর জমিতে পানিফল চাষ করা হয়েছে। যা আগামী বছর বৃদ্ধি পেয়ে আরো বেশি জমিতে চাষ হবে বলে তিনি মনে করেন। অন্যান্য ফসলের থেকে পানিফল চাষে দ্বিগুণেরও বেশি লাভ হচ্ছে। ফলে স্থানীয় কৃষকদের মাঝে এই ফল চাষে আগ্রহ দিন দিন বেড়েই চলেছে।

আরো..