আজ সোমবার সকাল ১১টায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের মাওলানা মোহাম্মদ আকরাম খাঁ মিলনায়তনে ‘রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা পরিষদ’-এর উদ্যোগে ‘রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় পাটকল চালুর দাবিতে সুনির্দিষ্ট প্রস্তাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়।সভায় সভাপতিত্ব করেন জহিরুল ইসলাম এবং সঞ্চালনা করেন সত্যজিৎ বিশ্বাস।
মতবিনিময় সভায় বক্তব্য রাখেন আমিন জুট মিলসের শ্রমিক প্রতিনিধি মো. হানিফ, জে.জে.আই. জুট মিলসের শ্যামল শাফরিন, প্লাটিনাম জুট মিলসের নুর ইসলাম, দৌলতপুর জুট মিলসের নুর মো., খুলনার সংগঠক ও ছাত্র প্রতিনিধি আল আমিন, লতিফ বাওয়ানী জুট মিলসের সিরাজুল ইসলাম, করিম জুট মিলসের গোফরান মিয়া, শ্রমিক-কর্মচারী সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক শামীম ইমাম, স্কপ-এর প্রতিনিধি এ.এম.এম. ফয়েজ হোসেন, জাতীয় মুক্তি কাউন্সিল এর সভাপতি ফয়জুল হাকিম লালা, বাংলাদেশ কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আব্দুল্লাহ কাফি রতন, শ্রমজীবী ও হকার সমিতি সভাপতি, বাচ্চু ভূঁইয়া, শিক্ষক ও গবেষক ড. মাহা মির্জা এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।
বক্তারা রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ অবিলম্বে বন্ধ করার আহ্বান জানান।
বক্তারা বলেন, আশির দশকের বিরাষ্ট্রীয়করণের ধারাবাহিকতায় ২০২০ সালে ফ্যাসিবাদী আওয়ামী লীগ সরকার অবশিষ্ট রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোর উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেই গণবিরোধী সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা বজায় রাখে। বর্তমান বিএনপি সরকারও পূর্ববর্তী শাসকদের নীতি অনুসরণ করে দ্রুত রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো বেসরকারীকরণের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।
বক্তারা আরও বলেন, বর্তমান সরকার নির্বাচনী ইশতেহারে পাটকল ও চিনিকল পুনরায় চালুর লক্ষ্যে একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু দায়িত্ব গ্রহণের পর পাট ও বস্ত্রমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা সেই অঙ্গীকার বাস্তবায়ন করেননি। টাস্কফোর্স গঠন না করেই ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলসহ মোট ৪৪টি শিল্পকারখানা ব্যক্তিমালিকানায় হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে ১৪টি পাটকল ৩০ বছরের জন্য লিজ বা ইজারা দেওয়া হয়েছে।
বক্তারা বলেন, ব্যক্তিমালিকানায় লিজ দেওয়ার ফলে কর্মসংস্থান মারাত্মকভাবে সংকুচিত হয়েছে। উদাহরণ হিসেবে দৌলতপুর জুট মিলে আগে ২,২৮২ জন শ্রমিক কর্মরত থাকলেও বর্তমানে সেই সংখ্যা প্রায় ২০০ জনে নেমে এসেছে। একই সঙ্গে শ্রমিকদের দৈনিক মাত্র ২৫০–৩৫০ টাকা মজুরি দেওয়া হচ্ছে, যা বর্তমান বাজারদরে ন্যূনতম জীবনধারণের জন্যও অপ্রতুল। এছাড়া অনেক ক্ষেত্রে পাটকলের নামে লিজ নিয়ে পাটপণ্য উৎপাদনের পরিবর্তে অন্য পণ্য উৎপাদন কিংবা গুদাম হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
সভায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল রক্ষা পরিষদ নিম্নলিখিত দাবি ও প্রস্তাবনা উপস্থাপন করে—
১. চলমান বেসরকারীকরণ নীতি স্থগিত করতে হবে এবং আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান সরকারের আমলে দেওয়া সব লিজ চুক্তি পর্যালোচনা করে দুর্নীতির অভিযোগের তদন্ত করতে হবে।
২. পেশাদার টেক্সটাইল ইঞ্জিনিয়ার, পাট বিজ্ঞানী, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ী এবং শ্রমিক প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে অবিলম্বে একটি টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
৩. ‘পণ্যে পাটজাত মোড়কের বাধ্যতামূলক ব্যবহার আইন, ২০১০’ শতভাগ কার্যকর করতে হবে।
৪. বন্ধ ও রুগ্ন পাটকলগুলোর আধুনিকায়ন (BMRE)-এর জন্য বিশেষ প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হবে। প্রস্তাবনায় উল্লেখ করা হয়, চট্টগ্রামের আমিন জুট মিলের মতো বৃহৎ কারখানাগুলোতে মাত্র ১০০–১১০ কোটি টাকা বিনিয়োগের মাধ্যমে আধুনিক ও উচ্চ উৎপাদনশীল যন্ত্রপাতি স্থাপন করে পুনরায় উৎপাদন শুরু করা সম্ভব।
বক্তারা হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনায় রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল পুনরায় চালুর জন্য সরকার যদি দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করে, তবে পাটশিল্পাঞ্চলের শ্রমিক, কৃষক ও সাধারণ মানুষকে সঙ্গে নিয়ে দেশব্যাপী বৃহত্তর আন্দোলন গড়ে তোলা হবে।