https://www.a1news24.com
২৯শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭:২৬

পারিবারিক সহিংসতা: নীরব এক মহামারি

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: পরিবার মানুষের প্রথম বিদ্যালয়, প্রথম আশ্রয় এবং নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় ঠিকানা। কিন্তু সেই পরিবারই যখন ভয়, নির্যাতন ও সহিংসতার কেন্দ্র হয়ে ওঠে, তখন তা শুধু একজন ব্যক্তির নয়, পুরো সমাজের জন্য উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। পারিবারিক সহিংসতা আজ আমাদের সমাজের এমন এক নীরব মহামারি, যা অনেক সময় চার দেয়ালের আড়ালে থেকে যায়। ভুক্তভোগীরা লজ্জা, সামাজিক ভয় কিংবা অর্থনৈতিক নির্ভরতার কারণে মুখ খুলতে পারেন না। ফলে নির্যাতন চলতেই থাকে, আর ক্ষত গভীর থেকে গভীরতর হয়।

পারিবারিক সহিংসতা বলতে শুধু শারীরিক নির্যাতনকে বোঝায় না। মানসিক, মৌখিক, যৌন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনও এর অন্তর্ভুক্ত। অনেক সময় একজন স্বামী স্ত্রীর ওপর শারীরিক নির্যাতন করেন, আবার অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীও স্বামীর প্রতি মানসিক নির্যাতন চালাতে পারেন। সন্তানদের প্রতি বাবা-মায়ের অযৌক্তিক কঠোরতা, বয়স্ক বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা কিংবা পুত্রবধূর ওপর শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের অমানবিক আচরণ—এসবও পারিবারিক সহিংসতার বিভিন্ন রূপ।

বাংলাদেশের সমাজে পারিবারিক সহিংসতার অন্যতম কারণ হলো পিতৃতান্ত্রিক মানসিকতা। অনেকেই মনে করেন, পরিবারের কর্তৃত্ব মানেই কঠোরতা বা শাস্তি দেওয়ার অধিকার। নারীদের সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাকে সীমাবদ্ধ করা, তাদের মতামতকে গুরুত্ব না দেওয়া কিংবা তাদের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করাকে অনেকেই স্বাভাবিক বলে ধরে নেন। এই ভুল ধারণা থেকেই বহু নির্যাতনের জন্ম হয়।

অর্থনৈতিক সংকটও পারিবারিক সহিংসতার একটি বড় কারণ। বেকারত্ব, দারিদ্র্য, ঋণের চাপ কিংবা সংসারের ব্যয় নির্বাহের অক্ষমতা পরিবারে মানসিক চাপ সৃষ্টি করে। সেই চাপ অনেক সময় রাগ ও হতাশার রূপ নিয়ে পরিবারের দুর্বল সদস্যদের ওপর ঝরে পড়ে। তবে অর্থনৈতিক স্বচ্ছলতা থাকলেই যে সহিংসতা থাকবে না, এমন নয়। উচ্চবিত্ত পরিবারেও মানসিক নির্যাতন, অপমান, হুমকি কিংবা নিয়ন্ত্রণমূলক আচরণ নীরবে চলতে দেখা যায়।

মাদকাসক্তি ও জুয়ার মতো সামাজিক ব্যাধিও পারিবারিক সহিংসতার অন্যতম উৎস। মাদক গ্রহণের পর অনেকেই আত্মনিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেন এবং পরিবারের সদস্যদের ওপর আক্রমণাত্মক আচরণ করেন। এতে শুধু পারিবারিক শান্তিই নষ্ট হয় না, শিশুদের মানসিক বিকাশও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

পারিবারিক সহিংসতার সবচেয়ে ভয়াবহ প্রভাব পড়ে শিশুদের ওপর। যে শিশু প্রতিদিন বাবা-মায়ের ঝগড়া, মারধর কিংবা অপমান প্রত্যক্ষ করে, তার মনে ভয়, উদ্বেগ ও অনিরাপত্তা তৈরি হয়। পড়াশোনায় অমনোযোগ, আত্মবিশ্বাসের অভাব, বিষণ্নতা এবং আক্রমণাত্মক আচরণ তাদের মধ্যে দেখা দিতে পারে। অনেক গবেষণায় দেখা গেছে, সহিংস পরিবেশে বেড়ে ওঠা শিশুরা বড় হয়ে নিজেরাও সহিংস আচরণকে স্বাভাবিক বলে মনে করতে পারে। ফলে এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সহিংসতার সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে।

নারীরা পারিবারিক সহিংসতার প্রধান শিকার হলেও পুরুষ এবং বয়স্ক ব্যক্তিরাও কখনো কখনো নির্যাতনের শিকার হন। তাই বিষয়টিকে কেবল নারী-পুরুষের দ্বন্দ্ব হিসেবে না দেখে মানবিক ও সামাজিক সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করা জরুরি। নির্যাতনের শিকার যে-ই হোক, তার নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব।

পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইনের কার্যকর প্রয়োগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশে পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধে আইন রয়েছে। তবে অনেক ক্ষেত্রে ভুক্তভোগীরা আইনের আশ্রয় নিতে ভয় পান অথবা সামাজিক চাপের কারণে অভিযোগ দায়ের করেন না। তাই আইনি সহায়তার পাশাপাশি তাদের মানসিক সহায়তা, নিরাপদ আশ্রয় এবং পুনর্বাসনের ব্যবস্থাও জোরদার করতে হবে।

সচেতনতা বৃদ্ধিও অত্যন্ত জরুরি। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম এবং সামাজিক সংগঠনগুলোকে পারিবারিক সহিংসতার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলতে আরও সক্রিয় হতে হবে। ইসলামের শিক্ষাসহ সব ধর্মেই পারিবারিক সম্পর্কের ভিত্তি হিসেবে ভালোবাসা, দয়া, পারস্পরিক সম্মান এবং সহমর্মিতার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। তাই ধর্মীয় মূল্যবোধের সঠিক চর্চাও সহিংসতা কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।

পরিবারে মতবিরোধ হওয়া অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু মতবিরোধের সমাধান কখনোই সহিংসতার মাধ্যমে হতে পারে না। ধৈর্য, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, খোলামেলা আলোচনা এবং ক্ষমাশীল মনোভাব একটি সুস্থ পরিবারের ভিত্তি গড়ে তোলে। রাগের মুহূর্তে সংযম প্রদর্শন এবং প্রয়োজনে পারিবারিক কাউন্সেলিং গ্রহণ করাও অনেক সংকটের সমাধান করতে পারে।

একটি সভ্য সমাজ গড়তে হলে প্রতিটি পরিবারকে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ করে তুলতে হবে। যে ঘরে ভালোবাসা, সম্মান এবং পারস্পরিক আস্থা থাকে, সেই ঘর থেকেই গড়ে ওঠে একজন সুস্থ, সচেতন ও মানবিক নাগরিক। আর যে পরিবারে সহিংসতা বাসা বাঁধে, সেখানে শুধু একজন মানুষ নয়, পুরো সমাজই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

অতএব, পারিবারিক সহিংসতাকে ব্যক্তিগত বিষয় বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি একটি জাতীয় ও সামাজিক সমস্যা। এর বিরুদ্ধে পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং গণমাধ্যম—সবার সম্মিলিত উদ্যোগ প্রয়োজন। মনে রাখতে হবে, একটি নিরাপদ পরিবারই একটি নিরাপদ সমাজের ভিত্তি। তাই আসুন, নীরবতা ভেঙে সহিংসতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হই এবং ভালোবাসা, সহমর্মিতা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে মানবিক পরিবার ও সুন্দর সমাজ গঠনে প্রত্যেকে নিজের অবস্থান থেকে ভূমিকা রাখি।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক
দৈনিক সিলেটের ডাক

আরো..