মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: মানুষের জীবনে দুঃখ, কষ্ট, হতাশা কিংবা মন খারাপ হওয়া স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু যখন এই মন খারাপ দীর্ঘস্থায়ী হয়, জীবনের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে যায়, নিজেকে অসহায় মনে হয় এবং প্রতিদিনের স্বাভাবিক কাজগুলোও কঠিন হয়ে দাঁড়ায়—তখন সেটি আর সাধারণ দুঃখ থাকে না; সেটি হয়ে ওঠে বিষণ্ননতা। আধুনিক বিশ্বে বিষণ্ননতা এমন এক নীরব ব্যাধি, যা ধীরে ধীরে মানুষের মন, শরীর ও জীবনকে গ্রাস করে। এ কারণেই একে অনেকেই “নীরব মরণব্যাধি” বলে অভিহিত করেন।
বর্তমান যুগে মানুষের জীবনযাত্রা যত আধুনিক হচ্ছে, ততই বাড়ছে মানসিক চাপ, প্রতিযোগিতা ও একাকীত্ব। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের জীবনকে সহজ করলেও মানুষের মনকে করেছে আরও নিঃসঙ্গ। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাসিমুখের আড়ালে লুকিয়ে থাকে অসংখ্য কষ্টের গল্প। মানুষ এখন নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে ভয় পায়, কারণ সমাজ এখনও মানসিক রোগকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে শেখেনি। ফলে বিষণ্ননতায় আক্রান্ত ব্যক্তি নীরবে কষ্ট সহ্য করতে থাকে।
বিষণ্ননতার কারণ নানা রকম হতে পারে। পারিবারিক অশান্তি, অর্থনৈতিক সংকট, সম্পর্কের ভাঙন, প্রিয়জন হারানো, চাকরির অনিশ্চয়তা, পরীক্ষার চাপ কিংবা ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ—সবকিছুই একজন মানুষকে ধীরে ধীরে বিষণ্ননতার দিকে ঠেলে দিতে পারে। অনেক সময় জেনেটিক কারণেও বিষণ্ননতা দেখা দেয়। আবার দীর্ঘদিনের শারীরিক অসুস্থতা থেকেও মানুষ হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়তে পারে।
বিষণ্ননতার সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো, এটি মানুষের জীবনীশক্তিকে ধ্বংস করে দেয়। একজন বিষণ্নন মানুষ ধীরে ধীরে আত্মবিশ্বাস হারিয়ে ফেলে। তার কাছে জীবন অর্থহীন মনে হয়। প্রিয় কাজেও আনন্দ খুঁজে পায় না। ঘুমের সমস্যা, ক্ষুধামন্দা, অতিরিক্ত ক্লান্তি, মনোযোগ কমে যাওয়া, সবসময় নেতিবাচক চিন্তা—এসব বিষণ্ননতার সাধারণ লক্ষণ। অনেক সময় রোগী নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার চিন্তাও করতে শুরু করে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতি বছর অসংখ্য মানুষ আত্মহত্যার মাধ্যমে প্রাণ হারায়, যার বড় একটি কারণ বিষণ্ননতা।
বাংলাদেশেও বিষণ্ননতা ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। বিশেষ করে তরুণ সমাজ এর শিকার বেশি হচ্ছে। শিক্ষার্থীদের ওপর অতিরিক্ত পড়াশোনার চাপ, চাকরির অনিশ্চয়তা, পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশা—সব মিলিয়ে তারা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হলো, অধিকাংশ পরিবার এখনও বিষয়টিকে গুরুত্ব দেয় না। কেউ মানসিক কষ্টের কথা বললে তাকে দুর্বল মনে করা হয়। অনেকেই বলে, “এগুলো শুধু মনগড়া চিন্তা” কিংবা “ইচ্ছাশক্তি বাড়ালেই ঠিক হয়ে যাবে।” অথচ বিষণ্ননতা কোনো দুর্বলতা নয়; এটি একটি গুরুতর মানসিক রোগ।
একজন বিষণ্নন মানুষ সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অনুভব করে সহানুভূতি ও ভালোবাসার। কিন্তু সমাজ তাকে প্রায়ই অবহেলা করে। পরিবার যদি একজন মানুষের মানসিক অবস্থাকে গুরুত্ব না দেয়, তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে ওঠে। তাই আমাদের প্রথম কাজ হওয়া উচিত বিষণ্ননতাকে রোগ হিসেবে স্বীকার করা এবং আক্রান্ত ব্যক্তির পাশে দাঁড়ানো।
বিষণ্ননতা প্রতিরোধে পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্র—সবাইকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। পরিবারে বন্ধুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে সন্তানরা নিজেদের সমস্যার কথা সহজে বলতে পারে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানো জরুরি। পাশাপাশি কর্মক্ষেত্রেও মানসিক চাপ কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে। গণমাধ্যমকেও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে, যাতে মানুষ বুঝতে পারে মানসিক রোগ লজ্জার কিছু নয়।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের অগ্রগতির ফলে বর্তমানে বিষণ্ননতার কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে। মনোরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ, কাউন্সেলিং, প্রয়োজনীয় ওষুধ এবং পরিবারের সমর্থন একজন মানুষকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনতে পারে। এছাড়া নিয়মিত ব্যায়াম, পর্যাপ্ত ঘুম, সুষম খাদ্য, বই পড়া, প্রার্থনা বা ধ্যান এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখা মানসিক সুস্থতায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক
লেখকঃ প্রাবন্ধিক