https://www.a1news24.com
১৩ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১:০৭

“জমি লিখে দিয়েও শান্তি নেই”—ছেলের বিরুদ্ধে বৃদ্ধ মায়ের মামলা-জিডি-অভিযোগ

কর্ণফুলীতে চাঞ্চল্য

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের কর্ণফুলীতে ছেলের বিরুদ্ধে এক বৃদ্ধ মাকে মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং ভরণ-পোষণ না দেওয়ার অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় ছেলেসহ কয়েকজনকে আসামি করা হয়েছে। এরই মধ্যে প্রধান অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

গত শুক্রবার কর্ণফুলী উপজেলার চরলক্ষ্যা ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের খালেক মেম্বার বাড়ির বাসিন্দা বেগম জান (৬৩) বাদী হয়ে কর্ণফুলী থানায় মামলাটি দায়ের করেন। মামলার নম্বর ১৩/২৩৩। মামলায় অভিযুক্ত করা হয়েছে বেগম জানের ছেলে মো. হাসান (৩৫), পুত্রবধূ সুমি আক্তার (২৯) এবং অজ্ঞাতনামা আরও ৫-৬ জনকে।

মামলায় পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩(৩) ও ৩(৫) এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ১৪৩, ৩২৩, ৩৮০, ৩৫৪, ৩৪৭ ও ৫০৬ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে।

আইন অনুযায়ী, ধারা ৩(৩)-এ সন্তানদের পিতা-মাতার দেখভাল ও একসঙ্গে বসবাস নিশ্চিত করার দায়িত্বের কথা বলা হয়েছে। ধারা ৩(৫) অনুযায়ী, পিতা-মাতার নিয়মিত খোঁজখবর নেওয়া, প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যা নিশ্চিত করা সন্তানের দায়িত্ব। আইন লঙ্ঘন করলে সর্বোচ্চ ১ লাখ টাকা জরিমানা বা অনাদায়ে তিন মাস পর্যন্ত কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে।

অন্যদিকে দণ্ডবিধির ১৪৩ ধারায় বেআইনি সমাবেশ, ৩২৩ ধারায় মারধর, ৩৮০ ধারায় ঘরের ভেতরে চুরি, ৩৫৪ ধারায় নারীর শ্লীলতাহানি, ৩৪৭ ধারায় বেআইনিভাবে আটক করে জোরপূর্বক কিছু আদায়ের চেষ্টা এবং ৫০৬ ধারায় ভয়ভীতি বা হুমকি প্রদানের অভিযোগের বিধান রয়েছে।

মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন কর্ণফুলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীনূর আলম। তিনি জানান, মামলাটি তদন্ত করছেন এসআই জয়নাল আবেদীন। এরই মধ্যে গত ১১ জুন অভিযুক্ত মো. হাসানকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। অপর মামলায় মোহাম্মদ নবীও গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন।

তবে ঘটনাটির পেছনে পারিবারিক বিরোধের বিষয়ও সামনে এসেছে। এর আগে গত ৪ জুন সুমি আক্তার বাদী হয়ে মারধরের অভিযোগে চরলক্ষ্যা এলাকার মোহাম্মদ নবী (২৫), মোহাম্মদ রুবেল (২৭) ও সালমা বেগম (৪৫)-এর বিরুদ্ধে আরেকটি মামলা করেন।

ওই মামলার নম্বর ১১/২২৮। মামলাটি তদন্তও করছেন একই কর্মকর্তা। পুলিশ বলছে, এটি মূলত দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি মামলা। আর মাকে নির্যাতন করে মারধরসহ জমি ভাগাভাগি নিয়ে দ্বন্দ্ব।

স্থানীয় সূত্র জানায়, পারিবারিক সম্পত্তি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। অভিযোগ রয়েছে, বেগম জান তার সম্পত্তির একটি অংশ সন্তানদের নামে লিখে দেওয়ার পরও পারিবারিক কলহ থামেনি।

এর আগে গত ১১ মে, বেগম জান কর্ণফুলী থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়ে দাবি করেন, ছেলে ও পুত্রবধূসহ কয়েকজন তাকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করছেন। অভিযোগে বলা হয়, গত ১০ মে গভীর রাতে তাঁকে ও তাঁর মেয়েকে বসতঘর থেকে বের করে দিয়ে তালা লাগিয়ে দেওয়া হয় এবং মারধর করা হয়।

এরও আগে গত ৪ এপ্রিল, প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ এনে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন বেগম জান। সেখানে ছেলে হাসান, পুত্রবধূ সুমী আক্তার এবং মো. শফির নাম উল্লেখ করা হয়।

এদিকে, বেগম জানের আরেক ছেলের স্ত্রী দেলোয়ারা বেগমও গত ৫ এপ্রিল হাসান ও সুমী আক্তারের বিরুদ্ধে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগে থানায় জিডি করেন। জিডিতে পারিবারিক কলহের জেরে গালিগালাজ, ভয়ভীতি এবং বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার হুমকির অভিযোগ আনা হয়।

স্থানীয় কয়েকজন জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসীর দাবি, সম্পত্তি সংক্রান্ত বিরোধকে কেন্দ্র করেই পরিবারের মধ্যে এই সংঘাত তীব্র হয়েছে। তবে অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

ভুক্তভোগী বেগম জান বলেন, “কোথাও শান্তি পাচ্ছি না। নিজের জমি ভাগ করে দিলাম, তারপরও আমার ভরণ-পোষণ করছে না। উল্টো মারধর ও হুমকি দিচ্ছে। আমি প্রশাসনের সহযোগিতা চাই।”

এ বিষয়ে ওসি শাহীনূর আলম বলেন, অভিযোগ ও জিডিগুলোর বিষয়ে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। দুই পক্ষের দায়ের করা মামলাও গুরুত্বসহকারে তদন্ত করছে পুলিশ।

তিনি আরও বলেন, “মায়ের ওপর নির্যাতনের বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকেও কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। তবে তদন্ত শেষে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

প্রসঙ্গত, গত ৩ জুন রাজধানীর মিরপুরে একটি বাসা থেকে ৭৫ বছর বয়সী এক নারীর মরদেহ উদ্ধারের পর তাঁর সন্তানদের অবহেলার বিষয়টি গণমাধ্যমে এসেছে। এ ঘটনার পর তাঁর ছেলে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (যুগ্ম সচিব) এ কে এম আনিসুর রহমানকে সেই পদ থেকে প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করেছিলেন।

আরো..