জুলাই গণঅভ্যুত্থানের প্রথম শহীদ রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ হত্যার ঘটনায় দুই পুলিশ সদস্যের মৃত্যুদণ্ড বহাল রেখে পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। রোববার (১৪ জুন) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এই রায় প্রকাশ করেন। মৃত্যুদণ্ড পাওয়া দুই আসামি হলেন— পুলিশের এএসআই আমির হোসেন এবং কনস্টেবল সুজন চন্দ্র রায়। রায়ে বাকি আসামিদের যাবজ্জীবনসহ বিভিন্ন মেয়াদে সশ্রম ও বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
একইসঙ্গে চলতি মাসেই ট্রাইব্যুনাল-১ ও ট্রাইব্যুনাল-২ থেকে আরও তিনটি মামলার রায় প্রকাশের সম্ভাবনা রয়েছে। এদিকে আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় দণ্ডিত আসামিপক্ষ রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে একাধিক আইনি ভিত্তি (গ্রাউন্ড) উত্থাপন করেছে। তাদের দাবি, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত সাক্ষ্য ও প্রমাণে আসামিদের সম্পৃক্ততা স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সাক্ষীদের বক্তব্যেও রয়েছে পরস্পরবিরোধিতা।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন সূত্র জানিয়েছে, গত ১১ জুন ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারপতি ও বিচারকগণের স্বাক্ষরিত পূর্ণাঙ্গ রায়ের কপি প্রকাশিত হয়েছে। এই কপি বর্তমানে চিফ প্রসিকিউটরের কার্যালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এখন প্রসিকিউশন বিভাগ রায়ের পূর্ণাঙ্গ কপি বিশ্লেষণ করে সিদ্ধান্ত নেবেন যে, কোনো সাজার বিরুদ্ধে তারা আপিল করবেন কিনা।
গত ৯ এপ্রিল আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এ রায় ঘোষণা করেন। আবু সাঈদ হত্যা মামলার পূর্ণাঙ্গ রায়ে ট্রাইব্যুনাল মানবতাবিরোধী অপরাধের বিভিন্ন আইনি দিক, ট্রাইব্যুনালের এখতিয়ার, আন্তর্জাতিক আইন, সাক্ষ্যপ্রমাণের মূল্যায়ন এবং বিচারপ্রক্রিয়ার ন্যায়সঙ্গতা নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছে। এ ছাড়া মানবতাবিরোধী অপরাধের উপাদান, ব্যক্তিগত ফৌজদারি দায়, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, ওয়াইডস্প্রেড ও সিস্টেমেটিক অ্যাটাক, সিভিলিয়ান জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধ এবং আন্তর্জাতিক বিভিন্ন নজির ও রোম স্ট্যাটিউটের আলোকে বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হয়েছে। রংপুর তাজহাট থানার মামলা নং-৩ (১৯/৮২০২৪) জিআর-১১১/২০২৪-এর বিচার চলাকালে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল আবু সাঈদের মৃত্যু কেবল একটি দুর্ঘটনা নাকি এটি মানবতাবিরোধী অপরাধের অংশ। দীর্ঘ এই রায়ে সেই প্রশ্নসহ সংশ্লিষ্ট সব আইনি বিষয়ের উত্তর দেওয়া হয়েছে।
রায়ে প্রাচীন চীনা প্রবাদ উদ্ধৃত করে ‘Every thousand miles has its first step’ আবু সাঈদের হত্যাকাণ্ডই জুলাই-আগস্টের ঘটনাপ্রবাহে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রথম ধাপ ছিল বলে উল্লেখ করা হয়। শত্রুর জন্যও ‘ইনসাফ প্রতিষ্ঠা’ বা ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার নীতিতে বিশ্বাস রেখে এই রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করা হয়েছে মন্তব্য করা হয়েছে। রায়ে অনুপস্থিত আসামির (Trial in Absentia) বিচার নিয়েও বিস্তৃত আলোচনা করা হয়েছে। ভুক্তভোগীদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতেই বাংলাদেশের আইনে অনুপস্থিত অবস্থায় বিচার চালানোর বিধান রাখা হয়েছে।
সাক্ষ্যপ্রমাণ মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ২৫ জন সাক্ষীর জবানবন্দি, প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিবেদন এবং সংবাদপত্রে প্রকাশিত ৪১টি প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা হয়েছে। রায়ে প্রত্যেক আসামির বিরুদ্ধে পৃথকভাবে সাক্ষ্য ও প্রমাণ বিশ্লেষণ করে দায় নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে কার কী ভূমিকা ছিল তা স্পষ্টভাবে উঠে আসে। সবশেষে ট্রাইব্যুনাল জানায়, এই বিচারপ্রক্রিয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে পরিচালিত হয়েছে এবং রায়ের মাধ্যমে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা হবে বলে তারা আশা প্রকাশ করেন।
২০২৪ সালে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন চলাকালে ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ। দুই হাত ছড়িয়ে পুলিশের সামনে দাঁড়ানো আবু সাঈদের একটি ভিডিও সেসময় সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপক ভাইরাল হয়। তার মৃত্যুতে সারাদেশে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার এক পর্যায়ে কারফিউ জারি করলেও তা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয় সরকার।
এ ঘটনার ২০ দিন পর ২০২৫ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়।
রায়ের অপেক্ষায় আরও ৩ মামলা
জুলাই অভ্যুত্থানের ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের এক মামলায় জাসদ সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী হাসানুল হক ইনুর বিচার শেষ হয়েছে। মামলাটি রায়ের জন্য অপেক্ষমাণ রেখেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফের বিরুদ্ধে করা মামলাটিও বর্তমানে রায়ের অপেক্ষায় রয়েছে। প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, চলতি মাসেই এই মামলা দুটির রায় দিতে পারেন ট্রাইব্যুনাল। এ ছাড়া জুলাই আন্দোলন চলাকালে রাজধানীর রামপুরায় একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণ আমির হোসেনকে গুলি করে আহতসহ দু’জনকে হত্যার ঘটনায় দায়ের করা মামলাটিও যুক্তিতর্ক শেষে চলতি মাসেই রায় দেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান তিনি।
আশুলিয়ায় লাশ পোড়ানোর মামলায় আসামিপক্ষের আপিল
গত ৫ ফেব্রুয়ারি জুলাই গণঅভ্যুত্থান চলাকালে আশুলিয়ায় ৬ জনকে গুলি করে হত্যা এবং তাদের লাশ পোড়ানোর ঘটনায় দায়ের করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক এমপি সাইফুল ইসলামসহ ৬ জনকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন আদালত। ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর মিজানুল ইসলাম বলেন, আশুলিয়ার মামলায় দেওয়া রায়ের বিরুদ্ধে প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে আপিল করার সিদ্ধান্ত হয়নি। তবে রায় ঘোষণার দিন এক আসমির করা অভিযোগসহ কিছু অভিযোগের ব্যাপারে ফ্যাক্টস ফাইন্ডিং কমিটি তদন্ত করছে।
এদিকে মামলার আসামিপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ আবুল হাসান বলেন, তারা যুক্তি দিয়েছে, কথিত ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রয়োজনীয় উপাদান অনুপস্থিত, ঘটনার সময় পুলিশ বাহিনী আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর আওতাভুক্ত ছিল না এবং নিম্নপদস্থ পুলিশ সদস্য হিসেবে আসামিরা বাহিনীর শৃঙ্খলা ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসারেই দায়িত্ব পালন করেছেন, যা কোনো অপরাধ হিসেবে গণ্য হতে পারে না। এসব বিষয় তুলে ধরে মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্ত আসামি আশুলিয়া থানার সাবেক উপ-পরিদর্শক আবদুল মালেক ও সাবেক কনস্টেবল মুকুল চোকদারকে দেওয়া সাজার বিরুদ্ধে আপিল করা হয়েছে। আমরা আশা করি উচ্চ আদালতে ন্যায় বিচার পাব।