https://www.a1news24.com
১০ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৬:৩৮

শরৎকালের সর্ববৃহৎ উৎসব শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা

পিযুষ চক্রবর্তী- ধর্মীয় উৎসব-উদ্দীপনা বাঙালি জনমনে প্রবাহিত হয়ে আসছে যুগ যুগ ধরে। সনাতন ধর্মানুসারীদের প্রাচীন রীতিনীতি অনুসারে বারো মাসে তের পার্বণ ও পূজার পবিত্র অনুষ্ঠান পূর্বাপর পালিত হয়। বর্ষাকালের শেষার্ধেই শ্রীশ্রী দুর্গাপূজার আগন্তুক ভাবনা সনাতনী আবাল-বৃদ্ধ-বণিতাসহ সকলের মধ্যে প্রস্তুতির কড়া নাড়ে। স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও দুর্গাপূজার পবিত্র আগমন এবং সাত্বিক ভাবনা তৈরি হয়। পূজা-পার্বণ ও আনন্ত-উৎসবের আমেজ সকল মানুষকে করে পবিত্র মনোভাবাসম্পন্ন ও উচ্ছ্বাসে মুখরিত। মনের মধ্যে সার্বজনীন মাঙ্গলিক ভাবনা, ইহকালীন ও পরকালীন চিন্তাচেতনা এবং জগতের সকল প্রাণীর সুখ-শান্তি কামনা পূজা-পাবর্ণগুলোতে নিহিত থাকে। পূজা-পার্বণের রীতিনীতি প্রাচীনকাল থেকেই হয়ে আসছে। সংস্কারের মধ্য দিয়ে আচার-অনুষ্ঠানকে মুখরিত করার জন্য গান, কীর্ত্তন, আরতি, ধর্মীয় পালা, গীতা ও চ-ীপাঠ, রামায়ণপাঠ, দেবদেবীর চিত্রাঙ্কনসহ পবিত্র ভাবনায় আনন্দমুখর করা হয়।

পূজায় মেলবন্ধন ও সম্প্রীতি বৃদ্ধি পায়। ঈশ^রের শক্তির মহিমা প্রকাশ পায় দেবদেবীর পূজার্চ্চনার মধ্য দিয়ে। দেবদেবী হচ্ছে সর্বশক্তিমান ঈশ^রের অসীম শক্তির ভিন্ন ভিন্ন রূপ। দেবদেবীকে পূজার্চ্চনার মাধ্যমে সন্তুষ্টি বিধান করা হলে ঈশ^র তুষ্ট হন; এমন ধারণা পোষণ করা হয়।

বছর ঘুরে শরৎ ঋতুর আগমন। সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রাণের উৎসব ও সর্ববৃহৎ পূজা হচ্ছে দুর্গাপূজা। শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীর চরণে পুষ্পাঞ্জলি অর্পণ করবেন সকল ভক্তবৃন্দ এবং আনন্দ-উৎসবে মেতে উঠবেন সবাই।

শাস্ত্রমতে, এবারের দুর্গাপূজার সময় নির্ঘণ্ট হচ্ছে- ২৮ আশি^ন থেকে ৩ কার্তিক পর্যন্ত। প্রথমেই জেনে নেই এবার দেবীর আগমন ঘোটকে এবং ফলম: ছত্রভঙ্গ স্তরঙ্গমে। আর দেবীর গমন নৌকায়; ফলম: শস্যবৃদ্ধি তথা জলবৃদ্ধিচ। ষষ্ঠী পূজা: ২৮ আশি^ন ১৪৩৩ বাংলা, রোজ শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.; মহাসপ্তমী পূজা: ২৯ ও ৩০ আশি^ন ১৪৩৩ বাংলা, রোজ শনিবার ও রবিবার, ১৭ ও ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.; মহাঅষ্টমী পূজা: ১ কার্তিক ১৪৩৩ বাংলা, রোজ সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.; মহানবমী পূজা: ২ কার্তিক ১৪৩৩ বাংলা, রোজ মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.; বিজয়া দশমী: ৩ কার্তিক ১৪৩৩ বাংলা, রোজ বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬ খ্রি.।

সনাতন ধর্মাবলম্বীর বিপুল উল্লাসে পালিত হবে এবারের শারদীয় শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা। দেশের বিভিন্ন জায়গায় পারিবারিকভাবে পূজা উদ্যাপনের পাশাপাশি মন্দিরে মন্দিরে ভক্তদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠবে। এ নিয়ে অন্যরকম আমেজ বিরাজ করছে হিন্দু ধর্মাবলম্বী তরুণ-তরুণী, যুবক-যুবতী, বৃদ্ধ-বৃদ্ধা ও শিশুসহ সকলের মাঝে। পাড়া-মহল্লায় সব জায়গায় সনাতনীদের দৃষ্টি এখন আগন্তুক দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান যার যার, উৎসব ও আনন্দ সবার।

শাস্ত্রমতে, মন্ত্র উচ্চারিত হবে- “সর্ব্বমঙ্গলমঙ্গলে শিবে সর্ব্বার্থ সাধিকে, শরণ্যে ত্র্যম্বকে গৌরী নারায়ণী নমোঃস্তুতে”। শরতের ষষ্ঠী তিথিতে আদ্যাশক্তি দশভূজা মহামায়া দেবলোক থেকে মর্ত্যলোকে আগম করেন। তখন সনাতন ধর্মাবলম্বীরা মহামায়া শ্রীশ্রী দুর্গাদেবীকে আরাধনা, উপাসনা, স্তুতি, ভক্তি ও শ্রদ্ধার মধ্য দিয়ে আত্মনিবেদন করেন দেবীর চরণে। সনাতন ধর্মে যত পূজা প্রচলিত আছে তন্মধ্যে দুর্গাপূজাই জাঁকজমকপূর্ণ ও সার্বজনীনভাবে উচ্ছ্বসিত। মহিষাসুর মর্দিনী শ্রীশ্রী দুর্গাদেবী ভারতীয় উপমহাদেশসহ সারাবিশে^ বহুকাল থেকেই পূজিত হয়ে আসছেন। হিমালয়ের কৈলাশ থেকে দেবী এসে বাংলার সমতল ভূমিতে পূজিত হন প্রতি বছর সনাতন ধর্মাবলম্বী নারী-পুরুষ-শিশু ও আবাল-বৃদ্ধ-বণিতার দ্বারা। দেবী দুর্গা সঙ্গে নিয়ে আসেন গণেশ, কার্তিক, লক্ষ্মী ও সরস্বতীকে।

শাস্ত্রমতে, প্রতি বছর শরৎকালে দেবী দুর্গার আবাহনই মহালয়া হিসেবে পরিচিত। মহালয়ার সময় মন্দিরে মন্দিরে ব্রাহ্মণ কর্তৃক চ-ীপাঠের মাধ্যমে দেবীকে আবাহন করা হয়। মন্দিরে মন্দিরে উচ্চারিত হয়- ‘যা দেবী সর্বভূতেষু মাতৃরূপেন সংস্থিতা, নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমস্তস্যৈ নমোঃ নমোঃ’। ষষ্ঠীপূজার মাধ্যমে শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হলেও মূলত মহালয়া থেকেই দুর্গামায়ের আগমন ঘটে। শাস্ত্রীয় বিধান মতে, মহালয়ার দুটি পর্ব রয়েছে। একটি পিতৃপক্ষ ও অন্যটি দেবীপক্ষ। অমাবস্যা তিথিতে পিতৃপক্ষের শেষ হয় আর প্রতিপদ তিথিতে শুরু হয় দেবীপক্ষ। এদিন গঙ্গাতীরে প্রার্থনা করে ভক্তরা মৃত আত্মীয়-স্বজন ও পূর্বপুরুষদের আত্মার মঙ্গল কামনা করেন। মহালয়া দুর্গোৎসবের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। স্ব-সাগরা পৃথিবীর অধিশ^র রাজা সুরথ প্রথম দেবী দুর্গার আরাধনা শুরু করেন। বসন্তকালে তিনি এই পূজার আয়োজন করায় দেবীর এই পূজাকে বাসন্তী পূজাও বলা হয়। শ্রীরামচন্দ্র শরৎকালে সীতাকে উদ্ধার করতে যাওয়ার আগে অকালে দুর্গাপূজার আয়োজন করেছিলেন। তাই এই পূজাকে অকালবোধনও বলা হয়।

ধর্মমতে, মহালয়ার দিনে দেবদেবীকুল দুর্গাপূজার জন্য নিজেদের জাগ্রত করেন। তখন থেকেই ঢাকের কাঠি, কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ, মঙ্গলশঙ্খ ও উলুধ্বনিতে কেঁপে উঠে প্রতিটি মন্দির। দেবী দুর্গাকে সবাই মা দুর্গা, মহামায়া, চ-ী, পার্বতী, কৈলাশীনি, দুর্গতিনাশিনী, পরমাপ্রকৃতি, নারায়ণী, মহেশ^রী ইত্যাদি নামে অভিহিত করেন। বৈদিক যুগ হতে শক্তিময়ী নারীর সাধনা এদেশে প্রচলিত ছিল। শক্তি শব্দটি স্ত্রীবাচক। নারীমূর্তিকে মাতৃরূপে আরাধনা ও উপাসনা করা হয়। প্রকৃতপক্ষে, তিনি নারী বা পুরুষ নন। তিনি মহাশক্তি। মনুসংহিতায় আছে- ‘য এ নার্যন্তে পূজ্যন্তে রমন্তে ত এ দেবতাঃ।’ মহামায়ারূপী নারীশক্তি সর্বশক্তির আধার। দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে জগৎপালনী মহামায়াকে পূজা করি যার কৃপা ভিন্ন ইহলোক ও পরলোক, কোনো লোকেই মানুষ কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারে না। মহামায়া দেবীর দক্ষিণ পদতলে মহাবল বাহন সিংহ এবং বাম পদতলে ছিন্নমু- মহিষের দেহ। দেহ থেকে সমুত্থিত দুর্ধর্ষ মহিষাসুর বিরাজিত। সিংহ পশুরাজ ও মহিষাসুর অসুরপতি। তারা সমগ্র পশুশক্তি অসুরশক্তির প্রতীক। তাঁরা উভয়ই মহাদেবীর পদানত, অর্থাৎ মা দুর্গা সমস্ত পশুশক্তি ও অসুর শক্তির ঊর্ধ্বে বিরাজিতা। অতএব যাবতীয় পাশবিক ও আসুরিক শক্তি অতিক্রম না করলে দেবীর প্রসাদ লাভ করা যায় না। মা দুর্গাকে যদি হৃদয়াসনে প্রতিষ্ঠিত করা যায়, তাহলে ইহলৌকিক ও পরলৌকিক উভয়বিধ কল্যাণ অর্থাৎ ভক্তি ও মুক্তি দুই-ইলাভ হয়। দেবীর পূজায় মানবজীবনের সার্বিক মঙ্গল সাধিত হয়। এতে ধর্ম, অর্থ, কাম, এই চতুবর্গ ফলই লাভ হয়।

জগজ্জননী দেবী দুর্গার আগমনে খুশির আনন্দ ছুঁয়ে যাচ্ছে ঘরে ঘরে, সব বয়সী মানুষের মনে। পঞ্চমী তিথিতে দেবীর বোধন পালন করা হয়। বিল্বষষ্ঠীতে সায়ংকালে দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মধ্য দিয়ে পূজা শুরু; এরপর ধারাবাহিকভাবে মহাসপ্তমী বিহিত পূজা, মহাষ্টমী বিহিত পূজা এবং মহানবমী বিহিত পূজা ও বিজয়া দশমী বিহিত পূজা সমাপনান্তে দর্পণ বিসর্জন অনুষ্ঠিত হবে। যা স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রতি বছরের মতো এবারও পালন করা হবে। দুর্গাপূজার অনুসারীরা পূজায় আত্মনিয়োগ করার জন্য এবং ভাবগাম্ভীর্যের মধ্য দিয়ে পূজার রীতিনীতি ও দর্শনের মধ্য দিয়ে পূজার আনন্দ উপভোগের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেন। যার যার নিকট যার যার ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি অত্যন্ত আবেগপ্রবণ। শারদীয় দুর্গোৎসবের জন্য পূজার ছুটি সরকারিভাবে পাঁচ দিন করা উচিত। কারণ ষষ্ঠী থেকে বিজয়া দশমী পর্যন্ত পূজার ভাবগাম্ভীর্য ও পূজা অনুষ্ঠিত হয়।

এসময় পুণ্যার্থী ও দর্শনার্থীদের মধ্যে আনন্দ ও কৌতুহলের সৃষ্টি হয়। পূজা দেখার জন্য গ্রামগঞ্জ ও শহরে ছোটাছুটি করেন অনেকেই পূজার আনন্দ উপভোগ করার জন্য। অনেকেই সিলেট শহরের পূজাম-পগুলো পরিদর্শন করেন কেউবা হবিগঞ্জের পূজাম-পে কুমারী পূজা দেখার জন্য ছুটে যান। আবার কেউ বা জাতীয় মন্দির ঢাকেশ^রী মন্দিরে পূজা দেখার জন্য ছুটে যান। আবার কিছু উৎসুক দর্শনার্থী পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও ছুটে যান পূজার আনন্দ উপভোগ করার জন্য। সনাতন ধর্মীয় উৎসবগুলো আচারনিষ্ঠ, নীতিসিদ্ধ, শাস্ত্রনিযুক্ত। তাই পূজার মূল ভাবধারা যেন অপসংস্কৃতির দ্বারা সংকুচিত না হয়। সেদিকে সার্বজনীন দৃষ্টি থাকা বাঞ্ছনীয়। কবির ভাষায় বলতে হয়-
‘হিন্দুরা কাঠ মাটি দিয়ে গড়া
করে না পুতুল পূজা
মৃন্ময়ী মাঝে চিন্ময়ী হেরে
হয়ে যায় আত্মহারা।’

দুর্গাপূজা একটি সার্বজনীন ও বৃহৎ ধর্মীয় উৎসব। সিলেট শহরের দর্শনার্থীবহুল উল্লেখযোগ্য দুর্গাপূজা ম-পগুলোর মধ্যে মির্জাজাঙ্গালের নিম্বার্ক আশ্রম পূজাম-প, নাইওরপুলের রামকৃষ্ণ মিশন ও বলরাম আখড়া, বালুচরের দুর্গাবাড়ী, দাড়িয়াপাড়ার চৈতালী, লামাবাজারের তিন মন্দির পূজাম-প, মির্জাজাঙ্গালের মণিপুরী রাজবাড়ী পূজাম-প, কাজলশাহ’র সনাতন যুব ফোরাম, টিলাগড়ের গোপালটিলা ম-প, দক্ষিণ সুরমার শিববাড়ী, ব্রাহ্মণশাসন কালীবাড়ীসহ আরও অনেক পূজাম-প রয়েছে। এসব ম-পে পুণ্যার্থীসহ সকল ধর্মের লোকের উপস্থিতিতে দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড় প্রতি বছর লক্ষ্য করা যায়। পূজার যথাযথ রীতিনীতি শুধুমাত্র ভক্ত ও পুণ্যার্থীদের দ্বারা অনুষ্ঠিত হলেও দুর্গাপূজা সার্বজনীন। এতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সকলের মধ্যে এক উৎসবমুখর আমেজ তৈরি হয়; ষষ্ঠী থেকে শুরু করে বিজয়া দশমী পর্যন্ত। দুর্গতিনাশিনী জগজ্জননী বিশ্বের সকল প্রাণীর দুর্গতি নাশ করুন। আদ্যাশক্তি মহামায়ার কৃপা সকলের উপর বর্ষিত হোক। সবাইকে শারদীয় শুভেচ্ছা।

লেখক: কবি ও কলামিস্ট।

আরো..