https://www.a1news24.com
,

বাবা-নীরব ভালোবাসার এক অনন্ত মহীরুহ

মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে যিনি নিজের সমস্ত স্বপ্ন বিসর্জন দেন, সেই মানুষটির নাম বাবা। পৃথিবীতে কিছু ভালোবাসা আছে, যার কোনো শব্দ নেই, অথচ তার গভীরতা সমুদ্রের চেয়েও বেশি। কিছু ত্যাগ আছে, যার কোনো হিসাব হয় না, অথচ সেই ত্যাগের ওপর দাঁড়িয়েই গড়ে ওঠে একটি পরিবারের ভবিষ্যৎ। আর কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা নিজের কষ্ট আড়াল করে সারাজীবন অন্যের মুখে হাসি ফোটানোর চেষ্টা করেন। সেই মানুষটির নাম বাবা।

বাবা—মাত্র দুটি অক্ষরের একটি শব্দ। অথচ এই শব্দের ভেতরে লুকিয়ে আছে সন্তানের নিরাপত্তা, নির্ভরতা, সাহস, ভালোবাসা এবং বেঁচে থাকার অসীম প্রেরণা। পৃথিবীর প্রতিটি সন্তানের জীবনে বাবার ভূমিকা অনন্য। মা যেমন সন্তানের মমতার আশ্রয়, বাবা তেমনি জীবনের কঠিন বাস্তবতায় নির্ভরতার এক বিশাল ছায়া।

একজন বাবা তাঁর জীবনের কতটুকু নিজের জন্য ব্যয় করেন? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে দেখা যায়, সন্তানের জন্মের পর থেকেই তাঁর জীবনের হিসাব বদলে যায়। নিজের ইচ্ছা, শখ, স্বপ্ন ও আরামকে পেছনে ফেলে তিনি ব্যস্ত হয়ে পড়েন পরিবারের ভবিষ্যৎ গড়ার কাজে। সন্তানের মুখে একটু হাসি দেখার জন্য তিনি রোদে পোড়েন, বৃষ্টিতে ভেজেন, ঘাম ঝরান, কখনো ক্ষুধা নিয়েও কাজ করেন। অথচ ঘরে ফিরে অনেক সময় মুখে হাসি রেখে বলেন, ‘আমি ভালো আছি।’

বাবার ভালোবাসা অনেক সময় প্রকাশ পায় না কথার ফুলঝুরিতে। তিনি হয়তো প্রতিদিন সন্তানকে জড়িয়ে ধরে বলেন না, ‘তোমাকে অনেক ভালোবাসি।’ কিন্তু সন্তানের সামান্য অসুস্থতায় তাঁর চোখে যে দুশ্চিন্তা দেখা যায়, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে যে নির্ঘুম রাত কাটে, তার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

আমরা যখন ছোট থাকি, বাবাকে মনে হয় পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী মানুষ। তাঁর হাত ধরে হাঁটতে গিয়ে মনে হয়, কোনো বিপদই আমাদের স্পর্শ করতে পারবে না। স্কুলের প্রথম দিন, নতুন জামা কেনা, পরীক্ষার ফল প্রকাশ কিংবা জীবনের প্রথম সাফল্য—প্রতিটি স্মৃতির সঙ্গে বাবার অবদান কোনো না কোনোভাবে জড়িয়ে থাকে। অথচ বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আমরা অনেক সময় সেই মানুষটির অবদান ভুলে যেতে শুরু করি।

একসময় যে বাবা আমাদের হাত ধরে রাস্তা পার করতেন, বয়সের ভারে একদিন সেই বাবারই হাত ধরে রাস্তা পার করাতে হয়। যে বাবা আমাদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছেন, একসময় তাঁর মুখে খাবার তুলে দেওয়ার দায়িত্ব আমাদের কাঁধে এসে পড়ে। সময়ের এই পরিবর্তন বড় নির্মম, কিন্তু এটাই জীবনের বাস্তবতা।

দুঃখজনক হলেও সত্য, বর্তমান সমাজে অনেক সন্তান বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব পালনে উদাসীন হয়ে পড়ছে। কেউ কেউ প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বাবা-মাকে নিজের জীবনের বোঝা মনে করে। বৃদ্ধ বয়সে তাঁদের প্রয়োজন, অনুভূতি ও একাকিত্বের কথা ভাবার সময় অনেকের থাকে না। অথচ যে বাবা নিজের জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়টুকু সন্তানের জন্য উৎসর্গ করেছেন, সেই বাবার শেষ বয়সে সন্তানের একটু সময়, একটু ভালোবাসা এবং একটু যত্ন পাওয়ার অধিকার কি নেই?

বাবারাও মানুষ। তাঁদেরও কষ্ট হয়, অভিমান হয়, মন খারাপ হয়। কিন্তু পরিবারের দায়িত্বের কথা ভেবে তাঁরা অধিকাংশ সময় নিজের অনুভূতিগুলো প্রকাশ করেন না। কখনো সন্তানের কঠিন কথা শুনেও নীরব থাকেন। কখনো নিজের প্রয়োজনের কথা না বলে সন্তানের প্রয়োজনকে অগ্রাধিকার দেন। এই নীরবতার ভাষা বুঝতে হলে হৃদয়ে ভালোবাসা থাকতে হয়।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাবার দায়িত্ব শুধু সন্তানকে অর্থনৈতিকভাবে প্রতিষ্ঠিত করা নয়; বরং নৈতিকতা, সততা, মানবিকতা ও দায়িত্ববোধের শিক্ষা দেওয়াও তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। একজন আদর্শ বাবা সন্তানের সামনে নিজের জীবনকেই একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁর সততা সন্তানকে সৎ হতে শেখায়, তাঁর পরিশ্রম সন্তানকে সংগ্রামী হতে শেখায়, তাঁর ধৈর্য সন্তানকে প্রতিকূলতার সঙ্গে লড়তে শেখায়।

ইসলামেও বাবা-মায়ের মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চ। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বাবা-মায়ের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছেন। সূরা বনি ইসরাইলের ২৩ ও ২৪ নম্বর আয়াতে বাবা-মায়ের প্রতি সম্মান প্রদর্শন, তাঁদের সঙ্গে কোমল ভাষায় কথা বলা এবং তাঁদের জন্য দোয়া করার শিক্ষা দেওয়া হয়েছে। মহান আল্লাহর কাছে আমাদের প্রার্থনা হওয়া উচিত—‘হে আমার প্রতিপালক! তাঁদের প্রতি দয়া করুন, যেমন তাঁরা শৈশবে আমাকে লালন-পালন করেছেন।’

এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, বাবা-মায়ের প্রতি দায়িত্ব কেবল সামাজিক সৌজন্য নয়; এটি ধর্মীয় কর্তব্যও।

আজকের ব্যস্ত জীবনে আমরা অর্থ, সম্পদ, পদ-পদবি ও সামাজিক মর্যাদা অর্জনের পেছনে ছুটছি। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছি, আমাদের সাফল্যের সংবাদটি শোনার জন্য যে মানুষটি সবচেয়ে বেশি অপেক্ষা করেন, তিনি হলেন বাবা? তাঁর কাছে সন্তানের বড় বাড়ি বা দামি গাড়ির চেয়ে সন্তানের ভালো মানুষ হয়ে ওঠাই বেশি মূল্যবান।

তাই বাবাকে ভালোবাসার জন্য কোনো বিশেষ দিবসের প্রয়োজন নেই। প্রয়োজন প্রতিদিন তাঁর খোঁজ নেওয়া, তাঁর সঙ্গে সময় কাটানো, তাঁর কথা মন দিয়ে শোনা এবং তাঁর প্রয়োজনের প্রতি যত্নশীল হওয়া। বাবা বেঁচে থাকতে তাঁকে সম্মান করুন, তাঁর মুখে হাসি ফোটান। কারণ পৃথিবীর কোনো সম্পদই বাবার শূন্যস্থান পূরণ করতে পারে না।

যাঁদের বাবা আজও বেঁচে আছেন, তাঁরা নিঃসন্দেহে সৌভাগ্যবান। আর যাঁদের বাবা পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের কাছে বাবার স্মৃতি হয়ে থাকে জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। বাবার কণ্ঠস্বর, উপদেশ, শাসন, স্নেহমাখা মুখ—সবকিছুই একসময় স্মৃতির পাতায় অমলিন হয়ে থাকে।

পরিশেষে বলতে চাই, বাবা কোনো সাধারণ সম্পর্কের নাম নয়; বাবা একটি ছায়া, একটি সাহস, একটি নির্ভরতার ঠিকানা। তিনি পরিবারের জন্য বটবৃক্ষের মতো, যাঁর ছায়ায় সন্তান বেড়ে ওঠে, স্বপ্ন দেখতে শেখে এবং জীবনের পথে এগিয়ে যায়। সেই মহীরুহকে অবহেলা নয়, ভালোবাসা দিয়ে আগলে রাখাই হোক আমাদের অঙ্গীকার।

কারণ, পৃথিবীতে অনেক আপনজন পাওয়া যায়, কিন্তু বাবার মতো নির্ভরতার জায়গা আর দ্বিতীয়টি হয় না।

লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক

আরো..