https://www.a1news24.com
২৭শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:০৬

সৈয়দ মাসুম-এর ‘জন্মভূমি’ কবিতা ও কিছু কথা

দীপালি দে সরকার-
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের সুবাদে কবি ড. সৈয়দ মাসুম-এর কবিতা ও মননশীল লেখালেখির সাথে আমার পরিচয়। মাঝে মধ্যে কবির দু-চারটি কবিতা পড়ার সৌভাগ্য হলেও, তাঁর কোনো একক কাব্যগ্রন্থ বা বই পড়ার সুযোগ এখনও আমার হয়ে ওঠেনি। অতি সম্প্রতি সৈয়দ মাসুম ‘জন্মভূমি’ শিরোনামে চমৎকার একটি কবিতা লিখেছেন। স্বদেশের প্রতি টান থেকে যুগে যুগে কবি-সাহিত্যিকেরা জন্মভূমি নিয়ে অগণিত কালজয়ী সৃষ্টি উপহার দিয়েছেন। তবে কবি সৈয়দ মাসুম যেহেতু বর্তমানে জন্মভূমি থেকে বহু দূরে প্রবাসে অবস্থান করছেন—তাই স্বদেশের মাটি ও মানুষকে তিনি কতটা মিস করেন এবং তাঁর হৃদয়ে শিকড়ের টান কতখানি গভীর, সেটি অনুধাবনের তাগিদ থেকেই এই কবিতাটি নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনার অবতারণা করছি।

কবিতার শুরুতেই কবি তাঁর স্বদেশকে সম্বোধন করেছেন “সুন্দর, সুনির্মল, সুফলা, মনোমুগ্ধকর” এবং “ছায়া সুনিবিড়, উর্বর, সুজলা জননী জন্মভূমি” বলে। এখানে দেশকে কেবল একটি জড় ভৌগোলিক ভূখণ্ড হিসেবে দেখা হয়নি; বরং তাকে অলঙ্কৃত করা হয়েছে ‘জননী’ বা মায়ের পরম আসনে। নদীমাতৃক বাংলার অফুরন্ত জলরাশি এবং শস্য-শ্যামল প্রকৃতি যেন জননীর সুধাময় বুকের দুধের মতো, যা যুগ যুগ ধরে তাঁর সন্তানদের পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছে এবং লালন-পালন করছে। বাংলার এই চিরসবুজ তরুলতা এবং গ্রামীণ প্রকৃতির স্নিগ্ধ-শান্ত ছায়া কবির কাছে মায়ের আঁচলের আশ্রয়ের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। প্রবাসের ব্যস্ত ও যান্ত্রিক জীবনে থেকেও কবি তাঁর সেই চেনা মায়ের আঁচলের শীতল পরশ তীব্রভাবে অনুভব করেছেন।

এই কবিতার সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক হলো অত্যন্ত সংক্ষেপে অথচ সার্থকভাবে বাংলার ঋতুবৈচিত্র্যকে ফুটিয়ে তোলা। কবি লিখেছেন- “ষড়ঋতুর রূপের মেলা নেই কো কোথাও আর”। বিশ্বের আর কোনো দেশে ঋতুর এমন নান্দনিক ও রূপান্তরশীল রূপ দেখা যায় না। কবি এখানে প্রধান কয়েকটি ঋতুর চিরন্তন চিত্র একেছেন অত্যন্ত নিপুণভাবে। হেমন্তের নবান্ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন- “হেমন্তে হাসে সোনালী ধান”—যা বাংলার কৃষকের ঘরে নতুন ফসল ওঠার অনাবিল আনন্দকে মনে করিয়ে দেয়। আবার শীতের কুয়াশাচ্ছন্ন সকালে মাটিতে ঝরে পড়া শিউলি ফুলের চাদর এক শান্ত, উদাসীন ও রোমান্টিক আবহ তৈরি করে।

ঋতুরাজ বসন্তের আগমনী বার্তা নিয়ে আসে কোকিলের কুহুতান, যা বাংলার প্রকৃতিকে নতুন প্রাণের স্পন্দনে মুখরিত করে তোলে। শুধু তাই নয়, শ্রাবণ ও ভাদ্র মাসে আকাশের বুকে মেঘের আনাগোনা, নীল আকাশে সাদা মেঘের ভেলা আর রোদের লুকোচুরি বাংলার প্রকৃতিকে এক মায়াবী রূপ দেয়। আর দিনের কোলাহল শেষে গ্রামীণ জনপদে যখন চাঁদনী রাতের আলো ছড়ায়, তখন কবির মনে হয় যেন পুরো দেশ এক রূপালী চাদর গায়ে জড়িয়ে রূপকথার মতো হাসছে।

কবিতার শেষাংশে কবি তাঁর জন্মভূমিকে ঈশ্বরের এক বিশেষ আশীর্বাদ বা “খোদার অপূর্ব উপহার” হিসেবে গণ্য করেছেন। বাংলার মাটি এতটাই উর্বর যে, সামান্য যত্নেই এখানে শস্য-ফসল ও ফলফলাদির অপূর্ব সমারোহ ঘটে। কবি লিখেছেন- “বঙ্গের গোলা ফসলে ভরা”—যা বাংলার প্রাচীন ঐতিহ্য ‘গোলা ভরা ধান আর পুকুর ভরা মাছ’-এর সমৃদ্ধ অতীত ও বর্তমানকে স্মরণ করিয়ে দেয়। এ দেশ ধানে ও গানে ভরপুর; অর্থাৎ, একদিকে যেমন আছে অন্নের সংস্থান, অন্যদিকে তেমনি রয়েছে মনের খোরাক।

কবিতার অন্তিমে এসে কবির দেশপ্রেম এক পরম সার্থকতা লাভ করেছে। কবি অত্যন্ত আবেগের সাথে উচ্চারণ করেছেন- “তোমার বুকে মা জুড়ায় প্রাণ, তোমার কোলে চাই ঠাঁই, আমার চোখে যে তোমার মতো দেশ ত্রিভুবনে আর নাই!” এখানে একজন সন্তানের মায়ের প্রতি যে চিরন্তন নির্ভরতা, ঠিক সেই আকুলতাই প্রকাশ পেয়েছে দেশের প্রতি। জীবনের সব ক্লান্তি শেষে এই জন্মভূমির বুকেই কবির প্রাণ জুড়ায়। তাই কবির শেষ ইচ্ছা—তিনি যেন এই দেশের কোলেই চিরতরে ঠাঁই পান; অর্থাৎ মৃত্যুর পর এই দেশের মাটিতেই যেন তাঁর শেষ শয়ান হয়। দ্বিজেন্দ্রলাল রায়ের বিখ্যাত গানের লাইনের মতোই সৈয়দ মাসুমও ঘোষণা করেছেন যে, গোটা ত্রিভুবনে বাংলার মতো সুন্দর, শান্ত এবং মমতাময়ী কোনো দেশ আর দ্বিতীয়টি নেই।

সামগ্রিকভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, কবিতাটিতে কোনো জটিল বা দুর্বোধ্য শব্দ ব্যবহার করা হয়নি। সাধারণ মানুষের সহজ অনুভূতি ও মুখের ভাষাতেই কবিতাটি প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। কবিতার প্রতি জোড়া লাইনের অন্ত্যমিল একে একটি চমৎকার গানের মতো সুরময়তা দিয়েছে, যা পাঠকালে পাঠককে এক ধরণের ছন্দোময় দোলায় ভাসিয়ে নিয়ে যায়। কবি শব্দ দিয়ে এমন কিছু দৃশ্য তৈরি করেছেন যা পড়ার সাথে সাথে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে।

সৈয়দ মাসুম-এর ‘জন্মভূমি’ কবিতাটি আকারে খুব দীর্ঘ না হলেও এর ভাবার্থ অত্যন্ত গভীর ও বিস্তৃত। এটি প্রতিটি বাঙালি হৃদয়ের চিরায়ত অনুভূতিকে স্পর্শ করে এবং আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, আমরা কত সুন্দর এবং কত সমৃদ্ধ একটি দেশের সন্তান। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততায় আমরা যে প্রকৃতির রূপ হারাতে বসেছি, এই কবিতা আমাদের আবার সেই শিকড়ের কাছে, মায়ের কোলে এবং প্রকৃতির শান্ত সান্নিধ্যে ফিরিয়ে নিয়ে যায়। এটি একাধারে প্রকৃতির অনবদ্য বন্দনা এবং মাতৃভূমির প্রতি এক পরম কৃতজ্ঞতাস্বীকার। দূর পরবাসে থেকেও কবির এই স্বজাত্যবোধ ও দেশের প্রতি গভীর মমত্ববোধ প্রতিটি পাঠককে স্পর্শ করুক,কবির জন্য শুভকামনা।

লেখক: কবি ,অধ্যাপক ও অনুবাদক।

আরো..