https://www.a1news24.com
৮ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১:৩৫

সুশাসনের ঘাটতি ও দলীয় প্রভাব বিএনপির ইশতেহার পূরণে ঝুঁকি তৈরি করছে: টিআইবি

বিএনপি সরকার তার নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার অনুযায়ী বিভিন্ন মন্ত্রণালয়সহ খাতভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন শুরু করেছে। তবে মন্ত্রণালয় ও খাতভিত্তিক কার্যক্রমে সুশাসনের ঘাটতি আছে। আছে অনিয়ম-দুর্নীতিবিরোধী কঠোর–সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও দিকনির্দেশনার ঘাটতি। অব্যবস্থাপনা ও দলীয় প্রভাব অব্যাহত আছে। এ ছাড়া ঝুঁকি বিশ্লেষণভিত্তিক কর্মকৌশলের অভাব রয়েছে। এসব কার্যত বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের অঙ্গীকার পূরণে অন্তরায় হিসেবে কাজ করার ঝুঁকি তৈরি করছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে এই পর্যবেক্ষণ উঠে এসেছে। গবেষণার শিরোনাম ‘ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ’।

আজ রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদন প্রকাশ করেন টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান। প্রতিবেদন উপস্থাপন করেন টিআইবির সিনিয়র রিসার্চ ফেলো মো. জুলকারনাইন ও রিসার্চ ফেলো রাজিয়া সুলতানা।

প্রতিবেদনে পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকার গঠনের পর আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, মব সংস্কৃতির বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা, চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কঠোর হুঁশিয়ারি দিলেও বিভিন্ন হাটবাজার, পরিবহন খাত, বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড ইত্যাদি ক্ষেত্রে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা ও চাঁদাবাজি, মাদকব্যবসা, চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা লক্ষণীয় মাত্রায় বিদ্যমান। এসব ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগ রয়েছে। এমনকি চাঁদাবাজিকে একজন মন্ত্রীর বৈধতা দানের প্রচেষ্টা ব্যাপকভাবে সমালোচিত হয়েছে।

পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের গঠনের ১০০ দিনের মধ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন, মানবাধিকার কমিশন ও তথ্য কমিশনের মতো গুরুত্বপূর্ণ কমিশন গঠনের জন্য দৃশ্যমান উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। ফলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, মানবাধিকার সংরক্ষণ ও অবাধ তথ্যপ্রবাহ নিশ্চিতকরণ কার্যক্রম একটি দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকির সম্মুখীন হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণে বলা হয়, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের ঘোষণা দেওয়া হলেও ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী-সমর্থক, আমলাতন্ত্র, ব্যবসায়ীসহ প্রায় সব পেশাজীবীদের অনেকের মধ্যেই দৃশ্যমান ‘এবার আমাদের পালা’ সংস্কৃতির চর্চা লক্ষণীয়। পুলিশ, প্রশাসন ও সরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান, বাংলাদেশ ব্যাংক, বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক, স্থানীয় সরকার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দলীয় ও গোষ্ঠী বিবেচনায় নিয়োগ-পদায়ন অব্যাহত, যা বিএনপির নির্বাচনী অঙ্গীকারের পরিপন্থী।

অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বাংলাদেশের বিভিন্ন ধর্মীয় শক্তির উত্থান ও দেশব্যাপী বহুমত–বহুধর্মী–সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যের ওপর সহিংস ও ষড়যন্ত্রমূলক কর্মকাণ্ডের ধারাবাহিকতা নির্বাচিত সরকারের আমলেও অব্যাহত রয়েছে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, সবশেষ দৃষ্টান্ত ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শাহ আলীর মাজারে এবং কুষ্টিয়ায় একজন পীরের ওপর হামলা হয়েছে, যা মুক্তচিন্তা, সামাজিক–সাংস্কৃতিক ও বৈচিত্র্যের সহাবস্থান এবং সহিষ্ণু আচরণের ধারক–বাহক, তথা দেশবাসীর জন্য অশনিসংকেত।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৭টি আইনে পরিণত করার উদ্যোগ সাধুবাদ পাওয়ার যোগ্য বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, জবাবদিহিমূলক সরকার পরিচালনের প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ আইনগুলো রহিত করা বা অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য স্থগিত করার মাধ্যমে কার্যত ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকারের মোটাদাগে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন এবং গুম প্রতিরোধসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে পেছনে হাঁটার ইঙ্গিত দেয়।

পর্যবেক্ষণে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জারি করা অধ্যাদেশগুলো আইনে পরিণত করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, মানবাধিকার রক্ষা, দুর্নীতি দমন-সংক্রান্ত যেসব আইন সামান্য কিছু সংশোধন করে পাস করা যেত। কিন্তু সরকার তা বাতিল বা স্থগিত করেছে। অন্যদিকে যেসব আইন নির্বাহী বিভাগের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠায় সরকারের হাতকে শক্তিশালী করবে, এমন অনেক আইন পাস করা হয়েছে।

টিআইবির পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সরকারের ১০০ দিন একদিকে আশাজাগানিয়া ও সম্ভাবনাময়। অন্যদিকে সুশাসন, দুর্নীতি প্রতিরোধ, বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠার প্রত্যাশা পূরণে সুনির্দিষ্ট পথরেখা বা উদ্যোগের ঘাটতির দিকটি উদ্বেগজনক।

সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন টিআইবির উপদেষ্টা-নির্বাহী ব্যবস্থাপনা অধ্যাপক সুমাইয়া খায়ের, গবেষণা ও পলিসি বিভাগের পরিচালক মুহাম্মদ বদিউজ্জামান, গবেষণা সহযোগী মো. সহিদুল ইসলাম প্রমুখ।

আরো..