মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম সাদিক: মানুষকে বলা হয় সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ জীব। কারণ মানুষ কেবল বুদ্ধিবৃত্তিক নয়, মানবিক গুণাবলীতেও অনন্য। কিন্তু আজকের সমাজের দিকে তাকালে প্রশ্ন জাগে—সেই মানবিকতা কোথায় হারিয়ে যাচ্ছে? প্রতিদিন সংবাদপত্র খুললেই চোখে পড়ে হত্যা, ধর্ষণ, নির্যাতন, প্রতারণা, পারিবারিক সহিংসতা, শিশু ও বৃদ্ধের প্রতি নিষ্ঠুর আচরণ, সামাজিক বিদ্বেষ এবং আত্মহত্যার খবর। প্রযুক্তি যত উন্নত হচ্ছে, সভ্যতার বাহ্যিক রূপ যত আধুনিক হচ্ছে, ততই যেন মানুষের হৃদয় থেকে সহানুভূতি ও মমত্ববোধ কমে যাচ্ছে। তাই প্রশ্ন ওঠে—সমাজের এত নিষ্ঠুরতা কেন?
সমাজের নিষ্ঠুরতার অন্যতম কারণ হলো নৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয়। একসময় পরিবার, বিদ্যালয় ও ধর্মীয় শিক্ষা মানুষকে সততা, সহানুভূতি, দয়া ও পরোপকারের শিক্ষা দিত। এখন অনেক ক্ষেত্রেই সেই শিক্ষার পরিবর্তে প্রতিযোগিতা, ভোগবাদ এবং ব্যক্তিস্বার্থকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে মানুষ অন্যের কষ্ট অনুভব করার ক্ষমতা ধীরে ধীরে হারিয়ে ফেলছে। যখন নৈতিকতার চেয়ে অর্থ ও ক্ষমতা বড় হয়ে ওঠে, তখন নিষ্ঠুরতা সমাজে স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়।
পারিবারিক বন্ধনের দুর্বলতাও একটি বড় কারণ। পরিবার হলো মানুষের প্রথম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। একটি শিশু তার পরিবার থেকেই ভালোবাসা, সহমর্মিতা এবং মানবিক আচরণ শেখে। কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক পরিবারে পারস্পরিক সম্পর্কের টানাপোড়েন, দাম্পত্য কলহ, বিচ্ছেদ, অবহেলা এবং মানসিক দূরত্ব বেড়ে গেছে। এর নেতিবাচক প্রভাব শিশু ও কিশোরদের মানসিক বিকাশে পড়ছে। ভালোবাসাহীন পরিবেশে বেড়ে ওঠা অনেকেই পরবর্তীকালে সমাজের প্রতি সংবেদনশীল হতে পারে না।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং ডিজিটাল সংস্কৃতিরও একটি প্রভাব রয়েছে। প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে, কিন্তু একই সঙ্গে মানুষকে অনেক ক্ষেত্রে বাস্তব সম্পর্ক থেকে দূরে সরিয়ে দিয়েছে। অনেকেই অন্যের কষ্টকে বাস্তব ঘটনা হিসেবে না দেখে শুধুই একটি ভিডিও বা সংবাদ হিসেবে গ্রহণ করেন। কখনো কখনো দুর্ঘটনায় আহত মানুষকে সাহায্য করার পরিবর্তে ভিডিও ধারণ করে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। এটি মানবিকতার জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক একটি চিত্র।
অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বেকারত্বও সমাজে নিষ্ঠুরতা বাড়িয়ে দেয়। যখন একজন মানুষ দীর্ঘদিন কর্মসংস্থানহীন থাকেন, মৌলিক চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হন কিংবা সামাজিক বৈষম্যের শিকার হন, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা, ক্ষোভ ও অসন্তোষ জন্ম নিতে পারে। যদিও দারিদ্র্য কখনো অপরাধের বৈধ কারণ নয়, তবুও অর্থনৈতিক বঞ্চনা অনেক সময় অপরাধপ্রবণতা ও সহিংস আচরণ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তাই ন্যায্য অর্থনৈতিক সুযোগ সৃষ্টি সামাজিক শান্তির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
আইনের দুর্বল প্রয়োগও নিষ্ঠুরতার বিস্তারে ভূমিকা রাখে। যখন অপরাধীরা দ্রুত বিচার ও উপযুক্ত শাস্তি থেকে রেহাই পায়, তখন সমাজে অপরাধ করার সাহস বেড়ে যায়। আইনের শাসন কেবল কঠোর শাস্তির মাধ্যমে নয়, ন্যায়বিচারের নিশ্চিত বাস্তবায়নের মাধ্যমেও প্রতিষ্ঠিত হতে হবে। বিচারহীনতার সংস্কৃতি সমাজে ভয় নয়, বরং অপরাধের সুযোগ সৃষ্টি করে।
ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার সঠিক অনুশীলনের অভাবও একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। সব ধর্মই মানুষকে ভালোবাসা, দয়া, ক্ষমা এবং ন্যায়বিচারের শিক্ষা দেয়। কিন্তু যখন ধর্মকে কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয় এবং বাস্তব জীবনে তার মানবিক শিক্ষা অনুসরণ করা হয় না, তখন সমাজে হিংসা ও বিদ্বেষের বিস্তার ঘটে। প্রকৃত ধর্মচর্চা মানুষের হৃদয়কে কোমল করে, নিষ্ঠুর নয়।
সমাজের এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য কেবল সরকার বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান এবং প্রতিটি নাগরিককে নিজ নিজ অবস্থান থেকে দায়িত্ব পালন করতে হবে। শিশুদের ছোটবেলা থেকেই সহানুভূতি, সততা, দায়িত্ববোধ এবং মানবিকতার শিক্ষা দিতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থায় নৈতিক শিক্ষার গুরুত্ব বাড়াতে হবে। গণমাধ্যমকেও ইতিবাচক মূল্যবোধ গঠনে আরও সক্রিয় ভূমিকা পালন করতে হবে।
একই সঙ্গে আমাদের ব্যক্তিগত জীবনেও আত্মসমালোচনার প্রয়োজন রয়েছে। আমরা কি প্রতিবেশীর বিপদে পাশে দাঁড়াই? রাস্তায় অসহায় কাউকে সাহায্য করি? ভিন্নমতের মানুষের প্রতি সম্মান দেখাই? সমাজ পরিবর্তনের শুরু হয় ব্যক্তির পরিবর্তনের মাধ্যমে। একজন মানুষের একটি মানবিক কাজও অন্যদের অনুপ্রাণিত করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, সমাজের নিষ্ঠুরতা কোনো একদিনে সৃষ্টি হয়নি, তাই এটি একদিনে দূরও হবে না। তবে মানবিক মূল্যবোধ, ন্যায়বিচার, পারিবারিক বন্ধন, সুশিক্ষা এবং পারস্পরিক সহমর্মিতার চর্চা বাড়াতে পারলে একটি সহানুভূতিশীল সমাজ গড়ে তোলা সম্ভব। সভ্যতার প্রকৃত পরিচয় উঁচু দালান বা আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়; বরং একজন মানুষের প্রতি আরেকজন মানুষের ভালোবাসা, সম্মান ও দায়িত্ববোধে। তাই আসুন, আমরা নিষ্ঠুরতার পরিবর্তে মানবিকতাকেই আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার অঙ্গীকার করি।
লেখকঃ প্রাবন্ধিক ও মুদ্রণ ব্যবস্থাপক