https://www.a1news24.com
৫ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৮:০৭

তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হাজারো পরিবার, বাস্তবায়নের অপেক্ষায় মহাপরিকল্পনা

তিস্তা নিয়ে আশ্বাসের রাজনীতি, ভোগান্তির শেষ নেই উত্তরাঞ্চলে

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ স্বাধীনতার ৫৫ বছর পেরিয়ে গেলেও তিস্তা নদীর ভাঙন, শুষ্ক মৌসুমে পানির সংকট এবং উজানে ভারতের পানি নিয়ন্ত্রণের প্রভাবে উত্তরাঞ্চলের পাঁচ জেলার লাখো মানুষের দুর্ভোগ কাটেনি। প্রতিবছর নদীভাঙনে বসতভিটা ও ফসলি জমি হারিয়ে হাজার হাজার পরিবার ভ‚মিহীন হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। অন্যদিকে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার বুকে পানি না থাকায় কৃষি, মৎস্য আহরণ ও নৌ-নির্ভর জীবিকা কার্যত বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিন ধরে নানা সরকারের প্রতিশ্রæতি মিললেও তিস্তা মহাপরিকল্পনার দৃশ্যমান বাস্তবায়ন না হওয়ায় রংপুর অঞ্চলের মানুষের মধ্যে বিশেষ করে কাউনিয়ায় বাড়ছে হতাশা ও ক্ষোভ।

তিস্তা উত্তরাঞ্চলের রংপুর, নীলফামারী, লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম ও গাইবান্ধা জেলার মানুষের জীবন-জীবিকার অন্যতম ভিত্তি। কৃষক, জেলে, মাঝি ও নদীপাড়ের হাজারো পরিবার এই নদীকেন্দ্রিক অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল। তবে নদীর উজানে ভারতের গজলডোবা ব্যারাজে পানি নিয়ন্ত্রণের ফলে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা প্রায় পানিশূন্য হয়ে পড়ে। এতে কৃষিকাজ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি হাজার হাজার মৎস্যজীবী ও শত শত নৌকার মাঝি কর্মহীন হয়ে পড়ছেন। আবার বর্ষা এলেই নদীভাঙন ও বন্যায় হারিয়ে যাচ্ছে ঘরবাড়ি, আবাদি জমি ও জীবিকার শেষ সম্বল।

তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন নিয়ে গত এক দশকের বেশি সময় ধরে বিভিন্ন সরকারের পক্ষ থেকে একাধিক ঘোষণা এলেও এখনো প্রকল্পটির দৃশ্যমান বাস্তবায়ন শুরু হয়নি। স্থানীয়দের ভাষ্য, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে কাউনিয়ার গাজীরহাট স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত এক জনসভায় তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, তৎকালীন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী ডাঃ এনামুর রহমান এবং তৎকালীন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেন তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের আশ্বাস দেন এবং নদীভাঙন রোধে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়ার প্রতিশ্রæতি দেন।

পরে অন্তরবর্তী সরকারের সময় তিস্তা সড়ক ও রেলসেতু এলাকায় আয়োজিত গণশুনানিতে জানানো হয়, চীনের সহযোগিতা ও দেশীয় অর্থায়নে তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ওই গণশুনানিতে পানিসম্পদ উপদেষ্টা রিজওয়ানা হাসান ঘোষণা করেছিলেন, ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকল্পটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে ২০২৫ সালের ১৯ জানুয়ারি চীনের রাষ্ট্রদূতকে সঙ্গে নিয়ে তিস্তা এলাকা পরিদর্শনে এসে তিনি জানান, অন্তর্বরতী সরকারের মেয়াদে প্রকল্পটির কাজ শুরু করা সম্ভব হবে না।

এদিকে বর্তমান বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ১৯ জুন তিস্তা এলাকায় সফর করেন পানিসম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী অধ্যক্ষ আসাদুল হাবীব দুলু এবং পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ। এ সময় তারা স্থানীয়দের উদ্দেশে বলেন, “আরও একটু ধৈর্য ধরুন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবেই।”

বারবার ঘোষণার পরও প্রকল্পের দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় তিস্তাপাড়ের মানৃষের মধ্যে হতাশা বাড়ছে। তাদের দাবি, আর আশ্বাস নয় দ্রæত তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করে নদীভাঙন, পানিসংকট ও জীবিকা সংকটের স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে হবে।

নদী গবেষক ড. তুহিন ওয়াদুদ বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা দীর্ঘদিন ধরে ভ‚রাজনৈতিক জটিলতায় আটকে আছে। বারবার প্রকল্প বাস্তবায়নের আশ্বাস দেওয়া হলেও কার্যকর অগ্রগতি না থাকায় মানুষের প্রত্যাশা ক্রমেই ক্ষীণ হয়ে আসছে।

তিস্তাপাড়ের সচেতন নাগরিকদের দাবি, উত্তরাঞ্চলের কৃষি, মৎস্য, নৌ-যোগাযোগ ও নদীভাঙন সমস্যার স্থায়ী সমাধানে আর প্রতিশ্রæতি নয়, দ্রæত দৃশ্যমানভাবে তিস্তা মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। তাদের ভাষায়, তিস্তার হারানো প্রাণ ফিরিয়ে আনতে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে উত্তরাঞ্চলের সংকট আরও গভীর হবে।

আরো..