https://www.a1news24.com
১৮ই এপ্রিল, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭:১১

মোরেলগঞ্জে সন্ত্রাসের নগ্নরূপ নারী-শিশুকে টার্গেট করে পরিকল্পিত হামলা

জমি বিরোধের আড়ালে প্রভাবশালী চক্র? হত্যাচেষ্টা, শ্লীলতাহানি ও লুটপাটে কাঁপছে গ্রাম

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার পশ্চিম সরালিয়া গ্রামে সংঘটিত সাম্প্রতিক হামলাটি শুধু একটি সাধারণ মারামারির ঘটনা নয়—এটি ছিল সুপরিকল্পিত, সংঘবদ্ধ ও ভয়াবহ সন্ত্রাসী তাণ্ডব। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, দীর্ঘদিনের জমিজমা ও পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী চক্র পরিকল্পিতভাবে নারী-শিশুকে টার্গেট করে এ হামলা চালিয়েছে।

গত ১০ এপ্রিল সকাল সাড়ে ৯টার দিকে ১৫নং মোরেলগঞ্জ ইউনিয়নের পশ্চিম সরালিয়া গ্রামে ঘটে এই নৃশংস ঘটনা। এতে অন্তত তিনজন গুরুতর আহত হন, যাদের মধ্যে নারী ভুক্তভোগীর অবস্থা আশঙ্কাজনক বলে জানা গেছে।

পরিকল্পিত হামলার ইঙ্গিত
ভুক্তভোগী ও স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, হামলার দিন অভিযুক্তরা পূর্বপরিকল্পনা অনুযায়ী দেশীয় ধারালো অস্ত্র, লাঠিসোঁটা ও প্রাণঘাতী সরঞ্জাম নিয়ে সংঘবদ্ধভাবে ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়। তারা সরাসরি বাড়ির পেছনের পুকুরপাড়ে গিয়ে আক্রমণ শুরু করে—যা স্পষ্টতই পূর্ব পরিকল্পনার ইঙ্গিত বহন করে।

অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়েছে—
মোঃ ইয়াসিন হাওলাদার, ইউসুফ হাওলাদার, খাদিজা বেগমসহ আরও কয়েকজনকে।
নারীকে লক্ষ্য করে বর্বরতা
হাফিজা আক্তার (৩৮) নামের এক নারীকে হত্যার উদ্দেশ্যে ধারালো অস্ত্র দিয়ে এলোপাতাড়ি কোপানো হয়। আত্মরক্ষার চেষ্টা করলে তার হাতের আঙুল ও কনুই মারাত্মকভাবে কেটে যায়। শরীরজুড়ে আঘাতের চিহ্ন স্পষ্ট।

চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো—হামলার সময় তার কোলে থাকা মাত্র ১৮মাসের শিশু আয়মানুল্লাহকে ছিনিয়ে নিয়ে পাশের পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। স্থানীয়রা দ্রুত উদ্ধার না করলে শিশুটির প্রাণহানি ঘটতে পারত বলে ধারণা করা হচ্ছে।

প্রতিবাদে রক্তাক্ত আরও দুইজন
মায়ের আর্তচিৎকার শুনে এগিয়ে এলে চম্পা বেগম ও সোহাগ খলিফাও হামলার শিকার হন। তাদের হাত কেটে যায় এবং শরীরের বিভিন্ন স্থানে গুরুতর জখম হয়।

শ্লীলতাহানি ও লুটপাট—একই ঘটনায় বহুমাত্রিক অপরাধ
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, হামলার সময় নারীদের শ্লীলতাহানি করা হয়। কাপড়চোপড় টানাহেঁচড়া করে তাদের লাঞ্ছিত করা হয়। একই সঙ্গে স্বর্ণালঙ্কার ছিনিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

চম্পা বেগমের গলায় থাকা প্রায় ১ লাখ ২২ হাজার টাকার স্বর্ণের চেইন ছিনিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছায়া?

স্থানীয় একাধিক সূত্র দাবি করেছে, অভিযুক্তদের সঙ্গে এলাকার প্রভাবশালী একটি মহলের যোগসাজশ রয়েছে। পূর্বেও তারা একাধিকবার ভয়ভীতি ও হামলার ঘটনা ঘটিয়েছে, তবে ভুক্তভোগীরা নিরাপত্তাহীনতার কারণে প্রকাশ্যে আসতে পারেননি।

বিলম্বিত মামলা, কেন?
ঘটনার পরপরই মামলা না হয়ে কয়েকদিন পর এজাহার দায়ের করা হয়েছে। এ বিষয়ে ভুক্তভোগীরা জানান, প্রথমে স্থানীয়ভাবে আপোষ-মীমাংসার চেষ্টা করা হয়। তবে তা ব্যর্থ হওয়ায় অবশেষে থানার দ্বারস্থ হতে বাধ্য হন তারা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা প্রশ্নের মুখে
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চললেও প্রশাসনের কার্যকর নজরদারি না থাকায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।

মোরেলগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) জানিয়েছেন, অভিযোগটি গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হচ্ছে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

গ্রামাঞ্চলে বাড়ছে সংঘবদ্ধ সহিংসতা
এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল—গ্রামীণ এলাকায় জমিজমা বিরোধ এখন শুধু ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বে সীমাবদ্ধ নেই; এটি সংঘবদ্ধ সহিংসতায় রূপ নিচ্ছে। নারী ও শিশুকে টার্গেট করে হামলা পরিস্থিতিকে আরও উদ্বেগজনক করে তুলছে।

মোরেলগঞ্জের এই ঘটনা শুধু একটি এলাকার নয়—এটি সারাদেশের গ্রামীণ নিরাপত্তা ব্যবস্থার একটি সতর্ক সংকেত। দ্রুত আসামিদের গ্রেপ্তার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই পারে ভবিষ্যতে এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধ করতে।

আরো..