https://www.a1news24.com
৩রা আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সকাল ১১:৫৯

একই কমনওয়েলথ গেমস, ইতিহাস গড়ে ভারত আর অজুহাত খোঁজে বাংলাদেশ!

স্পোর্টস রিপোর্টার: একই কমনওয়েলথ গেমস, একই প্রতিযোগিতা, একই সুযোগ। তবু দুই দেশের গল্প দুই মেরুর। একদিকে ভারত স্বর্ণের বন্যায় ইতিহাস লিখেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ আবারও ফিরছে শূন্য হাতে। প্রশ্নটা তাই আরও জোরালো হয়ে উঠেছে-ভারত পারে, বাংলাদেশ কেন পারে না?

গ্লাসগো কমনওয়েলথ গেমসের নবম দিনটি ভারতের জন্য ছিল এক অনন্য উৎসব। মাত্র একদিনেই ১৬টি পদক জিতেছে তারা। এর মধ্যে ৮টি স্বর্ণ, ৫টি রুপা ও ৩টি ব্রোঞ্জপদক। এর মধ্যে সবচেয়ে উজ্জ্বল অধ্যায় রচনা করেছে বক্সিং। সাতটি স্বর্ণ ও তিনটি রুপা জিতে ভারতীয় বক্সাররা শুধু নিজেদের নয়, কমনওয়েলথ গেমসের ইতিহাসেও নতুন রেকর্ড লিখেছেন। এক আসরে একটি ডিসিপ্লিনে ১০টি পদক জয়ের এমন নজির আগে কেউ দেখাতে পারেননি। অর্থাৎ বিশ্বরেকর্ড গড়েছেন ভারতীয় বক্সাররা।

রোববার (২ আগস্ট) ছিল প্রতিযোগিতার শেষ দিন। এ প্রতিবেদন পর্যন্ত মোট ৩৯টি পদক জিতে পদক তালিকার চতুর্থ স্থানে ছিল ভারত। এর মধ্যে ঝুলিতে এসেছে ১৩টি স্বর্ণের পদক, ১৭টি রুপার পদক এবং ৯টি ব্রোঞ্জ পদক। বক্সিং, অ্যাথলেটিক্স এবং ভারোত্তোলনে অসাধারণ সাফল্যের ওপর ভর করেই এবারের আসরে ভারতের এমন চোখ ধাঁধানো সাফল্য। ৬৬টা স্বর্ণ, ৪১টা রুপা আর ৫২টা ব্রোঞ্জসহ মোট ১৫৮টি পদক নিয়ে শীর্ষে ছিল অস্ট্রেলিয়া। দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থানে যথাক্রমে ইংল্যান্ড (২৬ স্বর্ণ, ৪১ রুপা আর ৩৫ ব্রোঞ্জ) এবং কানাডা (১৮ স্বর্ণ, ২০ রুপা ও ২১ ব্রোঞ্জ)।

ভারতের এই সাফল্য কোনো আকস্মিক বিস্ময় নয়। এই সাফল্যের পেছনে রয়েছে বছরের পর বছর ধরে পরিকল্পিত প্রশিক্ষণ, আধুনিক অবকাঠামো, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার অভিজ্ঞতা এবং খেলোয়াড় তৈরির সুসংগঠিত প্রক্রিয়া। ভারত জানে, পদক কাকতালীয়ভাবে আসে না; পদক আসে দীর্ঘ প্রস্তুতির ঘামে, বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনায় এবং অবিচল বিনিয়োগে। অন্যদিকে বাংলাদেশের গল্প প্রতি আসরেই একই থাকে! প্রতিনিধিদল যায়, ছবি তোলে, অভিজ্ঞতা অর্জনের কথা বলে, তারপর নীরবে দেশে ফিরে আসে। পদক তো দূরের কথা, অনেক ডিসিপ্লিনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার অবস্থানও তৈরি করা যায় না। একসময় শুটিংয়ে বাংলাদেশের কিছুটা সম্ভাবনা ছিল। ২০১৮ সালে দুটি পদকও এসেছিল আবদুল্লাহ হেল বাকী আর শাকিলের বদৌলতে। কিন্তু শুটিং ইভেন্ট বাদ পড়তেই যেন বাংলাদেশের পদকের আলোও নিভে গেছে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন পরিকল্পনা নিয়ে। আন্তর্জাতিক গেমসকে সামনে রেখে দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি কোথায়? ফেডারেশনগুলোর অধিকাংশের কার্যক্রম এখনো টুর্নামেন্টকেন্দ্রিক। প্রতিযোগিতা এলেই অল্প সময়ের ক্যাম্প, তারপর বিদেশ সফর-এতেই যেন দায়িত্ব শেষ। অথচ আন্তর্জাতিক মানের ক্রীড়াবিদ তৈরি হয় বছর জুড়ে কঠোর অনুশীলনে, নিয়মিত প্রতিযোগিতায় এবং বৈজ্ঞানিক পরিচর্যায়। বর্তমান সরকার সম্ভাবনাময় ক্রীড়াবিদদের জন্য মাসিক আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। অনেকেই মাসে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত ভাতা পাচ্ছেন। এটি নিঃসন্দেহে বড় উদ্যোগ। কিন্তু অর্থ তখনই ফল দেয়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় জবাবদিহি, পেশাদারিত্ব এবং ফল অর্জনের সংস্কৃতি। কেবল ভাতা নয়, প্রয়োজন সেই ভাতার যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা। প্রয়োজন নিয়মিত মূল্যায়ন, কঠোর অনুশীলন এবং আন্তর্জাতিক মানের লক্ষ্য নির্ধারণ।

ভারতের সাফল্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে স্বপ্ন দেখতে হলে আগে সেই স্বপ্নের জন্য ঘাম ঝরাতে হয়। সেখানে প্রতিটি পদক একটি সুপরিকল্পিত ব্যবস্থার ফসল। আর বাংলাদেশে এখনো অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত প্রতিভা লড়াই করে প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বিরুদ্ধে। ফলে সম্ভাবনা থাকলেও সাফল্য অধরাই থেকে যায়। ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্রীড়াঙ্গনে উন্নতি চাইলে শুধু প্রতিভা নয়, বদলাতে হবে মানসিকতা। ফেডারেশনকে হতে হবে আরও দায়িত্বশীল, খেলোয়াড় নির্বাচন হতে হবে স্বচ্ছ, কোচিং হতে হবে আধুনিক, আর প্রস্তুতি হতে হবে দীর্ঘমেয়াদি। বিদেশ সফর নয়, লক্ষ্য হতে হবে আন্তর্জাতিক মঞ্চে পতাকা উড়ানো।

ভারত প্রমাণ করেছে, সঠিক পরিকল্পনা থাকলে একটি ডিসিপ্লিন থেকেই ইতিহাস লেখা যায়। বাংলাদেশেরও প্রতিভার অভাব নেই। অভাব কেবল সেই পরিকল্পনা, দায়বদ্ধতা এবং জয়ের ক্ষুধার। যা একটি জাতিকে পদকের মঞ্চে দাঁড় করায়। আজ তাই প্রশ্নটি শুধু আবেগের নয়, আত্মসমালোচনারও। ভারত, পারে, বাংলাদেশ পারে না কেন? উত্তর খুঁজতে হলে অন্যকে নয়, আগে আয়নায় নিজেদেরই দেখতে হবে বলে অভিমত ক্রীড়া সংশ্লিষ্টদের।

আরো..