https://www.a1news24.com
২১শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৯:২৭

দিল্লিকে চীন–বাংলাদেশ সম্পর্ককে শুধু ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা না দেখার পরামর্শ বেইজিংয়ের

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফর শুরু করছেন আজ রোববার থেকে। এই সফরে তিনি মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন। এই খবর ভারতীয় গণমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা তৈরি করেছে। তাদের দৃষ্টিতে, ভারতকে এড়িয়ে তারেক রহমানের চীনমুখী কূটনৈতিক তৎপরতা তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারের একটি ইঙ্গিত। কারণ, ঐতিহ্যগতভাবে বাংলাদেশের নতুন সরকারপ্রধানদের প্রথম সফরের গন্তব্য হিসেবে ভারতকে দেখা হতো। কিন্তু চীনা বিশ্লেষকেরা বিষয়টিতে উড়িয়ে দিয়েছেন।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল শনিবার ঢাকায় সংবাদ ব্রিফিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম জানান, আজ রোববার মালয়েশিয়া সফরের মধ্য দিয়ে এই দ্বিপক্ষীয় সফর শুরু হবে। রোববার থেকে সোমবার পর্যন্ত মালয়েশিয়ায় দেশটির প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন তারেক রহমান। সেখানে ঢাকা আরও বেশি সংখ্যক বাংলাদেশি প্রবাসী কর্মী নেওয়ার বিষয়ে কুয়ালালামপুরের কাছে অনুরোধ জানাবে।

বাংলাদেশি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার রাতে মালয়েশিয়ার রাজধানী কুয়ালালামপুর থেকে পাঁচ দিনের সফরে চীনে পৌঁছাবেন তারেক রহমান। বাংলাদেশি কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর আসন্ন চীন সফরে বিভিন্ন খাতে প্রকল্পভিত্তিক চীনা অর্থায়ন ও সহযোগিতা নিয়ে আলোচনা হবে বলে প্রথম আলো জানিয়েছে।

গত মে মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই বলেন, চীন বাংলাদেশের সঙ্গে ঐতিহ্যগত বন্ধুত্বকে এগিয়ে নিতে, রাজনৈতিক পারস্পরিক আস্থা জোরদার করতে, বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতা গভীর করতে এবং বাংলাদেশের জাতীয় উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য অংশীদার হতে প্রস্তুত। জবাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে চীনের সমর্থন ও সহায়তাকে মূল্যায়ন করে এবং দুই দেশের সর্বাত্মক বন্ধুত্ব ও সহযোগিতা আরও গভীর করার প্রত্যাশা করে। একই সঙ্গে দুই দেশের বিস্তৃত কৌশলগত সহযোগিতামূলক অংশীদারত্বকে নতুন উচ্চতায় নেওয়া এবং বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়ন ত্বরান্বিত করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন তিনি।

ড. খলিলুর রহমান আরও বলেন, বাংলাদেশ চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোকে দেশে বিনিয়োগে স্বাগত জানায় এবং তাদের জন্য একটি স্থিতিশীল, ইতিবাচক ও পূর্বানুমানযোগ্য ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রস্তুত।

তারেক রহমানের সফর ভারতীয় গণমাধ্যমও নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস আজ রোববার এক প্রতিবেদনে বলেছে, বিদেশে কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগ আকর্ষণের লক্ষ্যে প্রথম বিদেশ সফরের জন্য তারেক রহমান মালয়েশিয়া ও চীনকে বেছে নিয়েছেন। একই সঙ্গে ভারতকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে তিনি তাঁর পররাষ্ট্রনীতির অগ্রাধিকারও তুলে ধরেছেন। কারণ, অতীতে এমন সফরের ক্ষেত্রে ভারতই সাধারণত প্রথম গন্তব্য হয়ে থাকত। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য হিন্দুও জানিয়েছে, দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম বিদেশ সফরে মালয়েশিয়া ও চীনে যাচ্ছেন তারেক রহমান এবং উদ্বোধনী সফরের গন্তব্য হিসেবে প্রতিবেশী ভারতকে এড়িয়ে যাচ্ছেন তিনি।

অন্যদিকে, মার্চে তারেক রহমান ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদিকে চিঠি লিখে ভারত সফরের আমন্ত্রণ গ্রহণ করেছিলেন। একই সঙ্গে এক সময়ের টানাপোড়েনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক পুনর্গঠনের একটি বৃহত্তর প্রচেষ্টারও ইঙ্গিত দিয়েছিলেন বলে ইন্ডিয়া এক্সপ্রেস জানিয়েছে।

ভারতীয় গণমাধ্যমের এই নিবিড় নজর ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কের পরিবর্তনশীল বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করছে। দীর্ঘ সময় ধরে ভারত বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ছিল এবং দুই দেশ নানা ক্ষেত্রে ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা বজায় রেখেছিল। তবে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে ধাক্কা লাগে এবং সম্পর্ক এখনো পুনর্বিন্যাসের একটি পর্যায় অতিক্রম করছে। সম্পর্ক এখনো পুরোপুরি স্থিতিশীল অবস্থায় ফিরতে পারেনি বলে গ্লোবাল টাইমসকে জানিয়েছেন চীনের সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজি ইনস্টিটিউটের গবেষণা বিভাগের পরিচালক চিয়ান ফেং।

চিয়ান ফেং বলেন, ভারতের গণমাধ্যম ও কৌশলগত মহলের কিছু অংশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের ঐতিহ্যগত নেতৃত্বের ভূমিকাকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক বিষয়গুলোকে দেখছে। ফলে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হলে তা নয়াদিল্লির প্রভাব কমিয়ে দিতে পারে, বিশেষ করে বাংলাদেশে ভারতের অবস্থান দুর্বল হতে পারে বলে তাদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

তবে চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতা কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং এটিকে কেবল ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতার দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন চিয়ান।

মে মাসে বেইজিংয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের সঙ্গে বৈঠকের সময় ওয়াং ইও বলেন, বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সম্পর্ক উন্নয়ন কোনো তৃতীয় পক্ষকে লক্ষ্য করে নয় এবং কোনো তৃতীয় পক্ষের কারণে তা প্রভাবিত হওয়া উচিত নয়। সিনহুয়ার প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

আরো..