https://www.a1news24.com
১৭ই জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৮:০৫

ইরানের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে ট্রাম্পের সঙ্গে দ্বন্দ্ব, বিপদে নেতানিয়াহু

রয়টার্স: ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ভেবেছিলেন, ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে যৌথভাবে পরিচালিত যুদ্ধ তেহরানের ধর্মীয় শাসকদের ক্ষমতাচ্যুত করবে এবং ইসরায়েলে আসন্ন নির্বাচনের আগে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান আরও শক্তিশালী করবে।

নেতানিয়াহু নিজেকে এমন এক মার্কিন-ইসরায়েলি জোটের রূপকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছিলেন, যা মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক বাস্তবতাই পাল্টে দেবে।

কিন্তু বাস্তবে এর কোনোটি ঘটেনি। বরং এর পরিবর্তে ইসরায়েলে দীর্ঘতম সময় ধরে দায়িত্ব পালনকারী প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু এখন ট্রাম্পের সঙ্গে মুখোমুখি দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ার পথে রয়েছেন। কারণ, ট্রাম্প নিজেকে এই যুদ্ধ থেকে সরিয়ে নিতে চাইছেন, অথচ দুই নেতারই লক্ষ্য পূরণ হয়নি এবং লেবাননে ইসরায়েলের সামরিক অভিযানও ওই শান্তিচুক্তির কারণে আটকে গেছে।

এ মুহূর্তে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে সতর্ক অবস্থান নিয়েছেন, যাতে তাঁদের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মিত্রকে ক্ষুব্ধ করতে না হয়। ট্রাম্প সমালোচকদের প্রতি সংবেদনশীল এবং দ্রুত তাঁদের প্রতি বিরক্ত হয়ে পড়ার জন্য পরিচিত।

ট্রাম্পকে ক্ষুব্ধ করতে না চাইলেও ব্যক্তিগত আলাপচারিতায় চুক্তি নিয়ে ইসরায়েলিদের হতাশা স্পষ্ট। ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক এ চুক্তি ‘ইসরায়েলের জন্য ভয়াবহ’ বলে বর্ণনা করেছেন একজন জ্যেষ্ঠ ইসরায়েলি কর্মকর্তা। তিনি নাম প্রকাশ করতে চাননি। খোলামেলা মূল্যায়নে তিনি বলেছেন, ‘প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে সেনাবাহিনীর প্রধান পর্যন্ত—ইসরায়েলের নেতৃত্বে এমন কেউ নেই, যিনি এটিকে ভিন্নভাবে দেখছেন।’

ওয়াশিংটন বলছে, যুদ্ধবিরতি কার্যকর থাকাকালে আগামী ৬০ দিনের মধ্যে তারা একটি পূর্ণাঙ্গ চুক্তির শর্তাবলি নিয়ে আলোচনা করবে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের উদ্বেগগুলো, বিশেষ করে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি সম্পর্কিত উদ্বেগ সমাধানের চেষ্টা করা হবে।

তবে ইসরায়েলি কর্মকর্তারা রয়টার্সকে বলেছেন, তাঁদের ধারণা এই চুক্তির অধীন নির্ধারিত আলোচনার সময়সীমা সম্ভবত আরও বাড়ানো হবে। ফলে ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়বে। অথচ তাদের উদ্বেগগুলোর সমাধান তখনো হবে না।

লেবাননে ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযান সীমিত করতে ইসরায়েলের অনীহা নিয়ে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্পের মধ্যে বারবার মতবিরোধ হয়েছে। লেবাননে ইসরায়েলের হামলা বন্ধ হওয়া (যুদ্ধবিরতি প্রস্তাবে) ইরানের অন্যতম প্রধান দাবি।

এ মাসের শুরুতে ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তির চেষ্টা চালানোর সময় বৈরুতে হামলা না করার নির্দেশ দিয়ে ট্রাম্প এক ক্ষুব্ধ ফোনালাপে নেতানিয়াহুকে ‘পুরোপুরি পাগল’ বলেছিলেন। সেদিন নেতানিয়াহু হামলার পরিকল্পনা স্থগিত করেছিলেন। তবে এক সপ্তাহ পর তিনি বৈরুতের দক্ষিণাঞ্চলীয় উপশহরগুলোতে হামলা চালান। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান ইসরায়েলের ওপর ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায় এবং ট্রাম্প প্রকাশ্যে উভয় পক্ষকেই তিরস্কার করেন।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান তাদের চুক্তি ঘোষণা করার কয়েক ঘণ্টা আগে, গত রোববার ইসরায়েল আবারও লেবাননের রাজধানীতে হামলা চালিয়েছিল। এর আগে লেবানন থেকে ইসরায়েলের দিকে রকেট নিক্ষেপ করা হয়। ট্রাম্প এসব হামলাকে ‘ছোটখাটো ও অর্থহীন’ বলে বর্ণনা করেছিলেন।

পরে গতকাল সোমবার রাতে জেরুজালেমে এক সংবাদ সম্মেলনে নেতানিয়াহু স্বীকার করেন, তাঁর ও ট্রাম্পের মধ্যে কখনো কখনো মতপার্থক্য হয়।

নেতানিয়াহু বলেন, ‘তিনি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট, আমি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী। আমরা অনেক সময়ই একমত হই, আবার এমন সময়ও আসে, যখন মতভেদ হয়। আমার দায়িত্ব ইসরায়েলের নিরাপত্তা স্বার্থ নিশ্চিত করা।’

আগামী অক্টোবরে ইসরায়েলে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা। এবারের ভোটে নেতানিয়াহুর পরাজয়ের পূর্বাভাস পাওয়া যাচ্ছে। একই সময় তিনি ইসরায়েলি জনমতের চাপের মুখে রয়েছেন। জনমত জরিপগুলোতে দেখা যাচ্ছে, ইসরায়েলের নিরাপত্তার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের অঙ্গীকার নিয়ে ইসরায়েলিদের আস্থা ক্রমেই কমছে।

‘ইরান–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তি মানতে বাধ্য নই’

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সমঝোতা স্মারকটি আগামী শুক্রবার সুইজারল্যান্ডে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাক্ষরিত হওয়ার কথা রয়েছে। চুক্তির সুনির্দিষ্ট শর্তাবলি তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি, তবে মধ্যস্থতাকারী পাকিস্তান জানিয়েছে, চুক্তিতে লেবাননসহ সব ফ্রন্টে সামরিক অভিযান স্থায়ীভাবে বন্ধ করার কথা রয়েছে।

নেতানিয়াহু বলেছেন, ইসরায়েল দক্ষিণ লেবানন থেকে তাদের সেনাবাহিনী প্রত্যাহার করবে না এবং হিজবুল্লাহর হামলার বিরুদ্ধে ‘পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণের স্বাধীনতা’ ধরে রাখবে। তিনি সাংবাদিকদের বলেন, ‘ইরান চেয়েছিল, আমরা যেন সেখান থেকে সরে যাই, কিন্তু আমরা নিজেদের অবস্থানে দৃঢ়ভাবে রয়েছি।’

এই চুক্তির ফলে হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন আবার শুরু হবে, তবে তেহরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ভবিষ্যৎ এখনো ঠিক হয়নি। চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য যে ৬০ দিন সময় বেঁধে দেওয়া হয়েছে সেই সময়ের মধ্যে এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসার চেষ্টা করা হবে। এ সময়ে একটি স্থায়ী চুক্তির দিকে অগ্রসর হওয়ার প্রচেষ্টাও করা হবে।

ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করার সময় এর যৌক্তিকতা তুলে ধরতে নেতানিয়াহু ও ট্রাম্প উভয়েই ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি নিয়ন্ত্রণ এবং তেহরান–সমর্থিত আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর প্রতি তাদের সমর্থন আটকানোর কথা বলেছিলেন। চুক্তি নিয়ে সামনের আলোচনায় এ বিষয়গুলো অ্যাজেন্ডা হিসেবে রয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে না।

তিনজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেছেন, ইসরায়েলের ধারণা, ৬০ দিনের এ অন্তর্বর্তী চুক্তির সময় খুব সম্ভবত ৯০ দিন পর্যন্ত বাড়ানো হবে।এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আলোচনার মাধ্যমে একটি বিস্তৃত চুক্তির দিকে এগিয়ে যাবে এবং এ অঞ্চলে নিজেদের সামরিক উপস্থিতি বজায় রাখবে।

আরও দুজন ইসরায়েলি কর্মকর্তা বলেন, গত সপ্তাহে ট্রাম্প যখন প্রথম জানান, ইরানের সঙ্গে একটি চুক্তি প্রায় চূড়ান্ত, ইসরায়েল এ খবরে পুরোপুরি বিস্মিত হয়েছিল। তাঁরা স্বীকার করেন, ইসরায়েল আলোচনার ওপর প্রভাব ফেলতে খুব একটা সফল হয়নি।

ইসরায়েলের এসব কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেছেন। কারণ, তাঁদের প্রকাশ্যে বক্তব্য দেওয়ার অনুমতি নেই।নেতানিয়াহু দীর্ঘদিন ধরে ইসরায়েলি জনগণের সামনে নিজেকে রিপাবলিকান ট্রাম্পের সঙ্গে সম্পর্ক সামলাতে বিশেষভাবে দক্ষ একজন নেতা হিসেবে উপস্থাপন করে আসছেন।

ট্রাম্পের প্রথম মেয়াদে ইসরায়েল ওয়াশিংটন থেকে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পরিবর্তন আদায় করতে সক্ষম হয়েছিল। এর মধ্যে ছিল যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাস জেরুজালেমে স্থানান্তর ও আব্রাহাম চুক্তিকে সমর্থন করা। এ চুক্তির মাধ্যমে ইসরায়েলের সঙ্গে সংযুক্ত আরব আমিরাত ও বাহরাইনের আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপিত হয়।

অন্যদিকে ট্রাম্প ওবামা প্রশাসনের সময় করা ‘ইরান পারমাণবিক চুক্তি’ বাতিল করেন, যেটিকে ইসরায়েল দীর্ঘদিন ধরে খুবই শিথিল বা দুর্বল বলে অভিযোগ করে আসছিল।২০১৯ সালের নির্বাচনের সময় নেতানিয়াহু তেল আবিব ও জেরুজালেমে বিশাল প্রচারণা বিলবোর্ড স্থাপন করেন। সেখানে তাঁকে ও ট্রাম্পকে হাসিমুখে হাত মেলাতে দেখা যায়।

কিন্তু এখন যুক্তরাষ্ট্র–ইরান চুক্তি নেতানিয়াহুর সেই দাবিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। তিনি একসময় বলতেন, ট্রাম্পের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তাঁকে অন্য প্রধানমন্ত্রী প্রার্থীদের থেকে আলাদা করে তুলেছে। কিন্তু এবার তিনি ইসরায়েলি জনগণের কাছে এই চুক্তিটি গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন না বলে মনে করেন বার-ইলান বিশ্ববিদ্যালয়ের রাজনৈতিক বিজ্ঞানী জোনাথন রিনহোল্ড।

রিনহোল্ড বলেন, ‘এখন তিনি (নেতানিয়াহু) সর্বোচ্চ যে আশা করতে পারেন তা হলো, তাঁরা চূড়ান্ত কোনো চুক্তিতে পৌঁছাতে ব্যর্থ হবে এবং ৬০ দিনের মধ্যে যুদ্ধ আবার শুরু হবে। এমনটা হলে পরিস্থিতি ইসরায়েলের পক্ষে সুবিধাজনক হবে।’

গত শুক্রবার ইসরায়েল ডেমোক্রেসি ইনস্টিটিউট প্রকাশিত এক জনমত জরিপ অনুযায়ী, মাত্র ৪১ শতাংশ ইহুদি ইসরায়েলি মনে করেন, তাঁদের নিরাপত্তা ট্রাম্পের জন্য একটি কেন্দ্রীয় বিবেচ্য বিষয়। অথচ গত মার্চে ৬৪ শতাংশ ইসরায়েলি এটা বিশ্বাস করতেন।

নেতানিয়াহুর জ্বালানিমন্ত্রী এলি কোহেন বলেছেন, ইরান যদি আবার তার পারমাণবিক ও ক্ষেপণাস্ত্র সক্ষমতা পুনর্গঠন করে, তবে ইসরায়েল এককভাবে পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত থাকবে। তবে তিনি মনে করেন, ট্রাম্পের মেয়াদকালে তেহরানের এমন পদক্ষেপ নেওয়ার সম্ভাবনা কম।

আরো..