ছাদের পলেস্তরা খসে অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচল শিশু ঋদ্ধি
গাছতলায় চলছে পাঠদান, উৎকণ্ঠায় শিক্ষক-অভিভাবকরা
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি:বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলার ৮৪ নম্বর অশোক নগর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে চরম ঝুঁকির মধ্যে চলছে শিক্ষাকার্যক্রম। ছাদের পলেস্তরা খসে পড়ে অল্পের জন্য প্রাণে বেঁচে গেছে চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী ঋদ্ধি নাগ। এ ঘটনার পর থেকে আতঙ্কে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা আর ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের ভেতরে প্রবেশ করছেন না। বর্তমানে বিদ্যালয়ের খোলা মাঠে গাছতলায় চলছে পাঠদান কার্যক্রম।
ছোট্ট ঋদ্ধি নাগ। কোমলমতি এক শিশু শিক্ষার্থী। প্রতিদিনের মতো সেদিনও ক্লাসরুমের এক কোণে চুপচাপ বসে পাঠ শুনছিল সে। হঠাৎ বিকট শব্দ। মুহূর্তেই ছাদের বিশাল অংশের পলেস্তরা খসে পড়ে তার একেবারে পাশে। অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পায় ঋদ্ধি। আতঙ্কে গুটিসুটি হয়ে বসে থাকা শিশুটিকে দ্রুত উদ্ধার করেন শিক্ষকরা।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, উপজেলার চরবানিয়ারী ইউনিয়নে অবস্থিত বিদ্যালয়টি ১৯৮৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। ২০০০ সালে নির্মিত বিদ্যালয়ের একমাত্র ভবনটিতে ছোট-বড় মিলিয়ে রয়েছে চারটি কক্ষ। দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ভবনের প্রতিটি কক্ষেই বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের পলেস্তরা খসে পড়ে মেঝেজুড়ে ছড়িয়ে আছে ধ্বংসাবশেষ।
এমন ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশের মধ্যেই প্রতিদিন পাঠদান ও পাঠগ্রহণ করছিলেন ৪ জন শিক্ষক ও প্রায় ৬০ জন শিক্ষার্থী।
গত ১৪ মে দুপুরে ক্লাস চলাকালে হঠাৎ একটি শ্রেণিকক্ষের ছাদ থেকে বিশাল অংশের পলেস্তরা খসে পড়ে শিক্ষার্থী ঋদ্ধি নাগের পাশেই। বিকট শব্দে মুহূর্তেই পুরো বিদ্যালয়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শিক্ষকরা দ্রুত ছুটে এসে ভীতসন্ত্রস্ত ঋদ্ধিকে উদ্ধার করেন।
ঘটনার পর বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তপতি গোলদার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে লিখিত আবেদন করেন। এরপর থেকে ঝুঁকি এড়াতে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম ভবনের বাইরে খোলা মাঠে পরিচালনা করা হচ্ছে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ঋদ্ধি নাগ, আমিষা আক্তার, নিরব বাড়ই, রিক মন্ডল, সেজুতি মন্ডল ও পাপড়ি মন্ডল জানায়, ছাদ ধসের ঘটনার পর তারা খুব ভয় পেয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ কক্ষে তারা আর ক্লাস করতে চায় না।
অভিভাবকদের মধ্যেও বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ। শিক্ষার্থী অভিভাবক মিলন মন্ডল, অখিল নাগ ও হরলাল ঘরামি বলেন, “অল্পের জন্য শিশুটির প্রাণ রক্ষা পেয়েছে। এখন সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে ভয় লাগে। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তপতি গোলদার জানান, বিষয়টি উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তাকে অবহিত করা হয়েছে। তিনি আপাতত ভবনের বারান্দায় পাঠদান চালিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিলেও প্রচণ্ড রোদ ও গরমের কারণে শিক্ষার্থীদের কথা চিন্তা করে মাঠের গাছতলায় ক্লাস নেওয়া হচ্ছে।
চিতলমারী উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা অচ্যুতানন্দ দাস বলেন, “ঘটনাটি জানার পর সংশ্লিষ্ট বিদ্যালয়কে বিকল্প উপায়ে পাঠদান চালিয়ে যেতে বলা হয়েছে। কারণ ক্লাস তো বন্ধ রাখা যাবে না।”
রোববার (১৭ মে) দুপুর ২টায় চিতলমারী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা খাদিজা আক্তার বলেন, “আমি বর্তমানে জেলার একটি সভায় আছি। প্রধান শিক্ষকের আবেদন পেয়েছি কিনা এই মুহূর্তে নিশ্চিত বলতে পারছি না। তবে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয় ভবনটি ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকলেও সংস্কার কিংবা নতুন ভবন নির্মাণে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। দ্রুত নতুন ভবন নির্মাণ অথবা জরুরি সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
একদিকে প্রচণ্ড গরম, অন্যদিকে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের আতঙ্ক—সব মিলিয়ে খোলা আকাশের নিচে অনিশ্চয়তার মধ্যে চলছে কোমলমতি শিশুদের শিক্ষাজীবন। এলাকাবাসীর আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।