https://www.a1news24.com
৫ই আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ১২:০৬

বর্ষাতেও নেই দেশি মাছ

রংপুরের ‘মৎস্য ভান্ডার’ কাউনিয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে ৪১ প্রজাতির দেশি মাছ

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ একসময় ‘পুটি মাছের কাঙালি, ভাত মাছের বাঙালি’ এই প্রবাদটি দেশের গ্রামীণ জীবনের বাস্তব চিত্র তুলে ধরত। নদী-নালা, খাল-বিল ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে মিলত নানা প্রজাতির দেশি মাছ। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে সেই চিত্র এখন অনেকটাই বদলে গেছে। রংপুরের ‘মৎস্য ভাÐার’ হিসেবে পরিচিত কাউনিয়া উপজেলায়ও দিন দিন কমে যাচ্ছে দেশি মাছের উৎপাদন। স্থানীয়দের দাবি, মৎস্য বিভাগের কার্যকর নজরদারির অভাব, অবাধে রিং ও কারেন্ট জাল ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক জলাশয়ের অবক্ষয়ের কারণে প্রায় ৪১ প্রজাতির দেশি মাছ বিলুপ্তির পথে।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জানা গেছে, মুক্ত জলাশয়, নদী, খাল, বিল ও জলাভ‚মিতে চলতি বর্ষা মৌসুমে গত বছরের তুলনায় প্রায় অর্ধেক মাছ পাওয়া যাচ্ছে। ফলে বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দামও বেড়েছে কয়েক গুণ। স্থানীয়দের ধারণা ছিল, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হলে বাজারে দেশি মাছের সরবরাহ বাড়বে। কিন্তু এ বছর আশানুরূপ বৃষ্টিপাত হলেও বাজারে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণ দেশি মাছ মিলছে না।

স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নজরদারির অভাব এবং মৎস্যসম্পদ সংরক্ষণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রাকৃতিক জলাশয়ে মাছের উৎপাদন কমে গেছে। একসময় এসব জলাশয়ে শিং, মাগুর, কই, টেংরা, শোল, বোয়াল, আইড়, গড়াই, বালিয়া, ভেদা, বাইম, পুটি, খলিশা, চান্দা, চিংড়ি, ফলি, গতা, পয়া, বউপুটি, কালবাউশ, সোনামুখী, বৈরাতিসহ নানা প্রজাতির দেশি মাছ পাওয়া যেত। বর্তমানে এসব মাছ খুব কমই চোখে পড়ে।

উপজেলার গদাই গ্রামের বাসিন্দা শাজাহান মন্ডল বলেন, “একসময় তিস্তা ও মানাস নদীতে প্রচুর দেশি মাছ পাওয়া যেত। এখন নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে খেতা জাল, রিং ও কারেন্ট জাল ব্যবহার করে নির্বিচারে মাছ ধরা হচ্ছে। এতে ডিমওয়ালা মা মাছ ও ছোট মাছও রক্ষা পাচ্ছে না।”

নিজপাড়া গ্রামের মোতালেব ফকির বলেন, “দশ বছর আগেও বর্ষা মৌসুমে গ্রামের মানুষ তিস্তা নদী ও প্রাকৃতিক জলাশয় থেকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত ছোট মাছ ধরে শুকিয়ে সংরক্ষণ করতেন। অনেকে সিদলও তৈরি করতেন। এখন সেই দৃশ্য আর দেখা যায় না। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারির অভাবই এর অন্যতম কারণ।”

কাউনিয়ার মাছ ব্যবসায়ী ভোলারাম দাস বলেন, “প্রাকৃতিক মাছের আবাসস্থল ধ্বংস, ছোট মাছ সংরক্ষণে সরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগের অভাব এবং কৃষিজমিতে অতিরিক্ত রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহারের কারণে দেশি মাছ দ্রæত হারিয়ে যাচ্ছে।”

এ বিষয়ে কাউনিয়ার সাবেক উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফারজানা আক্তার বলেন, “কৃষিজমিতে অতিরিক্ত সার ও কীটনাশকের ব্যবহার, ডিমওয়ালা মা মাছ নিধন, অভয়াশ্রমের অভাব এবং দেশি মাছ সংরক্ষণে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় দেশি মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের দাবি, বর্ষা মৌসুমের শুরুতে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য দেশি মাছ আহরণ বন্ধ রাখা, রিং ও কারেন্ট জালসহ অবৈধ জালের ব্যবহার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ, নদী ও জলাশয়ে অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করলে বিলুপ্তপ্রায় দেশি মাছের উৎপাদন আবারও বৃদ্ধি করা সম্ভব।

আরো..