সমান শ্রম, অসম মজুরি:
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ বাংলাদেশে শ্রমিকদের সুরক্ষায় একাধিক আইন ও বিধিমালা থাকলেও রংপুরের কাউনিয়া উপজেলায় তার কার্যকর বাস্তবায়ন নেই। ফলে শ্রমিকদের ঘাম ঝরানো শ্রমের যথাযথ মর্যাদা ধুলোয় মিশে যেতে বসেছে। বিশেষ করে নারী, শিশু ও প্রান্তিক শ্রমিকরা ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং শ্রম আইনে স্বীকৃত মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে, কাউনিয়ায় নারী শ্রমিকরা পুরুষ শ্রমিকদের পাশাপাশি সমান পরিশ্রম করলেও মজুরিতে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই নারী শ্রমিকের চাহিদা বেশি হলেও তারা ন্যায্য পারিশ্রমিক পাচ্ছেন না। বিশেষ করে হারাগাছ এলাকার বিড়ি কারখানাগুলোতে নারী শ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কঠোর পরিশ্রম করেও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। এছাড়া ধান রোপণ, ধান কাটা, ধান মাড়াই, মাটি কাটা, রাইস মিল, চাতাল, হোটেল, ইটভাটা, রাজমিস্ত্রীর জোগালির কাজ, পাথর ভাঙাসহ বিভিন্ন ভারী কাজে পুরুষের পাশাপাশি কাজ করলেও নারী শ্রমিকদের পারিশ্রমিক তুলনামূলক কম দেওয়া হয়।
কালের বিবর্তনে কৃতদাস প্রথা বিলুপ্ত হলেও শ্রমজীবী মানুষের প্রতি বৈষম্য পুরোপুরি দূর হয়নি। বিভিন্ন সময়ে শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় আইন প্রণয়ন করা হলেও বাস্তবে তার যথাযথ প্রয়োগ এখনও প্রশ্নবিদ্ধ।বৈষম্যের শিকার দুই নারী শ্রমিক আরিফা ও রুপালি বেওয়া বলেন, “জিনিসপত্রের যে দাম, কাজ করে যে টাকা পাই তাতে সংসার চলে না। যা পাই, তা দিয়েই কোনোমতে খেয়ে-না-খেয়ে বেঁচে আছি।”
একটি বেসরকারি সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, কাউনিয়া উপজেলায় প্রায় সাত হাজার নারী শ্রমিক বিভিন্ন খাতে কাজ করছেন। কিন্তু তাদের অনেকেই শ্রম আইনের কার্যকর সুরক্ষা পাচ্ছেন না; বরং নানা ধরনের বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন।
বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বাস্থ্যসেবা, নির্ধারিত কর্মঘণ্টা, ন্যূনতম মজুরি, সাপ্তাহিক ছুটি ও অন্যান্য মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করার বিধান রয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এসব আইনের প্রয়োগ অত্যন্ত দুর্বল। পরিদর্শকের সংকট, নিয়মিত তদারকির অভাব এবং মালিকপক্ষের গাফিলতির কারণে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে কাজ করছেন শ্রমজীবী মানুষ। এক কথায়, কাউনিয়ায় শ্রম আইন যেন নীরবে কাঁদছে।
সচেতন মহলের মতে, শ্রম আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা গেলে শ্রমিকদের নিরাপত্তা ও অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। পাশাপাশি শ্রমিকবান্ধব পরিবেশ সৃষ্টি হলে দেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিও আরও শক্তিশালী হবে। এজন্য সরকারের কঠোর তদারকি, নিয়মিত পরিদর্শন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করার বিকল্প নেই।
বর্তমান বাস্তবতায় শ্রম আইন কার্যকর না হওয়ায় কাউনিয়ার হাজারো শ্রমিকের ঘাম ঝরানো শ্রমের যথাযথ ম‚ল্যায়ন হচ্ছে না; বরং তাদের শ্রমের মর্যাদা প্রতিনিয়ত ধুলোয় মিশে যাচ্ছে। ”