নিজস্ব প্রতিবেদক- চট্টগ্রামের রাউজানের সাবেক সংসদ সদস্য এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরী কারাগারে, আর তাঁর ছেলে ফারাজ করিম চৌধুরী ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে প্রকাশ্যে নেই। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর একদিকে বাবার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে বিচারিক প্রক্রিয়া, অন্যদিকে ছেলের আত্মগোপন—দুই ভিন্ন বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে পরিবারটি।
এমন পরিস্থিতিতে ফজলে করিম চৌধুরীর পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর কথা জানিয়ে চিঠি দিয়েছেন ফিলিপাইনের হাউস অব রিপ্রেজেন্টেটিভসের সদস্য লেইলা এম. দে লিমা।
১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ তারিখে ফারাজ করিম চৌধুরীর উদ্দেশে দেওয়া এক চিঠিতে দে লিমা বলেন, ১৫ সেপ্টেম্বর ফারাজের পাঠানো চিঠি তিনি পেয়েছেন। সেখানে তাঁর বাবা এ বি এম ফজলে করিম চৌধুরীর বর্তমান পরিস্থিতির কথা জেনে তিনি সহমর্মিতা প্রকাশ করেন।
চিঠিতে দে লিমা উল্লেখ করেন, ২০১৭ সালের ২৪ মে আটক থাকার ৯০তম দিনে IPU-এর প্রতিনিধিদলের সঙ্গে ফজলে করিম চৌধুরীর সাক্ষাতের বিষয়টি তাঁর এখনও মনে আছে।
ফজলে করিমের আটকের পরিস্থিতি, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসেবার অভাব এবং ন্যায্য বিচারসংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। চিঠিতে ‘দ্বৈত/ভুয়া সাক্ষ্যবিবৃতি’ এবং প্রসিকিউশনের পক্ষ থেকে ঘুষ দেওয়ার অভিযোগের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এগুলো চিঠিতে উত্থাপিত অভিযোগ; স্বাধীনভাবে এসব অভিযোগের সত্যতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবি চিঠিতে নেই।
দে লিমা আরও বলেন, অতীতে ফজলে করিম চৌধুরী এমন ব্যক্তিদের একজন ছিলেন, যারা তাঁর নিজের ওপর একই ধরনের অন্যায় পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার সময় তাঁর পাশে দাঁড়িয়েছিলেন।
চিঠিতে তিনি ফারাজ, তাঁর বাবা এবং পুরো পরিবারের জন্য ন্যায্য ও নিরপেক্ষ বিচারের আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আটক অবস্থায় ফজলে করিমের সঙ্গে মানবিক আচরণেরও আহ্বান জানান তিনি।
কারাগারে সাবেক এমপি এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর আত্মগোপনে চলে যান ফজলে করিম চৌধুরী। ১২ সেপ্টেম্বর ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া সীমান্ত এলাকা থেকে তাঁকে আটক করে বিজিবি। পরে তাঁকে চট্টগ্রামে এনে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয় এবং রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়।
২০২৬ সালে তাঁর বিরুদ্ধে জুলাই-আগস্টের আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রামে হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলাও বিচারিক পর্যায়ে রয়েছে। এ মামলায় মোট ২২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের জুনে অসুস্থতার কারণে ফজলে করিমকে অ্যাম্বুলেন্সে করে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে নেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে, ২০২৪ সালের আগস্টে রাউজানে একটি ভাঙচুরের ঘটনায় ফজলে করিম ও তাঁর ছেলে ফারাজ করিমসহ ৬৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা হওয়ার তথ্য প্রকাশিত হয়।
ফারাজের সামনে ভিন্ন বাস্তবতা
ফারাজ করিম একসময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানবিক কর্মকাণ্ড ও বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের কারণে পরিচিতি পান। ২০২৪ সালের আগস্টের আন্দোলনের সময় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকেও আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থনের কথা প্রকাশ্যে আসে। ৩ আগস্ট তাঁর মা রিজওয়ানা ইউসুফ ফেসবুক লাইভে এসে পারিবারিক পরিস্থিতির কথা তুলে ধরেছিলেন; একই সময়ে ফারাজও আন্দোলনকারীদের প্রতি সমর্থনের কথা জানান।
এরপর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের সঙ্গে তাঁর প্রকাশ্য উপস্থিতি কমে যায়। একই সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে করা মামলাগুলোও চলমান রয়েছে।
এদিকে, ফজলে করিমের দুই ছেলে ফারাজ করিম ও ফারহান করিমের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার খবরও ২০২৫ সালে প্রকাশিত হয়েছিল। দুদকের তদন্তের অংশ হিসেবে ওই নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়েছিল বলে আদালত-সংশ্লিষ্ট তথ্যের বরাতে জানিয়েছিল সংবাদমাধ্যম।
রাজনীতির বাইরে মানবিক প্রশ্ন
ফজলে করিম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর বিচার হওয়া এবং অভিযোগের সত্যতা আদালতের মাধ্যমে নির্ধারিত হওয়া—দুটিই আইনি প্রক্রিয়ার বিষয়। একইভাবে তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধেও যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর নিষ্পত্তি আদালতেই হওয়ার কথা।
এর মধ্যেই ফিলিপাইনের রাজনীতিক লেইলা দে লিমার চিঠিটি সামনে আনছে আরেকটি মানবিক প্রশ্ন—অভিযোগের বিচার চলবে, কিন্তু বিচারাধীন একজন মানুষের আটকাবস্থা, চিকিৎসা ও মানবিক মর্যাদা কি একই সঙ্গে নিশ্চিত করা যায় না?
চিঠির শেষাংশে দে লিমা জানিয়েছেন, ফজলে করিমের পরিস্থিতি সম্পর্কে আরও তথ্য ও সহায়ক নথি পেলে তিনি তা একটি জনসম্মুখের সংহতি-বিবৃতি তৈরিতে কাজে লাগাতে চান। অর্থাৎ, ফজলে করিমের বিরুদ্ধে থাকা অভিযোগের বিচারিক নিষ্পত্তির পাশাপাশি তাঁর পরিবার এখন যে বিচ্ছিন্নতা, অনিশ্চয়তা ও আইনি বাস্তবতার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—সেটিও আন্তর্জাতিক পরিসরে আলোচনায় আসতে শুরু করেছে।