https://www.a1news24.com
২৪শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৯:০০

সুন্দরবনের অর্থমূল্য সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকা, তবু সুরক্ষায় কতটা উদ্যোগ?

পর্যটন, জীবিকা ও উপকূল সুরক্ষায় বিশাল অবদান; অবৈধ শিকার, বিষ দিয়ে মাছ ধরা, দূষণ ও সীমিত জনবলে প্রশ্নের মুখে বন সংরক্ষণ

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জীবন-জীবিকা, উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল, জীববৈচিত্র্যের নিরাপদ আশ্রয় এবং দেশের পর্যটন অর্থনীতির অন্যতম সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র—বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন। বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ এই বন শুধু প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্যের আধার নয়; প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জাতীয় অর্থনীতিতেও রাখছে গুরুত্বপূর্ণ অবদান।

একটি সমীক্ষা অনুযায়ী, পর্যটন, প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে উপকূলীয় জনপদকে সুরক্ষা এবং সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবিকার মাধ্যমে প্রতিবছর দেশের অর্থনীতিতে সুন্দরবনের অবদান প্রায় ৫ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। তবে গবেষকদের মতে, সুন্দরবনের প্রকৃত অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত মূল্য এর চেয়েও বহুগুণ বেশি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব ফরেস্ট্রি অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স (আইএফইএস) পরিচালিত ওই সমীক্ষায় সুন্দরবনের বিভিন্ন সেবার অর্থনৈতিক মূল্যায়ন করা হয়। ইউএসএআইডি, উইনরক ইন্টারন্যাশনালসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কারিগরি ও আর্থিক সহযোগিতায় পরিচালিত গবেষণায় সুন্দরবনের পর্যটন, দুর্যোগ সুরক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা—এই তিনটি গুরুত্বপূর্ণ খাতকে বিশেষভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়।

পর্যটনে বছরে ৪১৪ কোটি টাকা

সুন্দরবনের অপরূপ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, রয়েল বেঙ্গল টাইগার, হরিণ, বানরসহ নানা বন্যপ্রাণী এবং নদী-খালের নৈসর্গিক পরিবেশ প্রতিবছর দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকৃষ্ট করে। রাসমেলা ও বনবিবির মেলার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজনও সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনে নতুন মাত্রা যোগ করেছে।

সমীক্ষায় দেখা গেছে, সুন্দরবনের পর্যটন খাত থেকে প্রতিবছর প্রায় ৪১৪ কোটি টাকা অর্থনৈতিক মূল্য সৃষ্টি হয়।

দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ সুন্দরবনে এলেও পর্যটকদের সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রয়েছে নানা অভিযোগ। বনের অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক নেই। জরুরি চিকিৎসা, সুপেয় পানি, নিরাপদ জেটি ও রাতযাপনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেই। অনেক ওয়াচ টাওয়ার ও অবকাঠামোও সংস্কারের প্রয়োজন রয়েছে।

পর্যটকদের নিরাপত্তা ও সুবিধা বাড়াতে নতুন ইকোপার্ক স্থাপন, পুরোনো ইকোপার্ক সংস্কার, ওয়াচ টাওয়ার উন্নয়ন এবং দ্রুতগতির নৌযান কেনার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে বন বিভাগ।

ঘূর্ণিঝড়ের বিরুদ্ধে প্রাকৃতিক দুর্গ

সুন্দরবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেবাগুলোর একটি হলো উপকূলীয় জনপদকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে সুরক্ষা দেওয়া। বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট ঘূর্ণিঝড়ের প্রবল বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত অনেকাংশে শোষণ করে নেয় এই ঘন ম্যানগ্রোভ বন।

বিশেষ করে সিডর, আইলা, বুলবুলসহ একের পর এক প্রাকৃতিক দুর্যোগে সুন্দরবন দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের জন্য প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করেছে।

সমীক্ষা অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ের সময় বসতবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও অন্যান্য সম্পদ রক্ষার মাধ্যমে সুন্দরবন প্রতিবছর প্রায় ৩ হাজার ৮৮১ কোটি টাকার অর্থনৈতিক সুবিধা দিয়ে থাকে।

অর্থাৎ সুন্দরবনের গাছ শুধু কাঠ বা বনজ সম্পদ নয়—একটি বিশাল উপকূলীয় জনপদকে রক্ষার জন্য প্রতিনিয়ত বিনামূল্যে কাজ করে চলেছে প্রকৃতির এই সবুজ প্রাচীর।

৩৫ লাখ মানুষের জীবন-জীবিকার আশ্রয়

সুন্দরবনের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল মানুষের সংখ্যা প্রায় ৩৫ লাখ। মাছ, কাঁকড়া, মধু, মোম, গোলপাতা ও অন্যান্য বনজ সম্পদ সংগ্রহ করে উপকূলের বহু পরিবার জীবিকা নির্বাহ করে।

সমীক্ষায় সুন্দরবনের সম্পদের ওপর মানুষের নির্ভরতা থেকে বছরে প্রায় ১ হাজার ১৬১ কোটি টাকার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

স্থানীয় জেলেদের বড় একটি অংশ মাছ ও কাঁকড়া আহরণের সঙ্গে যুক্ত। অন্যদিকে মৌয়াল, বাওয়ালি ও বনজ সম্পদ সংগ্রহকারী বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর জীবিকার সঙ্গেও সুন্দরবনের সম্পর্ক গভীর।

তবে জীবিকার এই নির্ভরতা যেন বনের জন্য ধ্বংসের কারণ না হয়, সেদিকে বিশেষ নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

সুরক্ষা ও সংরক্ষণে বড় চ্যালেঞ্জ

সুন্দরবনের অর্থনৈতিক মূল্য যতই বিশাল হোক, বাস্তবে বনটি নানা ধরনের হুমকির মুখে রয়েছে। অবৈধভাবে মাছ শিকার, বিষ প্রয়োগ, বন্যপ্রাণী শিকার, অবৈধ প্রবেশ, নদী-খালে দূষণ এবং বনজ সম্পদের অনিয়ন্ত্রিত আহরণ সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় হুমকি।

পরিবেশকর্মীদের অভিযোগ, রাজস্ব আদায় ও বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাপের কারণে অনেক সময় বনের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি হচ্ছে।

অন্যদিকে বন বিভাগের সীমিত জনবল ও জলযানের কারণে সুন্দরবনের বিশাল এলাকায় সার্বক্ষণিক নজরদারি চালানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।

বন রক্ষায় স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগ

সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা এ জেড এম হাসানুর রহমান বলেন, সুন্দরবন পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ প্রাকৃতিক ম্যানগ্রোভ বন। এটি টিকিয়ে রাখতে সরকার বিভিন্ন ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করছে।

তিনি জানান, সুন্দরবনসংলগ্ন ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মাধ্যমে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সুন্দরবনের প্রাণী, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষার বিষয়ে সচেতন করা হচ্ছে।

তার মতে, সুন্দরবন রক্ষায় স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণ আরও বাড়াতে হবে।

দরকার বিকল্প জীবিকা

বিশেষজ্ঞদের মতে, সুন্দরবনের ওপর স্থানীয় মানুষের নির্ভরতা কমাতে হলে তাদের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। শুধু আইন প্রয়োগ করে বন রক্ষা সম্ভব নয়; একই সঙ্গে বননির্ভর মানুষের জীবন-জীবিকার নিরাপদ বিকল্প নিশ্চিত করতে হবে।

সুন্দরবন রক্ষায় জাতীয় তহবিল গঠন, পরিবেশবান্ধব ইকো-ট্যুরিজম, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর প্রশিক্ষণ ও ঋণ সহায়তা, পর্যটকদের প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, স্পর্শকাতর এলাকায় পর্যটক চলাচল সীমিত করা এবং বনের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ম্যানগ্রোভ বনায়ন বাড়ানোর সুপারিশও উঠে এসেছে বিভিন্ন গবেষণায়।

সুন্দরবনের প্রকৃত মূল্য আরও অনেক বেশি

গবেষকদের মতে, সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার হিসাব সুন্দরবনের পূর্ণ অর্থনৈতিক মূল্য নয়। কার্বন সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য, মাটির স্থিতিশীলতা, জলবায়ু নিয়ন্ত্রণ, পানি পরিশোধনসহ সুন্দরবনের অসংখ্য পরিবেশগত সেবার পূর্ণ আর্থিক মূল্য নির্ধারণ করা অত্যন্ত কঠিন।

অর্থাৎ সুন্দরবনকে শুধু বছরে কত টাকা আয় করে—এই হিসাব দিয়ে মূল্যায়ন করলে বনের প্রকৃত গুরুত্ব কখনোই বোঝা যাবে না।

সরকারের বক্তব্য

পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিমন্ত্রী লায়ন ডক্টর শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, সুন্দরবন জনগণের সম্পদ এবং জনগণকেই এই বন রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

তিনি জানান, সীমিত জনবল ও জলযান নিয়েই বন বিভাগ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সুন্দরবন সুরক্ষায় কাজ করছে। দূষণ ও অবৈধ কর্মকাণ্ড রোধে নিয়মিত কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। তবে মানুষের মধ্যে সচেতনতা তৈরি না হলে এসব অপরাধ পুরোপুরি বন্ধ করা কঠিন।

অঙ্গীকার হোক সুন্দরবন বাঁচানোর

সুন্দরবন শুধু একটি বন নয়—এটি দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের নিরাপত্তা, অর্থনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা একটি প্রাকৃতিক ঢাল।

বছরে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার কোটি টাকার অর্থনৈতিক অবদান রাখার পাশাপাশি যে বন কোটি কোটি মানুষের জীবন ও সম্পদ রক্ষা করছে, সেই বনকে রক্ষায় বিনিয়োগকে ব্যয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

সুন্দরবন বাঁচলে উপকূল বাঁচবে, উপকূল বাঁচলে মানুষের জীবন-জীবিকা নিরাপদ থাকবে। তাই বন ধ্বংস করে স্বল্পমেয়াদি লাভ নয়—সুন্দরবন সংরক্ষণ, স্থানীয় মানুষের বিকল্প জীবিকা এবং পরিবেশবান্ধব উন্নয়নই হোক আগামী দিনের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।

আরো..