https://www.a1news24.com
২৪শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭:৩৪

মোরেলগঞ্জে সুপেয় পানির দাবিতে নাগরিক সমাবেশ ও পদযাত্রা

লবণাক্ততা, জলবায়ু পরিবর্তন ও জলোচ্ছ্বাসে বিপর্যস্ত উপকূল—নিরাপদ পানির দাবিতে সোচ্চার নারী-পুরুষ

 

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির :দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় জনপদ বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলা উপজেলায় সুপেয় পানির সংকট দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। ভূগর্ভস্থ পানিতে অতিরিক্ত লবণাক্ততা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন ও জোয়ারের লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশে নিরাপদ পানির উৎসগুলো ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়েছে। দীর্ঘদিনের এই সংকটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু ও দরিদ্র জনগোষ্ঠী।

নিরাপদ ও সুপেয় পানির সংকট দ্রুত নিরসন এবং উপকূলবাসীর পানির অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে মোরেলগঞ্জে অনুষ্ঠিত হয়েছে নাগরিক সমাবেশ ও পদযাত্রা। সোমবার (২৪ আগস্ট) সকাল ১০টায় মোরেলগঞ্জ উপজেলা পরিষদ চত্বরে এ কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। এতে মোরেলগঞ্জ-শরণখোলার বিভিন্ন এলাকার বিপুলসংখ্যক নারী, স্থানীয় জনগোষ্ঠী, শিক্ষক, যুবসমাজ, কমিউনিটি নেতা, এনজিও প্রতিনিধি ও সাধারণ মানুষ অংশ নেন।

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের ‘সৃজন’ প্রকল্পের সার্বিক সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মসূচিতে উপকূলবাসীর দীর্ঘদিনের পানির কষ্ট, নিরাপদ পানির অভাবে স্বাস্থ্য ও জীবন-জীবিকার ঝুঁকি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব তুলে ধরা হয়।

পানির জন্য দীর্ঘ পথ, সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে নারী ও শিশু

সমাবেশে বক্তারা বলেন, মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় অনেক স্থানেই পানি পান ও দৈনন্দিন ব্যবহারের জন্য অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের সময় লবণাক্ত পানি লোকালয়ে ঢুকে মিষ্টি পানির পুকুর, জলাধার ও অন্যান্য উৎস নষ্ট করে দেয়।

ফলে অনেক পরিবারকে সুপেয় পানির জন্য দূর-দূরান্তে ছুটতে হয়। বিশেষ করে গ্রামীণ ও প্রত্যন্ত এলাকার নারীদের মাথায় কলসি বা বিভিন্ন পাত্র নিয়ে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। এতে সময় ও শ্রমের পাশাপাশি তৈরি হচ্ছে স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা ও সামাজিক নানা ঝুঁকি।

বক্তারা বলেন, একটি পরিবারের নিরাপদ পানির ব্যবস্থা করার দায়িত্ব যখন নারী বা শিশুর ওপর পড়ে, তখন সেটি শুধু পানির সংকট থাকে না; এটি বৈষম্য, স্বাস্থ্যঝুঁকি, শ্রমের অপচয় এবং মানবিক সংকটে রূপ নেয়।

উপকূলের পানির সংকট জলবায়ু সংকটেরই প্রতিচ্ছবি

জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে উপকূলীয় এলাকায় ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অস্বাভাবিক জোয়ার ও লবণাক্ততা বৃদ্ধির প্রবণতা মানুষের জীবনকে ক্রমেই কঠিন করে তুলছে। নদী ও খালের পানিতে লবণাক্ততার প্রভাব বাড়ার পাশাপাশি নিরাপদ মিষ্টি পানির উৎসগুলোও যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে কার্যকারিতা হারাচ্ছে।

এ অবস্থায় উপকূলের মানুষের জন্য নিরাপদ পানির স্থায়ী ব্যবস্থা গড়ে তুলতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ের ওপর গুরুত্ব দেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা।

যেসব দাবি উঠেছে

নাগরিক সমাবেশ ও পদযাত্রা থেকে সুপেয় পানির সংকট নিরসনে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ দাবি উত্থাপন করা হয়। এর মধ্যে রয়েছে—

ব্যক্তি ও কমিউনিটি পর্যায়ে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ ব্যবস্থা সম্প্রসারণ;
সরকারি পুকুর ও জলাধার নিয়মিত খনন ও পুনঃখনন;
বাঁধ সংস্কার ও শক্তিশালী করে লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ বন্ধ করা;
অকার্যকর পিএসএফ (পন্ড স্যান্ড ফিল্টার) দ্রুত মেরামত ও নতুন পিএসএফ স্থাপন;
মানুষের জন্য পানির মান পরীক্ষার সুবিধা সহজলভ্য করা;
ইউনিয়ন পর্যায়ে কমিউনিটি-ভিত্তিক পানি ব্যবস্থাপনা কমিটিকে সক্রিয় করা;
পানি সংগ্রহে নারী ও শিশুদের অতিরিক্ত শ্রম ও ঝুঁকি কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া;
সরকারি-বেসরকারি সংস্থার সমন্বয়ে বাস্তবভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ;
জলবায়ু সহনশীল পানি ব্যবস্থাপনায় পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দ।
নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ

কর্মসূচিতে নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। পানির সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হিসেবে তারা নিজেদের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

বক্তারা বলেন, পানির জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে গিয়ে নারীদের দিনের একটি বড় সময় চলে যায়। এতে পরিবারের কাজ, সন্তানদের যত্ন ও আয়মূলক কর্মকাণ্ড ব্যাহত হয়। অনেক ক্ষেত্রে শিশুরাও পানি সংগ্রহের কাজে যুক্ত হয়। ফলে নিরাপদ পানির সংকট শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও পারিবারিক জীবনেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

উপস্থিত ছিলেন জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা

কর্মসূচিতে বাগেরহাট-৪ (মোরেলগঞ্জ-শরণখোলা) আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম, মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ, স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তা, যুবসমাজের সদস্য, শিক্ষক, কমিউনিটি নেতা, এনজিও প্রতিনিধি ও সাধারণ জনগণ উপস্থিত ছিলেন।

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের সৃজন প্রকল্পের প্রকল্প ব্যবস্থাপক আব্দুল মান্নান বলেন, উপকূলের মানুষের নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করতে এ ধরনের কার্যক্রম ভবিষ্যতেও অব্যাহত থাকবে। মানুষের বাস্তব সমস্যা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সামনে তুলে ধরে টেকসই সমাধানের পথ তৈরি করাই এ ধরনের উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য।

কর্মসূচি সঞ্চালনা করেন জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশনের সৃজন প্রকল্পের ইউনিট ম্যানেজার মো. জিল্লুর রহমান।

পদযাত্রায় উচ্চারিত হয় নিরাপদ পানির দাবি

নাগরিক সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা পদযাত্রায় অংশ নেন। এ সময় উপকূলবাসীর নিরাপদ পানির অধিকার নিশ্চিত করা, দ্রুত পানি সংকট নিরসন, লবণাক্ততার আগ্রাসন রোধ এবং টেকসই পানি ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলার দাবি তুলে ধরা হয়।

পদযাত্রায় অংশ নেওয়া নারী ও স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, বছরের পর বছর ধরে তারা নিরাপদ পানির কষ্ট সহ্য করে আসছেন। বিভিন্ন সময়ে নানা প্রকল্প ও উদ্যোগ নেওয়া হলেও অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। তাই সংকটের স্থায়ী সমাধানে স্থানীয় মানুষের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নের দাবি জানান তারা।

নাগরিক সমাজ ও প্রশাসনের মধ্যে সংলাপ

পদযাত্রা শেষে মোরেলগঞ্জ উপজেলা পরিষদের সভাকক্ষে ‘বাংলাদেশে জলবায়ু পরিবর্তনে বিপদাপন্ন জনগোষ্ঠীর সহনশীলতা ও অভিযোজন সক্ষমতা শক্তিশালীকরণ এবং নাগরিক সমাজের ক্ষমতায়ন (সৃজন) প্রকল্প’-এর আওতায় নাগরিক সমাজ ও স্থানীয় কর্তৃপক্ষের মধ্যে উপজেলা পর্যায়ে সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে নাগরিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন বাগেরহাট-৪ আসনের সংসদ সদস্য অধ্যক্ষ মো. আব্দুল আলীম। এতে সভাপতিত্ব করেন মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. হাবিবুল্লাহ।

সংলাপে উপকূলবাসীর নিরাপদ পানির সংকট, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, স্থানীয় পর্যায়ে পানি ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই সমাধানের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা স্থানীয় মানুষের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও সমস্যাগুলো তুলে ধরেন। একই সঙ্গে পানি সংকট মোকাবিলায় প্রশাসনের কার্যকর, সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।

টেকসই পানি ব্যবস্থাপনাই হতে পারে সমাধানের পথ

উপকূলীয় মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার মানুষের জন্য সুপেয় পানির সংকট নতুন কোনো সমস্যা নয়। তবে জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মাত্রা এবং প্রাকৃতিক পানির উৎসের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ এ সংকটকে আরও জটিল করে তুলেছে।

শুধু সাময়িকভাবে পানি সরবরাহ করে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ, পুকুর ও জলাধার পুনরুদ্ধার, নিরাপদ পানি সরবরাহ অবকাঠামো শক্তিশালী করা, লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ রোধ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে পানি ব্যবস্থাপনায় সম্পৃক্ত করার মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথে এগোতে হবে।

উপকূলবাসীর জন্য নিরাপদ পানি কোনো দয়া বা অনুদান নয়—এটি মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও জলবায়ু সহনশীল পরিকল্পনা বাস্তবায়ন জরুরি।

জাগরণী চক্র ফাউন্ডেশন এ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। এতে সহযোগিতা করছে বিএমজেড ও নেজ বাংলাদেশ।

আরো..