মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল ও ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়নসহ ৪ দফা দাবিতে প্রচারযাত্রার উদ্বোধনী হলো প্রেসক্লাবে
মার্কিন বাণিজ্যচুক্তি বাতিল, ফুলবাড়ী চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়নসহ ৪ দফা দাবিতে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এর উদ্যোগে আজ সকাল ৯টায় আয়োজিত ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী প্রচারযাত্রার উদ্বোধনী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হলো। আজ ২৪ আগস্ট থেকে ২৬ আগস্ট ২০২৬ পর্যন্ত ফুলবাড়ী অভ্যুত্থানের ২০ বছর পূর্তিকে সামনে রেখে ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী পর্যন্ত একটি প্রচারযাত্রার আয়োজন করেছে গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি। ঢাকা থেকে ফুলবাড়ী পর্যন্ত প্রচার যাত্রাটি আয়োজিত হচ্ছে চারটি দাবিতে: (১) দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল; (২) ফুলবাড়ি চুক্তির পূর্ণবাস্তবায়ন; (৩) গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকটের জনবান্ধব সমাধান এবং (৪) জ্বালানি, বিদ্যুৎ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত খাতে বেসরকারিকরণ বন্ধ করা।
আজ ৯টায় উদ্বোধনী সমাবেশে ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে থেকে এই প্রচারযাত্রার আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থানে তৎকালীন বিএনপি সরকারের সাথে ফুলবাড়ীবাসীর পক্ষে চুক্তি সাক্ষরকারী এবং গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ৷ এছাড়াও উদ্বোধনী কর্মসূচিতে বক্তা হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞ মোশাহিদা সুলতানা ঋতু এবং বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্রের প্রেসিডেন্ট সীমা দত্ত। উদ্বোধনী সমাবেশে ‘ফুলবাড়ী তাদের লড়াইয়ের কথা মনে রেখো’ সঙ্গীত পরিবেশন করেছে কোরাস সাংস্কৃতিক সংগঠনের শিল্পী জয়মা মুনমুন। গণতান্ত্রিক ছাত্র জোটের সমন্বয়ক রাফিকুজ্জামান ফরিদ সঞ্চালনা করেন।
সমাবেশে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক মোশাহিদা সুলতানা ঋতু বলেছেন, “একটি দেশের সরকার যখন অনৈতিক হয় এবং সার, বিদ্যুৎ, গ্যাস, জ্বালানি কিছু ব্যবসায়ী ও মাফিয়া গোষ্ঠীর হাঁতে জিম্মি থাকে, তখন সাবঅল্টার্ন সেই কৃষক, শ্রমিকেরা প্রতিবাদ গড়ে তোলে। এখন সারের সংকটে কৃষকদের বিক্ষোভ দেখছি, বিদ্যুৎ এর অভাবে ভোক্তাদের বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করতে দেখছি’। তিনি আরও বলেন, ‘আগের সরকার যে পথে হাঁটছিলো, বর্তমান সরকার সেই একই পথে হাঁটছে। আমরা দেখেছি এর আগে বিদ্যুৎ খাতকে বেসরকারিকরণের ফলে বিদ্যুৎ এর দাম বেড়েছে, কিন্ত সংকট সমাধান হয়নি। আমরা দেখেছি এলপিজি বাজারে অস্থিরতা চলেছে মানুষকে বেশি দাম দিয়ে এলপিজি কিনতে হয়েছে। এখনো সরকার হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করে ৩০ শতাংশ গ্যাস রাশিয়া থেকে আমদানি করে। এই বছরেও ১৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে সরকারকে। অথচ দেশীয় গ্যাস উত্তোলনে বিনিয়োগ করা হয়েছে মাত্র ১ হাজার কোটি টাকা। এই যে দেশীয় সক্ষমতাকে বিকাশ করার ক্ষেত্রে সরকারের বিনিয়োগের যে অনীহা তা প্রমাণ করে, সরকার আসলে বিভিন্ন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর লুটপাটের অর্থনীতিকেই উৎসাহ করছে’।
উদ্বোধনী বক্তব্যে আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘বেশ কিছু দাবি নিয়ে এই প্রচারযাত্রা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এইসবগুলোর দাবিই হচ্ছে সাম্রাজ্যবাদ ও আধিপত্যের বিরুদ্ধে। আমাদের আজকের এই প্রচারযাত্রার মূল লক্ষ্য হলো জনগণের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করা এবং জাতীয় সংকটসমূহের জনবান্ধব সমাধান করা। কোন দেশের সরকার যদি জনগণের বিরুদ্ধে যায়, তবে জনগণের অধিকার ও দায়িত্ব হচ্ছে সরকারের বিরোধিতা করা এবং দেশের ভবিষ্যৎকে নিরাপদ ও জনগণের পক্ষে রাখা। তিনি আরও বলেন, ‘এই প্রচারযাত্রার অন্যতম দাবি হচ্ছে মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করা। নির্বাচনের মাত্র তিনদিন আগে অন্তর্বর্তীসরকার এই চুক্তি করে বাংলাদেশকে একটি মহাবিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে। এবং এখন সংসদে সরকারি এবং বিরোধীপক্ষ উভয়ই এই চুক্তির ভয়াবহতা নিয়ে নীরব রয়েছে এবং সেইগুলো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিচ্ছে। আনু মুহাম্মদ আরও বলেন, ২০০৬ সালে ফুলবাড়িতে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থানের প্রেক্ষিতে তৎকালীন বিএনপি জামায়াত জোটের সরকারের প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া আন্দোলনকারীদের সাথে একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত করেছিলেন। সেই চুক্তির মূল কথা ছিলো বাংলাদেশের স্বার্থবিরোধী আর কোন উন্নয়ন প্রকল্প হবে না, উন্মুক্ত খনি তৈরি হবে না এবং জনগণের সম্মতি ছাড়া কোন উন্নয়ন প্রকল্প হবে না। সেই চুক্তি স্বাক্ষরের ২০ বছর পর আবার বিএনপি সরকার এখন ক্ষমতায়। আমরা উদ্বিগ্ন হচ্ছি যে, যেই চুক্তি খালেদা জিয়া করে গিয়েছিলেন, সেই চুক্তি বাতিলের কথা বলছেন যখন বর্তমানে প্রধানমন্ত্রী তাঁর পুত্র তারেক রহমান। সুতরাং সেই তৎপরতার মুখে ফুলবাড়ি চুক্তির পুর্ণাঙ্গ বাস্তবায়নের দাবি নিয়ে আমরা এই প্রচার যাত্রা করছি।
উল্লেখ্য ২৪ আগস্ট ২০২৬ প্রচার যাত্রাটি জাতীয় প্রেসক্লাব থেকে শুরু করে গাজীপুর চৌরাস্তায় পথসভা, মাওলানা ভাসানীর মাজারে শ্রদ্ধা নিবেদন, টাংগাইল শহরে সমাবেশ, সিরাজগঞ্জের কড্ডার মোড়ে পথসভা, বগুড়ার শেরপুরে পথসভা করে রাতে বগুড়া শহরে গিয়ে বিরতি নেবে। পরদিন ২৫ আগস্ট সকালে বগুড়ায় সমাবেশ, দুপুরে গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে পথসভা, দিনাজপুরের বিরামপুরে পথসভা এবং বিকালে দিনাজপুর শহরে সমাবেশ করে রাতে ফুলবাড়িতে গিয়ে বিরতি দেবে। পরদিন ২৬ আগস্ট ফুলবাড়ীতে ফুলবাড়ী গণঅভ্যুত্থান দিবসের কর্মসূচীতে অংশগ্রহণ করে, ফুলবাড়ী শহীদ মিনারে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিহতে জীবন উৎসর্গ এবং মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করার শপথ গ্রহণ করার মধ্য দিয়ে প্রচারযাত্রাটি শেষ হবে। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির উদ্যোগে দেশবিরোধী মার্কিন বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আয়োজিত “মার্কিন বাণিজ্য চুক্তির বিপদের প্রদর্শনী”র আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন হবে ফুলবাড়ীতে ২৬ আগস্ট।