পারমাণবিক শক্তিচালিত একটি সাবমেরিন থেকে গত সোমবার প্রশান্ত মহাসাগরে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের (আইসিবিএম) পরীক্ষা চালায় চীন। এ নিয়ে দেশটি যুক্তরাষ্ট্র, জাপান, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডের তোপের মুখে পড়েছে। তারা এ ঘটনাকে বেইজিংয়ের সম্প্রসারণবাদী অবস্থানের প্রদর্শন হিসেবে দেখছে।তথ্যসূত্র: ইনডিপেনডেন্ট
চীনের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত সোমবার দুপুর ১২টা ১ মিনিটে একটি সাবমেরিন থেকে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রটি ছোড়া হয়। কয়েক হাজার কিলোমিটার উড়ে যায় এটি। তবে এতে কোনো বিধ্বংসী গোলা ছিল না।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়ার খবরে বলা হয়, বার্ষিক সামরিক প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করা হয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট দেশকে নিশানা করে নয়।এটি ছিল প্রায় দুই বছর পর প্রশান্ত মহাসাগরে চীনের আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের প্রথম পরীক্ষামূলক উৎক্ষেপণ।
চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাও নিং বলেন, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পুরো প্রক্রিয়া নিরাপদে এবং নির্ধারিত মানদণ্ড ও পেশাদারত্ব বজায় রেখেই পরিচালিত হয়েছে।
অস্ট্রেলিয়া, জাপানসহ কয়েকটি দেশ অভিযোগ করেছে, উৎক্ষেপণের মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে বেইজিং তাদের এ বিষয়ে জানিয়েছিল। এ প্রসঙ্গে মাও নিং বলেন, সংশ্লিষ্ট দেশগুলো বিষয়টিকে অতিরঞ্জিতভাবে ব্যাখ্যা করবে না বলে তাঁরা আশা করেন।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা ক্ষেপণাস্ত্রটির উৎক্ষেপণ পর্যবেক্ষণ করেছে এবং নিশ্চিত হয়েছে যে এটি প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণাঞ্চলে গিয়ে পড়েছে।
ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাটির বিষয়ে কী জানা গেছে
মার্কিন প্রতিরক্ষা সদর দপ্তর পেন্টাগনের মতে, এটি ছিল একটি দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র, যা চীনের উপকূলীয় জলসীমা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের মূল ভূখণ্ডে আঘাত হানতে সক্ষম।
চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা সিনহুয়া গত মঙ্গলবার ক্ষেপণাস্ত্রটির একটি ছবি প্রকাশ করেছে। তবে এর বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হয়নি। ছবিটি দেখে ধারণা করা হচ্ছে, এটি জেএল-২ অথবা জেএল-৩ ধাঁচের আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র। দুটিই সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র।
চীনের রাষ্ট্র-সমর্থিত সংবাদপত্র গ্লোবাল টাইমস বলেছে, এটি সম্ভবত জেএল-৩, যা চীনের সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রগুলোর মধ্যে সবচেয়ে আধুনিক। গত বছর এক সামরিক কুচকাওয়াজে প্রথমবারের মতো এটি প্রদর্শন করা হয়।
জেএল-৩ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ১০ হাজার কিলোমিটারের বেশি। অন্যদিকে পুরোনো জেএল-২ ক্ষেপণাস্ত্রের সর্বোচ্চ পাল্লা প্রায় ৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার।
সোমবার উৎক্ষেপণ করা ক্ষেপণাস্ত্রটি অন্তত ৭ হাজার ৩০০ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছে। যদি সেটি সত্যিই জেএল-২ হয়ে থাকে, তবে এটি তার সর্বোচ্চ পাল্লায় পরীক্ষা করা হয়েছে।
এ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা কেন উদ্বেগ তৈরি করেছে
চীনের এ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা এমন এক সময়ে হয়েছে, যখন দেশটির সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও আঞ্চলিক মিত্রদের ব্যাপক উত্তেজনা চলছে। তা ছাড়া পরীক্ষাটি করা হয়েছে প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চলে। এ কারণে যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও নিউজিল্যান্ডের উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
১৯৮৬ সালে রারোটোঙ্গা চুক্তির মাধ্যমে এ অঞ্চলকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত ঘোষণা করা হয়। চীন ১৯৮৭ সালে চুক্তিটির সংশ্লিষ্ট প্রটোকলে অনুমোদন দেয়। এর মাধ্যমে দেশটি ওই অঞ্চলে পারমাণবিক অস্ত্রের পরীক্ষা না চালানো এবং সেখানে ভূখণ্ড থাকা চুক্তিভুক্ত দেশগুলোর বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের হুমকি না দেওয়ার অঙ্গীকার করে।
যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর বলেছে, বিশ্বজুড়ে বড় সংঘাত চলার এ সময়ে চীনের এমন পদক্ষেপ পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ ও বিস্তার রোধে আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে ক্ষুণ্ন করছে।
পররাষ্ট্র দপ্তরের মুখপাত্র টমি পিগট বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি জোর দিয়ে পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার ঠেকানোর চেষ্টা করছে, তখন চীন ঠিক উল্টোপথে হাঁটছে।’
মুখপাত্র চীনের প্রতি অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ-বিষয়ক আলোচনায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র ও মহাকাশযান উৎক্ষেপণের আগে নিয়মিতভাবে অন্য দেশগুলোকে জানানোর আহ্বান জানান।
অস্ট্রেলিয়ার প্রধানমন্ত্রী অ্যান্টনি আলবানিজ বলেন, এ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা ‘চীনের একটি উসকানিমূলক পদক্ষেপ, যা এ অঞ্চলের স্থিতিশীলতা নষ্ট করছে।’
সলোমন দ্বীপপুঞ্জের রাজধানী হোনিয়ারা সফরকালে আলবানিজ বলেন, ‘এটি ছিল পারমাণবিক অস্ত্র বহনের সক্ষমতাসম্পন্ন আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা, যা পারমাণবিক শক্তিচালিত সাবমেরিন থেকে উৎক্ষেপণ করা হয়েছে। এটি সত্যিই উদ্বেগজনক। কারণ, আমাদের পারমাণবিক অস্ত্র বাড়ানো নয়, কমানো দরকার। আর অল্প সময়ের নোটিশ দিয়ে এ পরীক্ষা চালানো হয়েছে। সেটিও বড় উদ্বেগের বিষয়।’
অস্ট্রেলিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী পেনি ওং বলেন, চীনের দ্রুত সামরিক শক্তি বৃদ্ধি এবং এ বিষয়ে স্বচ্ছতার অভাবের প্রেক্ষাপটে এ পরীক্ষা চালানো হয়েছে। এ অঞ্চলের দেশগুলো চীনের উদ্দেশ্য সম্পর্কে আরও স্বচ্ছ ও বিশ্বাসযোগ্যতা প্রত্যাশা করে।
নিউজিল্যান্ডের পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইনস্টন পিটার্স এ পরীক্ষাকে ‘অনাকাঙ্ক্ষিত ও উদ্বেগজনক’ বলে উল্লেখ করেছেন। নিউজিল্যান্ড সরকারের দাবি, প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল ঘোষিত জলসীমায় ক্ষেপণাস্ত্রটি উৎক্ষেপণ করে চীন একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি লঙ্ঘন করেছে।
চীনের প্রতিবেশী দেশেগুলোর প্রতিক্রিয়া
তাইওয়ান বলেছে, এ ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ভয় দেখানোর জন্য চীনের একটি চেষ্টা।তাইওয়ানের একজন জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা সোমবার বলেন, চীনের নৌবাহিনীর তৎপরতা বেড়েছে। এর মধ্যে রাশিয়ার সঙ্গে তাদের যৌথ মহড়াও রয়েছে, যা তাইওয়ান নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
সলোমন দ্বীপপুঞ্জের প্রধানমন্ত্রী ম্যাথিউ ওয়ালে চীনকে তাঁদের দেশের ভালো বন্ধু বলে উল্লেখ করে বলেন, ‘এটা বন্ধুসুলভ কাজ নয়। এটা আমাদের অঞ্চলের জন্য ভালো নয়।’
ওয়ালে আরও বলেন, ‘চীন, যুক্তরাষ্ট্র বা অন্য যেকোনো দেশই হোক না কেন, আমরা চাই না কেউ প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপপুঞ্জ অঞ্চলে আন্তমহাদেশীয় ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্রের পরীক্ষা চালাক। আমাদের বন্ধু হোন, কিন্তু আমাদের ভয় দেখাবেন না।’
চীন কী বার্তা দিতে চেয়েছে
বিশেষজ্ঞদের মতে, চীনের এই ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার নানা ধরনের তাৎপর্য থাকতে পারে।চীন যখন এ পরীক্ষা চালায়, ঠিক তখনই অস্ট্রেলিয়া ও ফিজি একটি পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করছিল। চুক্তি অনুযায়ী, কোনো একটি দেশ হামলার শিকার হলে অন্য দেশটি তার সহায়তায় এগিয়ে আসবে।
ভারত-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ দ্বীপরাষ্ট্রগুলোয় প্রভাব বিস্তার নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের, বিশেষ করে অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে চীনের প্রতিযোগিতা চলছে। বিশ্লেষকদের কেউ কেউ মনে করছেন, ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার জন্য যে সময় বেছে নেওয়া হয়েছে, তা সেই প্রতিযোগিতার সঙ্গেও সম্পর্কিত হতে পারে।
নিউজিল্যান্ডভিত্তিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণ প্রতিষ্ঠান স্টারবোর্ড মেরিটাইম ইন্টেলিজেনসের বিশ্লেষক মার্ক ডগলাস বলেন, এই পরীক্ষা চালানোর পরিকল্পনা সম্ভবত অনেক আগেই করা হয়েছিল। তবে প্রতিবেশী দেশগুলোকে যে সময়ে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে, সেটি অন্তত দেখার বিষয়।
ইন্টারন্যাশনাল ইনস্টিটিউট ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (আইআইএসএস) চীনের নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা নীতিবিষয়ক জ্যেষ্ঠ গবেষক মেইয়া নাউয়েন্স মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র ও এ নিয়ে উদ্বিগ্ন অন্য দেশগুলো চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা পেতে এ উৎক্ষেপণের ঘটনা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও বিশ্লেষণ করবে।
এই গবেষক আরও বলেন, অস্ট্রেলিয়া-ফিজি প্রতিরক্ষা চুক্তির প্রতি অসন্তোষের বার্তা দিতেও চীন এ পরীক্ষা চালিয়ে থাকতে পারে। তবে তাঁর মতে, এ পদক্ষেপ উল্টো ফলও বয়ে আনতে পারে এবং দক্ষিণ প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর কাছে চীনের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।