https://www.a1news24.com
৮ই জুলাই, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:৪৯

অবিশ্বাস্য প্রত্যাবর্তন, মিসরকে হারিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনা

ক্রীড়া ডেস্ক: লিওনেল মেসির আবারও পেনাল্টি মিস হতাশায় ঢেকে দিল আর্জেন্টাইনদের মুখ। দ্বিতীয়ার্ধে দ্বিতীয় গোল হজমে তাদের মনে ছিটকে পড়ার শঙ্কাও উঁকি দিল জোরেশোরে। তবে ফুটবলের জাদুকর ঠিকই জ্বলে উঠলেন। লড়াইয়ে ফেরার গোলে অবদান রেখে, পরক্ষণেই নিজে করলেন গোল। পথ পেয়ে গেল আর্জেন্টিনা। যোগ করা সময়ে ফের জালে বল জড়িয়ে নাটকীয় জয়ে বিশ্বকাপের কোয়ার্টার-ফাইনালে উঠল শিরোপাধারীরা।

যুক্তরাষ্ট্রের আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে মঙ্গলবার শেষ ষোলোর শ্বাসরুদ্ধকর ম্যাচটি ৩-২ গোলে জিতেছে আর্জেন্টিনা। ৭৮ মিনিট পর্যন্ত ২-০ গোলে পিছিয়ে থাকা দলটি পরের ১৩ মিনিটে করেছে তিন গোল।

ইয়াসির ইব্রাহিম ও মোস্তাফা জিকোর গোলে স্মরণীয় জয়ের খুব কাছে পৌঁছে গিয়েছিল মিশর। মেসির পেনাল্টি মিসের পর আরও অনেক সুযোগ হাতছাড়া হওয়ায় আর্জেন্টিনার বিদায় সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা বলেই মনে হচ্ছিল। তবে মেসি যেন তা মানতে চাইলেন না।

নিজেকে ও দলকে পুনরুজ্জীবিত করতে যা করণীয়, তাই করলেন মেসি। কঠিন সময়ে আরও একবার দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিলেন তিনি। ক্রিস্তিয়ান রোমেরোর গোলে অবদান রাখার পর সমতা টানলেন মেসি, আর যোগ করা সময়ে ব্যবধান গড়ে দিলেন এন্সো ফের্নান্দেস।

পুরো ম্যাচে ৬০ শতাংশের বেশি সময় বল দখলে রেখে গোলের জন্য ১৯টি শট নেয় আর্জেন্টিনা, যার মধ্যে সাতটি ছিল লক্ষ্যে। অন্যদিকে মিশরের পাঁচটি শটের দুটিই ছিল লক্ষ্যে, আর সেখান থেকেই আসে তাদের দুটি গোল।

ম্যাচের প্রথম উল্লেখযোগ্য আক্রমণেই আর্জেন্টিনাকে হতভম্ব করে দেন ইয়াসির ইব্রাহিম। ১৫তম মিনিটে ডান দিক থেকে ছয় গজ বক্সের মুখে দারুণ এক ক্রস বাড়ান মারওয়ান আতিয়া। লিসান্দ্রো মার্তিনেসের চ্যালেঞ্জ সামলে হেডে গোল করেন এই সেন্টার-ব্যাক। জায়গা থেকে নড়ার সুযোগ পাননি এমিলিয়ানো মার্তিনেস।

চার মিনিট পরই সমতায় ফেরার নিশ্চিত সুযোগ আসে আর্জেন্টিনার সামনে। ডি-বক্সে নিকোলাস তালিয়াফিকো ফাউলের শিকার হলে পেনাল্টি পায় তারা। কিন্তু দুর্বল স্পট কিকে হতাশা বাড়ান মেসি।

চলতি আসরে টানা গোল করে বিশ্বকাপের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ২০টি নিজের করে নেওয়ার পরও পেনাল্টি থেকে দ্বিতীয়বার ব্যর্থ হলেন মেসি। গ্রুপ পর্বেও অস্ট্রিয়ার বিপক্ষে তার স্পট কিক ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন প্রতিপক্ষ গোলরক্ষক।

বিশ্বকাপে এ নিয়ে আটটি পেনাল্টি নিয়ে চারবার ব্যর্থ হলেন মেসি।টানা আক্রমণে প্রথমার্ধের বাকি সময়ে আরও কয়েকটি দারুণ সুযোগ তৈরি করে আর্জেন্টিনা। তবে বারবার ব্যর্থতাই তাদের সঙ্গী হয়।

মেসির পেনাল্টি শট আটকানোর পর ২৮তম মিনিটে আলেক্সিস মাক অ্যালিস্টারের জোরালো হেড দারুণ ক্ষিপ্রতায় ঠেকিয়ে দেন মোস্তাফা শুবির। তিন মিনিট পর মেসির নেওয়া ফ্রি কিক পোস্টে লেগে ফিরে আসে।

৩৯তম মিনিটে শুবিরের মজবুত দেয়ালে আটকে যায় আর্জেন্টিনার আরেকটি নিশ্চিত সুযোগ। তালিয়াফিকোর বাড়ানো বল পেয়ে জোরালো নিচু শট নেন হুলিয়ান আলভারেস। নিশ্চিত গোল মনে হলেও অবিশ্বাস্য ক্ষিপ্রতায় ঝাঁপিয়ে বল বাইরে পাঠান ২৬ বছর বয়সী এই গোলরক্ষক।

দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে প্রতিপক্ষের একটি ভুল পাস থেকে ডি-বক্সে বল পেলেও নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারেননি মেসি। কিছুক্ষণ পর আবারও প্রতিপক্ষের চাপে বল হারান তিনি।

অসাধারণ এক পাল্টা আক্রমণে ৫৮তম মিনিটে জালে বল পাঠান মোস্তাফা জিকো। হতাশায় নুইয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার খেলোয়াড় ও সমর্থকেরা। তবে মুহূর্তেই নাটকীয় মোড় নেয় পরিস্থিতি। ওই আক্রমণের শুরুতে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে মারওয়ান আতিয়া ফাউল করেছিলেন বলে দৃশ্য পর্যালোচনার সাহায্যে গোল বাতিল করেন রেফারি।

আট মিনিট পর দুর্দান্ত এক গোলে আগের হতাশা ভুলিয়ে দেন জিকো। প্রতি-আক্রমণে গোলটিতে বড় ভূমিকা ছিল মোহাম্মদ সালাহর। মেসির কর্নার ঠেকিয়ে দ্রুত আক্রমণে ওঠেন তিনি। প্রতিপক্ষের সীমানায় গিয়ে ডান দিকে বল বাড়ান হাসানের উদ্দেশে। পরে হাসানের থ্রু পাস থেকে নিখুঁত শটে এমিলিয়ানো মার্তিনেসকে পরাস্ত করেন জিকো।

অনেক সুযোগ নষ্টের পর ৭৯তম মিনিটে ঘুরে দাঁড়ানোর উপলক্ষ পায় আর্জেন্টিনা। ডি-বক্সের বাঁ দিক থেকে মেসির মাপা ক্রস ছয় গজ বক্সের মুখে পেয়ে হেডে ব্যবধান কমান ক্রিস্তিয়ান রোমেরো।

পাঁচ মিনিটের মধ্যে দ্বিতীয় গোলও আদায় করে নেয় তারা। ডি-বক্সে জটলার মধ্যে মিশর বল ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে গনসালো মন্তিয়েলের কাটব্যাক পেয়ে জোরালো শটে সমতা ফেরান মেসি।

চলতি আসরে এটি মেসির অষ্টম গোল। গোলদাতাদের তালিকায় তিনি আবারও শীর্ষে উঠে যান। তার চেয়ে একটি করে গোল কম কিলিয়ান এমবাপে ও আর্লিং হলান্ডের।বিশ্বকাপের ইতিহাসে সর্বোচ্চ গোলদাতার মোট গোল এখন ২১টি। আর জাতীয় দলের হয়ে ২০৪ ম্যাচে মেসির গোলসংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১২৫।

সময় ফুরিয়ে আসছিল। ম্যাচ তখন অতিরিক্ত সময়ে গড়ানোর দিকেই এগোচ্ছিল। তবে অবিশ্বাস্যভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর পর নতুন উদ্দীপনায় খেলতে থাকে আর্জেন্টিনা।একপর্যায়ে আরেকটি সুযোগ পেলেও মেসির ছোট করে বাড়ানো বল গোলমুখে পেয়েও হেড লক্ষ্যে রাখতে পারেননি লাউতারো মার্তিনেস।

তবে যোগ করা সময়ের দ্বিতীয় মিনিটে আর রক্ষা হয়নি মিশরের। ডান দিক থেকে লাউতারো মার্তিনেসের ক্রস ছয় গজ বক্সের বাইরে পেয়ে নিখুঁত হেডে জয়সূচক গোল করেন এন্সো ফের্নান্দেস।

ভীষণ কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে পাওয়া এই জয়ের উচ্ছ্বাসের বহিঃপ্রকাশ ঘটে শেষ বাঁশি বাজার পর। কান্নায় ভেঙে পড়েন মেসি। দুই চোখ বেয়ে ঝরতে থাকে আনন্দাশ্রু। ডাগআউটে কোচ লিওনেল স্কালোনির চোখেও দেখা যায় আনন্দের অশ্রু।

আরো..