https://www.a1news24.com
২৩শে জুন, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৭:৪০

‎‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত

‎আজ ২৩ জুন মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০ টায় রাজধানীর পল্টনের ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে ‘বাজেট ২০২৬ পর্যালোচনা: উন্নয়ন দর্শন ও কাঠামোগত সমস্যা’ শীর্ষক আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটি এর আয়োজন করে। সভায় আলোচনা করেন প্লাটফর্মটির সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. মোশাহিদা সুলতানা, ডা. হারুন অর রশিদ, অধ্যাপক ড. গোলাম রসুল, চলচ্চিত্র নির্মাতা আকরাম খান, মাহতাব উদ্দীন আহমেদ এবং ডা. সুরাইয়া ইয়াসমিন পলি। সভাপ্রধান হিসেবে বক্তব্য রাখেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির সদস্য অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ।‎

‎অধ্যাপক গোলাম রসুল বলেন, “সরকার এই বাজেটকে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির দিকে যাত্রা’ বলছে। অথচ আমরা দেখেছি এ বাজেট পুরোপুরি আমলানির্ভর। বাজেটে বিশেষজ্ঞ, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ জনগণের প্রায় অংশগ্রহণ নাই বললেই চলে। এছাড়া বাজেটকে গণতান্ত্রিক করতে হলে বাজেটকে বিকেন্দ্রীভূত করতে হবে। অথচ আমাদের বাজেটের ৯৩ ভাগই খরচ হয় সচিবালয় থেকে। স্থানীয় সরকার পায় মাত্র ৭ ভাগ। আয় করের তুলনায় পরোক্ষ কর বৃদ্ধিতে জোর দেওয়া হয়েছে। এটা মূল্যস্ফীতি ঘটাবে, যা মধ্যবিত্ত মানুষের উপর চাপ তৈরি করবে। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষিসহ জনগুরুত্বপূর্ণ খাতগুলো বরাবরের মতোই অবহেলিত হয়েছে। এই পরিষেবা খরচও মধ্যবিত্ত-নিন্মবিত্ত মানুষকে বহন করতে হবে। একে ‘গণতান্ত্রিক, মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাজেট’ বলার সুযোগ কোথায়?”‎

‎মোশাহিদা সুলতানা বলেন, ‘বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে আমাদের দেশে প্রয়োজনের থেকে ৬৭০০ মেগাওয়াট বাড়তি ক্যাপাসিটি রয়েছে। এই অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ জনগণকে বহন করতে হচ্ছে। গতবছর ৪২ হাজার কোটি টাকা ক্যাপাসিটি চার্জ দিতে হয়েছে। বিদ্যুৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ মানুষের স্বার্থের কথা ভাবলে সরকার নিশ্চয়ই ক্যাপাসিটি চার্জ প্রত্যাহার করে বিদ্যুতের দাম কমাতে পারত। তা না করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে। অতিরিক্ত বোঝা বহন করেও মানুষকে সারাদেশে ব্যাপক লোডশেডিংয়ের কারণে ভোগান্তির শিকার হতে হচ্ছে। এরমধ্যে ৮৪ শতাংশ লোডশেডিংই হয় গ্রামাঞ্চলে। অথচ সরকার বলছে এই বাজেট অন্তর্ভুক্তিমূলক।’‎

‎মাহতাব উদ্দীন বলেন, ‘কাঠামোগত সমস্যার প্রধান সমস্যা সরকারি ওয়েবসাইটগুলোতে বাজেট সংক্রান্ত তথ্য সজলভ্য না হওয়া। তথ্যের স্বচ্ছতা না থাকায় সাধারণ মানুষের জন্যে বাজেট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়াটা কঠিন হয়ে উঠে। বাজেট হয়ে উঠে দুর্বোধ্য এবং পাণ্ডিত্যের ব্যাপার। বাজেটকে জনগণের জন্যে বোধগম্য করে তোলা দরকার। দ্বিতীয় সমস্যা বাজেটের রাজনৈতিক ব্যবহার। রাজনৈতিক স্বার্থেই জনপ্রশাসন খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়।’

‎ড. হারুন অর রশিদ উল্লেখ করেন, ‘এ বছর হামে শিশু মৃত্যুর সংখ্যা প্রায় সাতশত! অন্তবর্তীকালীন সরকারের টিকা কেনায় অব্যবস্থাপনা, অবহেলা এবং বর্তমান বিএনপি সরকারের চিকিৎসায় অবহেলারই পরিণাম এটা। এছাড়া সারাদেশের সরকারি হাসপাতালগুলোর বেহাল দশার কথা কারোরই অজানা নয়। শ্রীলঙ্কা, নেপালসহ দক্ষিণ এশিয়ার প্রায় সকল দেশেই চিকিৎসা খাতে বরাদ্দ বাংলাদেশের থেকে বেশি। অথচ আমাদের সরকার চিকিৎসার দায়কে ধীরে ধীরে ঘাড় থেকে ঝেড়ে ফেলতে চাচ্ছে।’‎

‎সাংস্কৃতিক বাজেট নিয়ে আলোচনায় আকরাম খান বলেন, ‘সাংস্কৃতিক বাজেট প্রণয়ন করার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক কর্মীসহ অন্যান্য অংশীজনদের যুক্ত করা হয় না। সাংস্কৃতিক প্রকল্পগুলো হয় আমলা নির্ভর ও জনবিচ্ছিন্ন। সাংস্কৃতিক বাজেটের বড় অংশই আমলাদের পিছনে খরচ হচ্ছে, সাংস্কৃতিক চর্চায় ব্যয় যৎসামান্যই হচ্ছে। জেলা-উপজেলায় শিল্পকলা একাডেমিগুলো চরমভাবে অবহেলিত। প্রান্তিক মানুষের সাংস্কৃতিক চর্চার উদ্যোগ খুবই কম। সাংস্কৃতিক খাতকে জনবিচ্ছিন্ন করে রাখার কারণেই সারাদেশে সাংস্কৃতিক চর্চার উপর বাধা নেমে আসছে। বাউলদের উপর অমানবিক আক্রমণ সংঘটিত হয়েছে। সাংস্কৃতিক চর্চা বৃদ্ধির লক্ষ্যে এ খাতে জিডিপির ২% বরাদ্দ এবং এর যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।’‎

‎ড. সুরাইয়া ইয়াসমিন পলি বলেন, ‘৪৬ টি খাতে জেন্ডার বরাদ্দের কথা উল্লেখ করা হলেও এ নিয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিকল্পনা নেই। পর্যাপ্ত ডে-কেয়ার স্থাপন এবং মানসিক স্বাস্থ্য সেবা চালু করা জরুরি। এছাড়া সরকারি হাসপাতালে প্রসবকালীন চিকিৎসা বিনামূল্যে নিশ্চিত করার ব্যবস্থা করা দরকার, বেসরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রসবকালীন চিকিৎসার খরচ নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি।’‎

‎অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেন, ‘সরকার বদলালেও নীতিনির্ধারক পরিবর্তন হয় না। নীতি নির্ধারণ করে আমলারা, দেশের বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এবং বিশ্বব্যাংক-আইএমএফ এর মতো বিদেশি গোষ্ঠী। বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় শ্রমিক, কৃষক, প্রবাসী, নারীসহ বিভিন্ন লৈঙ্গিক বৈচিত্র্যর মানুষ , শিক্ষার্থী-শিক্ষকসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্ট, চিকিৎসা সংশ্লিষ্টসহ নানান শ্রেণি-পেশার অন্যান্য প্রতিনিধিদের কোনো অংশগ্রহণ নেই। তাহলে এই বাজেট কীভাবে গণতান্ত্রিক, মানবিক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক হয়?’‎

‎তিনি আরও বলেন, ‘শেখ হাসিনার রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক দর্শন ছিল উন্নয়ন দর্শন। অন্তবর্তীকালীন সরকার বা বিএনপি সরকারেরও একই দর্শন। উন্নয়ন দর্শনের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া দরকার জনগণ। শ্রেণিগত, লৈঙ্গিক, জাতিগত, ধর্মীয় বৈষম্য কমানো হওয়া দরকার উন্নয়ন দর্শনের লক্ষ্য। কিন্তু আমাদের সরকারের উন্নয়ন দর্শন এর ঠিক উল্টো।’‎

‎তিনি উল্লেখ করেন, ‘নয়াউদারনৈতিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উন্নয়ন দর্শনে মানুষের শিক্ষা-চিকাৎসার সুযোগ নেই, জাতীয় সক্ষমতা ও নিরাপত্তা অবহেলিত হয়। জাতীয় সক্ষমতা বৃদ্ধির কোনো পদক্ষেপ নাই, স্কুলগুলোতে ক্লাসরুম নাই, শিক্ষক নাই। হাসপাতালগুলোতে ডাক্তার নাই, চিকিৎসা সামগ্রী নাই। এই সংকটগুলো সমাধানে কোনো আগ্রহ নাই, অথচ সরকার কেনাকাটা আর প্রকল্পের নামে লুটপাটে খুব আগ্রহী।’

আরো..