গত ৮ এপ্রিল কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতির পরও যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা পুরোপুরি কমেনি। উভয় দেশই নতুন করে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে জড়ানোর আগ্রহ দেখাচ্ছে না, তবে সামরিক প্রস্তুতি এবং পাল্টাপাল্টি অবস্থানের কারণে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে অনিশ্চয়তা এখনো কাটেনি। পাকিস্তান ও কাতারের মধ্যস্থতায় শুরু হওয়া শান্তি প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলেও পরিস্থিতি যে কোনো সময় নতুন মোড় নিতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ওয়াশিংটন ইরানের ওপর চাপ ধরে রাখতে বিমান ও নৌবাহিনীকে কৌশলগত অবস্থানে রেখেছে। অন্যদিকে তেহরানও তাদের সামরিক বাহিনীকে উচ্চ সতর্কতায় রেখে সাম্প্রতিক মার্কিন ও ইসরায়েলি হামলার ক্ষয়ক্ষতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
বিবিসির আন্তর্জাতিক সম্পাদক জেরেমি বোয়েনের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বর্তমান সামরিক অচলাবস্থা ভুল সিদ্ধান্ত বা ভুল বোঝাবুঝির কারণে দ্রুত বড় ধরনের সংঘাতে রূপ নিতে পারে। তার মতে, যুক্তরাষ্ট্র শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ইরানকে আলোচনায় ছাড় দিতে বাধ্য করতে চাইলেও তেহরান স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে যে প্রয়োজনে মধ্যপ্রাচ্যে থাকা মার্কিন ঘাঁটি ও গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার পথে এগোতে উভয় পক্ষ যুদ্ধবিরতি বজায় রাখা এবং ভবিষ্যৎ আলোচনার কাঠামো নির্ধারণে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের বিষয়টি বিবেচনা করছে। তবে পারস্পরিক অবিশ্বাসের কারণে সেই প্রক্রিয়া সহজ হচ্ছে না।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দেয়। বর্তমানে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই নৌপথে সীমিত আকারে জাহাজ চলাচল করছে। প্রণালি পুরোপুরি চালু করতে তেহরান অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার এবং অবরুদ্ধ অর্থ ফেরত দেওয়ার মতো কয়েকটি শর্ত দিয়েছে।
এদিকে বিকল্প রুট ব্যবহার করে তেল পরিবহন অব্যাহত রাখার চেষ্টা করছে উপসাগরীয় দেশগুলো। সৌদি আরব লোহিত সাগরঘেঁষা বন্দর ব্যবহার করছে, আর সংযুক্ত আরব আমিরাত ওমান হয়ে পাইপলাইনের মাধ্যমে আংশিক সরবরাহ বজায় রেখেছে। তবুও বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস সরবরাহে প্রায় ২০ শতাংশ ঘাটতি তৈরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, যার প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চলমান পরিস্থিতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্যও রাজনৈতিক চাপ বাড়িয়েছে। দ্রুত সামরিক সাফল্যের যে প্রত্যাশা ছিল, তা বাস্তবে অর্জিত হয়নি। ট্রাম্প এবং ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ধারণা করেছিলেন, বিমান হামলার মাধ্যমে তেহরানের ওপর কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হবে। কিন্তু ইরানের প্রতিরোধ তাদের সেই হিসাবকে জটিল করে তুলেছে।
জেরেমি বোয়েনের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্য বর্তমান পরিস্থিতি থেকে সহজে সরে আসার সুযোগ সীমিত হয়ে পড়েছে। একইভাবে ইরানও নিজেদের অবস্থান থেকে পিছিয়ে যেতে রাজি নয়। ফলে সামরিক উত্তেজনা দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। এছাড়া যুক্তরাষ্ট্রে ইরানবিরোধী যুদ্ধ নিয়ে জনসমর্থন কমে যাওয়ায় নতুন কোনো সামরিক পদক্ষেপ রাজনৈতিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।
২০১৫ সালে বারাক ওবামা প্রশাসনের সময় স্বাক্ষরিত ইরান পারমাণবিক চুক্তি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার সিদ্ধান্তও নতুন আলোচনায় প্রভাব ফেলছে। নতুন কোনো সমঝোতা হলে তা নিয়ে মার্কিন অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে নতুন বিতর্ক তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
অন্যদিকে ইরানের নেতৃত্ব এই সংকটকে জাতীয় নিরাপত্তা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন হিসেবে দেখছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের চাপ সত্ত্বেও তেহরান তাদের কৌশলগত অবস্থান পরিবর্তনের কোনো ইঙ্গিত দিচ্ছে না।
সংঘাতের প্রভাব উপসাগরীয় দেশগুলোর অর্থনীতিতেও পড়ছে। আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার ওপর নির্ভরশীল দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও উন্নয়ন পরিকল্পনাগুলো অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এ অবস্থায় পাকিস্তান ও কাতার কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। একই সময়ে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইসরায়েলের সঙ্গে নিরাপত্তা সহযোগিতা আরও জোরদার করেছে এবং দেশটিতে ইসরায়েলি ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা ‘আয়রন ডোম’ মোতায়েনের তথ্যও সামনে এসেছে। সৌদি আরব জানিয়েছে, তারা ইরানি হামলার জবাব দিলেও তা মার্কিন-ইসরায়েল জোটের অংশ হিসেবে নয়।
সব মিলিয়ে যুদ্ধবিরতি এখনো বহাল থাকলেও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পরিস্থিতি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সামান্য ভুল পদক্ষেপ বা কৌশলগত ভুল হিসাবও নতুন করে বড় ধরনের সংঘাতের সূচনা করতে পারে।