স্পোর্টস ডেস্ক: ফিফা বিশ্বকাপের পর্দা উঠতে আর মাত্র কয়েক সপ্তাহ বাকি। কিন্তু বাংলাদেশে এখনো দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ খ্যাত টুর্নামেন্টটির অফিশিয়াল সম্প্রচারস্বত্ব চূড়ান্ত হয়নি। যা নিয়ে সাধারণ ফুটবলপ্রেমীদের মনে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। তবে সম্প্রচার বিশেষজ্ঞ এবং বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে ‘বিশ্বকাপ ব্ল্যাকআউট’ বা খেলা দেখা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই।
এই অনিশ্চয়তার মধ্যেই বড় স্বস্তির খবর হলো, দেশের প্রথম বেসরকারি ক্রীড়া চ্যানেল টি-স্পোর্টস এখনো বিশ্বকাপ সম্প্রচার নিয়ে আশাবাদী। স্বত্ব কেনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মহলের সঙ্গে জোরালো আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে তারা। একটি বিশেষ সিন্ডিকেট নিজেদের স্বার্থে ‘বাংলাদেশে খেলা সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যেতে পারে’, এমন ভীতি ছড়িয়ে সরকারি পর্যায়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে সম্প্রচার বিশ্লেষকদের মতে, এই আশঙ্কার বাস্তব ভিত্তি নেই। বাংলাদেশের মতো ফুটবলপ্রেমী ও বড় দর্শক বাজারকে সম্পূর্ণ বঞ্চিত করবে না ফিফা। ব্যবসায়িক ও জনপ্রিয়তার স্বার্থেই শেষ মুহূর্তে ফিফা কোনো না কোনো বিকল্প পথ বের করবে বলে মনে করছেন তারা। অতীতে ইরান বা উত্তর কোরিয়ার মতো দু-একটি দেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারে সীমাবদ্ধতা দেখা গেলেও, সেগুলো ছিল সংশ্লিষ্ট দেশের অভ্যন্তরীণ রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তের কারণে।
আন্তর্জাতিক বাজারে ফিফা কতটা নমনীয় হতে পারে, তার সাম্প্রতিক উদাহরণ চীন। চায়না মিডিয়া গ্রুপের (সিএমজি) কাছে ২০৩১ সাল পর্যন্ত চারটি বিশ্বকাপের স্বত্ব বিক্রির ক্ষেত্রে ফিফা শুরুতে ৩০০ মিলিয়ন ডলার দাবি করলেও শেষ পর্যন্ত ৬০ মিলিয়ন ডলারে চুক্তি করেছে। মূলত যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে প্রায় ১৫ ঘণ্টা সময়ের পার্থক্যের কারণে ফিফাকে এই ছাড় দিতে হয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
এখনো প্রতিবেশী দেশ ভারতের সম্প্রচারস্বত্বও নিশ্চিত হয়নি, যা প্রমাণ করে দরকষাকষি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চলতে পারে। বাংলাদেশে ব্ল্যাকআউটের ঝুঁকি না থাকলেও সম্প্রচারস্বত্ব নির্ধারণে বড় জটিলতা তৈরি হয়েছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের বিজ্ঞাপন বাজার ও সম্প্রচার আয়ের বাস্তবতায় এবারের স্বত্বের যৌক্তিক মূল্য হওয়া উচিত ৪০ থেকে ৫০ কোটি টাকার মধ্যে। বেশ কয়েকটি দেশীয় প্রতিষ্ঠান এই অঙ্কে বিনিয়োগ করতে প্রস্তুতও ছিল।
বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচারের জন্য প্রাথমিক স্বত্ব পেয়েছে সিঙ্গাপুরভিত্তিক মিডিয়া সংস্থা ‘স্প্রিংবক’। অভিযোগ উঠেছে, এই প্রতিষ্ঠানটি ও তাদের দেশীয় সহযোগীরা অতিরিক্ত মুনাফা লাভের আশায় প্রায় ৭.২ মিলিয়ন ডলারে, বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৮৮ কোটি টাকায় স্বত্ব কিনে বাংলাদেশ টেলিভিশনের (বিটিভি) কাছে তা ১০ মিলিয়ন ডলারে, অর্থাৎ প্রায় ১২২ কোটি টাকায় বিক্রির প্রস্তাব দেয়।
এর বাইরে স্যাটেলাইট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম থেকে আরও ৮ মিলিয়ন ডলার (বাংলাদেশি প্রায় ৯৮ কোটি টাকা) আয়ের পরিকল্পনা ছিল তাদের। আকাশচুম্বী দামের কারণেই বিটিভি এবার স্বত্ব কেনা থেকে পিছিয়ে এসেছে। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ে ফিফাকে ৬০ শতাংশ অগ্রিম অর্থ পরিশোধ করতেও ব্যর্থ হয়েছে স্প্রিংবক। অনুসন্ধানে জানা গেছে, এই সিন্ডিকেটটি কাতার বিশ্বকাপের সময়ও সক্রিয় ছিল।
সেবার ‘টেরিস্ট্রিয়াল সম্প্রচারের আলাদা অনুমতি’ লাগবে, এমন বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়ে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিটিভিকে প্রায় ১০০ কোটি টাকা খরচ করতে বাধ্য করা হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠান ‘অ্যাভমোর’ এবং বাংলাদেশের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে হওয়া সেই কৃত্রিম অতিমূল্যায়নের কারণেই ফিফার কাছে বাংলাদেশের বাজারের ভুল চিত্র গেছে। যার প্রভাব পড়ছে ২০২৬ বিশ্বকাপের স্বত্ব নির্ধারণেও।
স্থানীয় প্রতিনিধি ফাহাদ করিম, সাবেক বাফুফে সভাপতি কাজী সালাউদ্দিন, সাবেক ফুটবল কর্মকর্তা আবু নাঈম সোহাগ এবং আতাউল ইসলাম মানিকের মতো প্রভাবশালী ব্যক্তিদের নাম এই চক্রের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছে। একটি বিশেষ মহল নিজেদের স্বার্থে ‘বিশ্বকাপ ব্ল্যাকআউট’-এর ভীতি ছড়িয়ে সরকারি পর্যায়ে চাপ তৈরির চেষ্টা করছে বলে মনে করছেন ক্রীড়া বিশ্লেষকরা।
ক্রীড়া বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সিন্ডিকেটের তৈরি ব্ল্যাকআউটের ভয়কে উপেক্ষা করে এখন রাষ্ট্রীয় স্বার্থ ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে কাতার বিশ্বকাপের আর্থিক লেনদেনের বিষয়ে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলছেন তারা। টি-স্পোর্টস এখনো স্বত্ব কেনার দৌড়ে সক্রিয়ভাবে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই শেষ মুহূর্তে দেশীয় কোনো বেসরকারি টেলিভিশন বা ওটিটি প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমেই বাংলাদেশের দর্শকরা প্রিয় দলের খেলা পর্দায় দেখতে পাবেন এমন সম্ভাবনাই জোরালো।