https://www.a1news24.com
২০শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:১৮

৭৭ লাখের প্রকল্পে ব্যয় ৩০ লাখের কম? কর্ণফুলীতে খাল খননে পিআইও’র পুকুর চুরি!

নিজস্ব প্রতিবেদক: চট্টগ্রামের কর্ণফুলী উপজেলার শিকলবাহা ও চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বরাদ্দ, ব্যয়, শ্রমিক মজুরি ও উপকরণ ব্যবহারের হিসাব নিয়ে একাধিক অসঙ্গতির অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথি, ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য ও কাজের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের বক্তব্যে বিভিন্ন খাতে হিসাবের পার্থক্য পাওয়া গেছে।

প্রকল্প দুটির প্রকৃত ব্যয়, অব্যয়িত অর্থ এবং সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া অর্থের পরিমাণ নিশ্চিত করতে মেজারমেন্ট বুক (এমবি), বিল-ভাউচার, ব্যাংক লেনদেন, শ্রমিক তালিকা, হাজিরা ও কাজের পরিমাপ যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।

নথি অনুযায়ী, শিকলবাহা খাল পুনঃখনন প্রকল্পের দৈর্ঘ্য তিন কিলোমিটার। আলী হোসেন মার্কেট থেকে শিকলবাহা জিলানি গ্যাস পাম্প পর্যন্ত এলাকায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নের কথা রয়েছে।

নথিতে শ্রমিক মজুরি বাবদ ৩৮ লাখ ৩৬ হাজার ৬১০ টাকা, নন-ওয়েজ খাতে ৩৮ লাখ ৮৭ হাজার ৯৩৩ টাকা এবং শ্রমিক সর্দার ভাতা ৪ হাজার ৩০০ টাকা উল্লেখ করে মোট বরাদ্দ দেখানো হয়েছে ৭৭ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।

তবে কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, এ প্রকল্পের বরাদ্দ ছিল প্রায় ৬৬ লাখ টাকা। অর্থাৎ নথিতে উল্লেখিত বরাদ্দের সঙ্গে তাঁর বক্তব্যের পার্থক্য ১১ লাখ ২৮ হাজার ৮৪২ টাকা।

পিআইওর ভাষ্য অনুযায়ী, ভ্যাটসহ প্রকল্পে প্রায় ২৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। এর মধ্যে মূল কাজের ব্যয় প্রায় ২৪ লাখ ৬৬ হাজার টাকা। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় প্রায় ৩৪ লাখ টাকা সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। তবে অর্থ ফেরতের চালান বা সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

শ্রমিক সর্দারের কাজের মূল্য নিয়ে তিন হিসাব

খাল পুনঃখননের কাজে আলী আকবর ও মোহাম্মদ জাফর নামে দুই শ্রমিক সর্দার যুক্ত ছিলেন।
আলী আকবরের কাজের মূল্য নিয়ে পাওয়া গেছে তিন ধরনের তথ্য। পিআইওর হিসাবে তাঁর কাজের মূল্য প্রায় সাড়ে তিন লাখ টাকা।

ইউনিয়ন পরিষদের সচিবের তথ্য অনুযায়ী, কাজের মূল্য ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। অন্যদিকে আলী আকবর নিজে জানিয়েছেন, তিনি পেয়েছেন ২ লাখ ৫ হাজার টাকা। তিন পক্ষের দেওয়া তথ্যের মধ্যে এ পার্থক্যের প্রকৃত কারণ জানতে সংশ্লিষ্ট বিল-ভাউচার ও ব্যাংক লেনদেন যাচাই প্রয়োজন।

মোহাম্মদ জাফরের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পার্থক্য পাওয়া গেছে। পিআইওর দাবি, তাঁকে প্রায় ১৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। ইউনিয়ন পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর কাজের মূল্য ১৩ লাখ ৩৬ হাজার ৪০০ টাকা। এর মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ১১ লাখ ২৪ হাজার এবং পিআইওর মাধ্যমে আরও ২ লাখ ১২ হাজার টাকা দেওয়ার তথ্য রয়েছে। দুই হিসাবের মধ্যে পার্থক্য প্রায় ২ লাখ ৬৩ হাজার ৬০০ টাকা।

৩০টি পাইপের কথা, স্থাপন হয়েছে ১৮টি

প্রকল্পে ৩০টি পাইপ স্থাপনের কথা থাকলেও বাস্তবে ১৮টি পাইপ স্থাপনের তথ্য পাওয়া গেছে। ইউনিয়ন পরিষদের হিসাবে এ খাতে ব্যয় প্রায় ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অন্যদিকে পিআইও জানিয়েছেন, ব্যয় হয়েছে প্রায় ৪ লাখ টাকা।

সংশ্লিষ্টদের দেওয়া হিসাবে প্রতি পাইপের দাম প্রায় ৭ হাজার টাকা হলে ৩০টি পাইপের মূল্য দাঁড়ায় ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। স্থাপনসহ প্রকৃত ব্যয় কত হয়েছে, তা বিল-ভাউচার ও সরেজমিন পরিমাপের মাধ্যমে যাচাই প্রয়োজন।

পিআইওর ভাষ্য অনুযায়ী, শিকলবাহা খালের পাড়ে ৩০০টি বৃক্ষের চারা রোপণ করা হয়েছে। এ বাবদ প্রকল্পের হিসাবে ব্যয় দেখানো হয়েছে ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি চারার পেছনে গড়ে প্রায় ৮৩৩ টাকা ব্যয়ের হিসাব পাওয়া যায়। তবে এর মধ্যে চারা, পরিবহন, রোপণ ও অন্যান্য ব্যয় কীভাবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, তা সংশ্লিষ্ট কাগজপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে না।

শ্রমিক মজুরি নিয়েও প্রশ্ন

প্রকল্পের শ্রমিক মজুরি নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। কয়েকজনের নামে শ্রমিক হিসেবে ব্যাংক হিসাব খোলা এবং প্রত্যেককে ১ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা থাকলেও কেউ কেউ টাকা পাননি বলে দাবি করেছেন।

এ ছাড়া শ্রমিক তালিকায় থাকা কয়েকজন প্রকল্পে কাজই করেননি বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে শ্রমিক তালিকা, হাজিরা খাতা, ব্যাংক স্টেটমেন্ট ও মজুরি বিতরণ তালিকা মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

খোয়াজনগর-দোনের খালেও হিসাবের পার্থক্য

ইউনিয়ন পরিষদ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, খোয়াজনগর থেকে দোনের খাল পুনঃখনন প্রকল্পে বরাদ্দ ছিল ১ কোটি ২৮ লাখ ৭৮ হাজার ৫৩৭ টাকা।
খোয়াজনগর অংশের কাজের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল চরপাথরঘাটা ইউনিয়ন বিএনপির আহ্বায়ক শেখ আহমেদকে। আর খালের ব্রিজঘাট অংশের কাজ দেওয়া হয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাঈন উদ্দিনকে।

শেখ আহমেদ বলেন, তিনি খালের খোয়াজনগর অংশে অল্প পরিমাণ পুনঃখননের কাজ করেছেন। কাজের বিল হিসেবে তাঁকে ৯০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছে। খননকাজে খরচ পোষাতে না পারায় তিনি কাজ বন্ধ করে দেন।

মঈন উদ্দিন বলেন, খোয়াজনগর খালের ব্রিজঘাট অংশে তিনি ৭৭০ ফুট কাজ করেছেন। কাজের মজুরি হিসেবে তাঁকে ১ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে।
খাল খননের বাইরে তাঁকে দিয়ে অন্যান্য কাজও করানো হয়েছে দাবি করে মঈন উদ্দিন বলেন, যথাযথ হিসাব করলে পিআইওর কাছে তাঁর আরও টাকা পাওনা রয়েছে। তবে পরবর্তীতে তিনি আর তা দাবি করেননি।

অন্যদিকে পিআইও সুজন কান্তি দাশের ভাষ্য অনুযায়ী, খোয়াজনগর খাল পুনঃখননে মোট প্রায় ৫ লাখ ১০ হাজার টাকা ব্যয় হয়েছে। নতুন অর্থবছর শুরু হওয়ায় অব্যয়িত অর্থ সরকারি কোষাগারে ফেরত দেওয়া হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।

শিকলবাহা ও খোয়াজনগর প্রকল্পে বরাদ্দের অঙ্ক, শ্রমিক সর্দারদের কাজের মূল্য, পাইপ স্থাপন, শ্রমিক মজুরি এবং অব্যয়িত অর্থ ফেরতের বিষয়ে একাধিক তথ্য পাওয়া গেছে। তবে এসব তথ্যের সবগুলো এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এ অবস্থায় প্রকল্প দুটির প্রকৃত আর্থিক চিত্র স্পষ্ট করতে মেজারমেন্ট বুক, অনুমোদিত প্রকল্প প্রস্তাব, বিল-ভাউচার, ব্যাংক হিসাব, শ্রমিক তালিকা ও হাজিরা, উপকরণ ক্রয়ের কাগজপত্র এবং সরকারি কোষাগারে অর্থ ফেরতের চালান যাচাই করে কারিগরি ও আর্থিক নিরীক্ষার দাবি উঠেছে।

অভিযোগের বিষয়ে কর্ণফুলী উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) সুজন কান্তি দাশ বলেন, “বেশ কয়েকটি গণমাধ্যমে লেখালেখি করল। কেন করা হচ্ছে বুঝে আসে না। আমি তো কোনো অনিয়ম করি নাই।”

আরো..