https://www.a1news24.com
২রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৫:০৭

রংপুরের কাউনিয়ায় ট্রাক্টরের দাপটে হারিয়ে যাচ্ছে গরু-মহিষের হাল

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ আবহমানকাল থেকে বাংলাদেশের গ্রামবাংলায় ফজরের নামাজ পড়ে কৃষকেরা গরু-মহিষ ও লাঙ্গল-জোয়াল কাঁধে নিয়ে মাঠে বেরিয়ে পড়তেন জমি চাষ করতে। ভোরের নীরবতা ভেঙে শোনা যেত গরু-মহিষ তাড়ানোর হাঁকডাক। কৃষকের সেই চিরচেনা দৃশ্য এখন অনেকটাই অতীত। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে কৃষকের হাতে এসেছে ইঞ্জিনচালিত ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলার। ফলে যান্ত্রিক যুগে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব গ্রামীণ ঐতিহ্য গরু-মহিষের হাল।

একসময় কাউনিয়া উপজেলার অধিকাংশ কৃষকের বাড়িতেই দেখা যেত বাঁশ-কাঠের তৈরি লাঙ্গল, জোয়াল, মই, গরু-মহিষের মুখে লাগানোর টোনা এবং হালচাষের জন্য এক জোড়া বলদ, গাই গরু কিংবা মহিষ। কিন্তু বর্তমানে উপজেলার গ্রাম-গঞ্জে সেই চিরচেনা দৃশ্য আর সচরাচর চোখে পড়ে না। ট্রাক্টর ও পাওয়ার টিলারের দাপটে দ্রুত বিলীন হয়ে যাচ্ছে গরু-মহিষ দিয়ে হালচাষের ঐতিহ্য।

সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, আগের মতো ‘হঃ হঃ ডাইন ডাইন, বাও বাও’ বলে কৃষকের গরু তাড়িয়ে মাঠে যাওয়ার দৃশ্য নেই। তবে কাউনিয়ায় কিছু পরিবার এখনো ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক হিসেবে গরু-মহিষের হাল ধরে রেখেছেন। শাশ্বত গ্রামবাংলায় জমি চাষের একটি চিরায়ত পদ্ধতি ছিল গরু-মহিষের হাল।
পশ্চিম নিজপাড়া গ্রামের কৃষক নাছির উদ্দিন জানান, গরু-মহিষের হাল ছিল অনেক উপকারী একটি পদ্ধতি। লাঙ্গলের ফলা জমির মাটির গভীর অংশ পর্যন্ত আলগা করত। গরুর পায়ের কারণে জমিতে কাদা তৈরি হতো এবং গরুর গোবর জমিতে পড়ে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি করত।

গদাই গ্রামের কৃষক আলআমিন জানান, আগে কাকডাকা ভোরে কৃষকেরা গরু-মহিষ, লাঙ্গল ও জোয়াল নিয়ে ভাওয়াইয়া, জারি ও সারি গান গাইতে গাইতে মাঠে বেরিয়ে পড়তেন। বাণিজ্যিকভাবেও কৃষকেরা হালচাষের জন্য গরু-মহিষ পালন করতেন। আবার অনেকে গবাদিপশু দিয়ে হালচাষকে পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন। এখন আর সেই দৃশ্য চোখে পড়ে না, শোনা যায় না সেইসব লোকজ গানও।

হরিশ্বর গ্রামের চাষি মঞ্জুর আলম জানান, জমি চাষের প্রয়োজন হলেই অল্প সময়ের মধ্যে পাওয়ার টিলারসহ আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে জমি চাষ করা যায়। বিজ্ঞানের বিভিন্ন আবিষ্কারের ফলে কৃষিতে এসেছে নানা পরিবর্তন। তাই কৃষকেরাও পেশা পরিবর্তন করে অন্য পেশার দিকে ঝুঁকছেন। ফলে দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে গরু-মহিষ, লাঙ্গল ও জোয়াল দিয়ে জমি চাষের ঐতিহ্য।

নাজিরদহ গ্রামের কৃষক মনসুর আলী জানান, গরু-মহিষের দাম ও গো-খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি হালচাষের আয় কমে যাওয়ায় এলাকার অনেক কৃষক হালের গরু বিক্রি করে দিয়েছেন। বর্তমানে গরুর হালের তুলনায় যান্ত্রিক পদ্ধতিতে অল্প সময়ে কম খরচে জমি চাষ করা যায়। তাই কৃষকেরা আর হালচাষের জন্য গরু-মহিষ লালন-পালন করতে আগ্রহী নন।

গদাই গ্রামের কৃষক শাহজাহান মন্ডল জানান, আগের দিনের গৃহস্থ পরিবারগুলোর ঐতিহ্য ছিল গরু-মহিষের হাল। যার যত বেশি হাল ছিল, তাকে তত বড় গৃহস্থ হিসেবে পরিচিত করা হতো। অনেকে হালের গরু দিয়ে হালচাষ করে সংসার চালাতেন। কিন্তু বর্তমানে যান্ত্রিক যুগে কলের লাঙ্গলের কাছে সবকিছুই হারিয়ে যাচ্ছে।

কাউনিয়া উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন জানান, কাউনিয়ায় কিছু পরিবার এখনো ঐতিহ্য ও গৌরবের প্রতীক গরু-মহিষের হাল ধরে রেখেছেন। জৈব সারের চাহিদা পূরণে গরু-মহিষের হালের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনা প্রয়োজন।

অনেকে মন্তব্য করে বলেছেন, কবি কাজী নজরুল ইসলামের পত্রিকা ‘লাঙ্গল’ যেমন হারিয়ে গেছে, তেমনি আর কিছুদিন পর নতুন প্রজন্মকে লাঙ্গল-জোয়াল চেনাতে হয়তো জাদুঘরে নিয়ে যেতে হবে। কারণ, বিলুপ্ত জিনিসই একসময় জাদুঘরে স্থান পায়।

আরো..