ভারপ্রাপ্ত দিয়েই চলছে প্রশাসন-পাঠদান, বাড়ছে শিক্ষকদের বাড়তি চাপ,
ব্যাহত পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম- ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষার্থীরা
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির: বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরে চলছে প্রধান শিক্ষক সংকট। উপজেলার ৩০৯টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ১২৫টিতেই নেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক। ফলে কোথাও জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষক, কোথাও অন্য সহকারী শিক্ষককে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দিয়ে চলছে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম।
প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি এসব শিক্ষককে নিয়মিত শ্রেণিকক্ষেও পাঠদান করতে হচ্ছে। এতে একদিকে প্রশাসনিক কাজের চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে স্বাভাবিক পাঠদান ও একাডেমিক কার্যক্রম। শিক্ষক সংকটের সঙ্গে প্রধান শিক্ষক সংকট যুক্ত হওয়ায় প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় তৈরি হয়েছে বাড়তি চাপ।
জেলার মধ্যে সর্বোচ্চ শূন্য পদ মোরেলগঞ্জে
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে প্রধান শিক্ষকের পদ সবচেয়ে বেশি শূন্য রয়েছে মোরেলগঞ্জে—১২৫টি বিদ্যালয়ে। এরপর রামপালে ৯২, বাগেরহাট সদরে ৮৫, শরণখোলায় ৮৩, মোল্লাহাটে ৭০, চিতলমারীতে ৬৭, মোংলায় ৫৪, ফকিরহাটে ৫০ এবং কচুয়ায় ৪৬টি বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য রয়েছে।
জেলার মোট ১ হাজার ১৬২টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৬৭২টিতেই স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নেই। অর্থাৎ জেলার অর্ধেকেরও বেশি বিদ্যালয়েই দীর্ঘদিন ধরে ভারপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনায় চলছে প্রশাসনিক কার্যক্রম।
প্রধানের দায়িত্ব, আবার শ্রেণিকক্ষেও
মোরেলগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে দেখা গেছে, প্রধান শিক্ষক না থাকায় জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষকদেরই একসঙ্গে প্রশাসনিক দায়িত্ব ও পাঠদান সামলাতে হচ্ছে। শিক্ষার্থী-শিক্ষকদের উপস্থিতি তদারক, সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়ন, নথিপত্র সংরক্ষণসহ নানা দাপ্তরিক কাজের পাশাপাশি তাদের নিয়মিত ক্লাসও নিতে হচ্ছে।
মোরেলগঞ্জ উপজেলার ১১৭ ভাইজোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক নজরুল ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে প্রায় ১০৩ জন শিক্ষার্থী ও পাঁচজন শিক্ষক রয়েছেন। প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তাকেও নিয়মিত ক্লাস নিতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, স্থায়ী প্রধান শিক্ষক থাকলে প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কাজগুলো একজনের মাধ্যমে পরিচালনা করা সম্ভব হতো। এতে অন্য শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাঠদানে আরও বেশি মনোযোগ দিতে পারতেন। বর্তমানে অফিসের কাজ সামলানোর পাশাপাশি ক্লাস নিতে হচ্ছে, ফলে বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরিফুল ইসলাম জানায়, তাদের বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক নেই। শিক্ষকরাই ক্লাস নেওয়ার পাশাপাশি বিদ্যালয়ের বিভিন্ন দাপ্তরিক কাজ করেন। তার দাবি, দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলে শিক্ষকরা পড়াশোনায় আরও বেশি সময় দিতে পারবেন।
২০০৯ সাল থেকে পদোন্নতি বন্ধের অভিযোগ
বাংলাদেশ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, মোরেলগঞ্জ শাখার সভাপতি মো. জাকির হোসেন মল্লিক বলেন, ২০০৯ সাল থেকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষকদের প্রধান শিক্ষক পদে পদোন্নতি বন্ধ রয়েছে। ২০১৭ সালে কিছু জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে প্রধান শিক্ষকের চলতি দায়িত্ব দেওয়া হলেও তাদের স্থায়ী পদোন্নতি দেওয়া হয়নি।
তিনি বলেন, এর মধ্যে অনেকে অবসরে গেছেন, কেউ কেউ মারা গেছেন। কিন্তু নতুন করে পদোন্নতির কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বছরের পর বছর প্রধান শিক্ষকের পদ শূন্য থাকায় বিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। দ্রুত পদোন্নতির মাধ্যমে শূন্য পদ পূরণ করা জরুরি।
অভিভাবক সদস্য সাইফুল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের সার্বিক ব্যবস্থাপনায় প্রভাব পড়ছে। সহকারী শিক্ষকদের একদিকে পাঠদান, অন্যদিকে প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। দ্রুত শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, শিক্ষকরা আন্তরিকভাবে পাঠদান করলেও প্রধান শিক্ষক না থাকায় তাদের ওপর অতিরিক্ত দায়িত্ব পড়ছে। দাপ্তরিক ও প্রশাসনিক কাজ সামলাতে গিয়ে অনেক সময় তাদের ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনায় প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। দ্রুত শূন্য পদে প্রধান শিক্ষক নিয়োগ প্রয়োজন।
কর্তৃপক্ষ বলছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলে জানানো হয়েছে
মোরেলগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার মো. শেফাইনূর আরেফীন বলেন, প্রধান শিক্ষকসহ জনবল সংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। নতুন নিয়োগপ্রক্রিয়া শুরু হলে সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
বাগেরহাট জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাসরীন আকতার বলেন, জেলায় প্রধান শিক্ষকের বেশ কিছু পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় বাড়তি চাপ তৈরি হচ্ছে। শূন্য পদ পূরণে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী কার্যক্রম চলছে।
তিনি জানান, অনেক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষকদের মধ্য থেকে যোগ্যদের চলতি দায়িত্ব দিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখা হয়েছে। শূন্য পদগুলো দ্রুত পূরণ করা হলে বিদ্যালয়গুলোর প্রশাসনিক ও একাডেমিক কার্যক্রম আরও গতিশীল হবে।
প্রশ্ন—আর কতদিন ‘ভারপ্রাপ্ত’ দিয়ে?
প্রধান শিক্ষক সংকটের কারণে আপাতত বিদ্যালয়ের কার্যক্রম সচল রাখা গেলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। একজন সহকারী শিক্ষককে একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান এবং বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক দায়িত্ব পালন করতে হলে স্বাভাবিকভাবেই তার সময় ও মনোযোগের ওপর বাড়তি চাপ পড়ে।
বছরের পর বছর স্থায়ী প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়ের নেতৃত্ব, একাডেমিক পরিকল্পনা, শিক্ষক সমন্বয় ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাতেও তৈরি হচ্ছে দীর্ঘমেয়াদি ঘাটতি।
তাই মোরেলগঞ্জের ১২৫টি বিদ্যালয়ে স্থায়ী প্রধান শিক্ষক নিয়োগ এখন কেবল একটি প্রশাসনিক পদ পূরণের বিষয় নয়; এটি প্রাথমিক শিক্ষার মান, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পাঠদান পরিবেশ এবং বিদ্যালয়ের জবাবদিহির সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত।
স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের দাবি—‘চলতি দায়িত্ব’ দিয়ে সংকট সাময়িকভাবে সামাল না দিয়ে দ্রুত পদোন্নতি ও নিয়োগের মাধ্যমে শূন্য পদগুলো পূরণ করা হোক।