https://www.a1news24.com
২৩শে অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, রাত ৮:২৭

ময়লার ভাগাড় থেকে জ্বালানি তৈরির চেষ্টা, সুজনের উদ্যোগে নতুন সম্ভাবনা

ফুটপাতে জুতা সেলাই করে সংসার চলে; প্রতিদিন ৪০ কেজি পলিথিন প্রক্রিয়াজাতের দাবি, সরকারি সহায়তা চান প্রান্তিক কারিগর

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার:বাগেরহাটের চিতলমারী উপজেলা হেলিপ্যাডের পাশে ঋষি (দলিত) সম্প্রদায়ের কয়েকটি পরিবারের বসবাস। সেখানেই স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকেন সুজন বিশ্বাস (৩৫)। জীবিকার তাগিদে উপজেলা সদর বাজারের ফুটপাতে বসে জুতা-স্যান্ডেল সেলাই করেন তিনি। দিনে আয় হয় মাত্র ২০০ থেকে ৩০০ টাকা। এই সামান্য আয়ে কোনো রকমে চলে তাঁর সংসার।

কিন্তু অভাবের সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াইয়ের বাইরেও সুজনের মনে ছিল আরেকটি উদ্বেগ—বাড়ির সামনের বিশাল ময়লার ভাগাড়। বাজারের বর্জ্যের সঙ্গে জমা হয় বিপুল পরিমাণ পলিথিন। কখনো সেই বর্জ্যে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হলে ধোঁয়ায় আশপাশের পরিবেশ ভারী হয়ে ওঠে। শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তা বাড়ে স্থানীয় বাসিন্দাদের।

এই পরিস্থিতি থেকেই পলিথিন থেকে জ্বালানি উৎপাদনের চেষ্টা শুরু করেন সুজন। ইউটিউব দেখে নিজ উদ্যোগে তৈরি করেন একটি ‘পলিথিন বার্ন ইউনিট’। তাঁর দাবি, এই ব্যবস্থায় পলিথিন প্রক্রিয়াজাত করে ডিজেল, পেট্রোল ও অকটেনের মতো জ্বালানি পাওয়া যাচ্ছে। উৎপাদিত জ্বালানি দিয়ে শ্যালো ইঞ্জিন ও মোটরসাইকেল চালানোর পরীক্ষাও করছেন তিনি।

সামান্য আয়ের মানুষটির এই উদ্যোগ একদিকে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প খোঁজার চেষ্টা, অন্যদিকে আর্থিকভাবে ঘুরে দাঁড়ানোর স্বপ্ন। তবে পলিথিন পুড়িয়ে জ্বালানি তৈরির প্রক্রিয়া কতটা নিরাপদ এবং উৎপাদিত জ্বালানি ব্যবহারের উপযোগী কি না, তা বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করা জরুরি।

ইউটিউব দেখে উদ্যোগ

সুজন বিশ্বাস বলেন, “উপজেলার পুরো বাজারের ময়লা-আবর্জনা আমাদের বাড়ির সামনে ফেলে রাখা হয়। খোলা জায়গায় পলিথিনে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ধোঁয়ায় শিশু ও বৃদ্ধদের দম আটকে আসে। এ কারণে ভাবতে শুরু করি, কীভাবে এই পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া যায়। পরে ইউটিউব দেখে পরিবেশ রক্ষার কথা ভেবে এই পলিথিন বার্ন ইউনিট তৈরি করেছি।”

তাঁর ভাষ্য, এই উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্য থেকে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি ময়লার ভাগাড়ের পলিথিন কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে। তবে তাঁর ব্যবহৃত পদ্ধতিতে পরিবেশের ক্ষতি কতটা কমছে, তা নিরপেক্ষভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

৪০ কেজি পলিথিনে জ্বালানি উৎপাদনের দাবি

সুজন জানান, প্রতিদিন প্রায় ৪০ কেজি পলিথিন একটি বড় সিলিন্ডারে প্রক্রিয়াজাত করেন তিনি। তাঁর দাবি, এই পরিমাণ পলিথিন থেকে প্রায় ১৫ লিটার ডিজেল, ৪ লিটার পেট্রোল ও ১ লিটার অকটেন পাওয়া যায়। পুরো প্রক্রিয়ায় প্রায় ছয় ঘণ্টা সময় লাগে এবং জ্বালানি হিসেবে পাঁচ মণ কাঠ ব্যবহার করেন তিনি। উৎপাদিত ডিজেল ব্যবহারের আগে পরিশোধন করতে হয় বলেও জানান সুজন।

এই হিসাব ও জ্বালানির ধরন স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। পলিথিনকে অক্সিজেনের সীমিত উপস্থিতিতে উত্তপ্ত করে তেলজাতীয় পদার্থ উৎপাদনের প্রযুক্তি বিশ্বে পরিচিত হলেও, উৎপাদিত তরল সরাসরি প্রচলিত ডিজেল, পেট্রোল বা অকটেনের সমমানের কি না, তা পরীক্ষাগারে যাচাই ছাড়া নিশ্চিত বলা যায় না। প্রক্রিয়াটিতে ধোঁয়া, বিষাক্ত গ্যাস ও অন্যান্য দূষক তৈরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।

সুজনের আশা, প্রয়োজনীয় কারিগরি নির্দেশনা ও আর্থিক সহযোগিতা পেলে তাঁর উদ্যোগকে আরও কার্যকরভাবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে। তিনি সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহায়তা চান।

স্থানীয়দের আগ্রহ

নসিমনচালক মো. রাসেল মোল্লা জানান, তিনি সুজনের কাছ থেকে জ্বালানি কিনে শ্যালো ইঞ্জিনচালিত নসিমন চালাচ্ছেন। এখন পর্যন্ত তাঁর চোখে কোনো সমস্যা ধরা পড়েনি বলে দাবি করেন তিনি। তবে স্বল্প সময়ের ব্যবহার থেকে জ্বালানির দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা কিংবা ইঞ্জিনের ওপর প্রভাব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায় না।

চিতলমারী সদর বাজারের ব্যবসায়ী সুবল কর্মকার বলেন, সুজনের তৈরি জ্বালানি দিয়ে মোটরসাইকেল চলতে দেখেছেন তিনি। তাঁর মতে, উদ্যোগটি সম্ভাবনাময়। তবে জ্বালানির মান ও নিরাপত্তা যাচাই করা প্রয়োজন।

চিতলমারী উপজেলা পরিবেশ আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক অ্যাডভোকেট ফজলুল হক বলেন, “পলিথিন পরিবেশের জন্য হুমকি। সুজন যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা প্রশংসার দাবি রাখে। আমাদের সবার উচিত সুজনকে সহযোগিতা করা।”

চিতলমারীর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খাদিজা আক্তার বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে পলিথিন থেকে জ্বালানি উৎপাদনের খবর পাওয়া যাচ্ছে। সুজনের উদ্যোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্যে ইতিবাচক মনোভাবের কথা উঠে এসেছে। তবে এই নির্দিষ্ট প্রক্রিয়ার পরিবেশগত নিরাপত্তা ও জ্বালানির মান যাচাইয়ের বিষয়টি আলাদাভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

সম্ভাবনার সঙ্গে নিরাপত্তার প্রশ্নও

পলিথিনের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার ও যত্রতত্র বর্জ্য ফেলা বাংলাদেশের পরিবেশ ব্যবস্থাপনার বড় চ্যালেঞ্জ। বিশেষ করে বাজার ও বসতবাড়ির পাশে বর্জ্য জমে থাকলে দুর্গন্ধ, আগুনের ধোঁয়া এবং জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ অবস্থায় বর্জ্য সংগ্রহ, বাছাই, পুনর্ব্যবহার এবং নিরাপদ প্রক্রিয়াজাতকরণের ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।

সুজন বিশ্বাসের উদ্যোগ সেই সংকটের মধ্যে একজন প্রান্তিক মানুষের নিজস্ব সমাধান খোঁজার গল্প। কিন্তু পলিথিন পোড়ানোকে পরিবেশবান্ধব সমাধান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার আগে নির্গমন পরীক্ষা, জ্বালানির রাসায়নিক গুণাগুণ যাচাই এবং নিরাপদ প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের সহায়তা পেলে তাঁর উদ্যোগের বাস্তব সম্ভাবনা ও ঝুঁকি নিরূপণ করা সম্ভব হতে পারে।

ফুটপাতে জুতা সেলাই করে সংসার চালানো সুজনের স্বপ্ন—নিজের উদ্যোগটিকে আরও এগিয়ে নেওয়া। সেই স্বপ্ন সফল করতে প্রয়োজন শুধু আর্থিক সহায়তা নয়; প্রয়োজন বিজ্ঞানভিত্তিক পরামর্শ, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কার্যকর সমাধান।

আরো..