https://www.a1news24.com
১৫ই সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:৫৯

ময়মনসিংহ মেডিকেলে আগুন: পদদলিত হওয়ার তথ্য নাকচ প্রশাসনের ও তদন্ত কমিটি

ময়মনসিংহ প্রতিনিধি: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় আগুন লাগার পর রোগী ও স্বজনদের অনেকে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে গিয়ে হতাহতের খবর পাওয়া গেছে।

এর মধ্যে আগুন লাগার পর আতঙ্কে হাসপাতাল ভবনে থাকা রোগী ও স্বজনরা হুড়োহুড়ি করে সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় পড়ে গিয়ে দুজনের মৃত্যু হয় বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজন।

অগ্নিকান্ডের ঘটনায় মঙ্গলবার সকালে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করার কথা জানিয়েছেন ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) চিকিৎসক মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান। কমিটিকে আগামী তিন কার্য দিবসের তদন্ত প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে ।

তবে সোমবার সন্ধ্যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার পর এ ঘটনায় ছয়জনের মৃত্যুর তথ্য সামনে এলেও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসন তা নাকচ করেছেন। পরে রাতে দুজনের প্রাণহানির তথ্য জানানো হয় পুলিশের পক্ষ থেকে। ফলে পুরো ঘটনাটি নিয়ে ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

ঘটনার পর রাতে ময়মনসিংহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন বার্তা পাঠিয়ে হাজেরা বেগম, শাহজাহান, রমজান, জাহানারা, কুলসুমা ও অজ্ঞাত এক শিশুর মৃত্যুর খবর জানালেও পরে বদলে যায় সেই তথ্য।

ছয়জনের মৃত্যুর খবর সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় সংসদ সদস্যসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা বৈঠকে বসেন। দীর্ঘ আলোচনা শেষে রাত ১টার দিকে ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনার এস এম হুমায়ূন কবির সরকার বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় কেউ মারা যায়নি।

সোমবার সন্ধ্যা পৌনে ৬টায় হাসপাতালের নতুন ভবনের অষ্টম তলায় লিফটে হঠাৎ আগুন লাগে। মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে ধোঁয়া। আতঙ্কিত হয়ে পড়েন রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও হাসপাতালের কর্মীরা।

আগুনের খবর ছড়িয়ে পড়তেই ভবনের বিভিন্ন তলা থেকে দ্রুত নিচে নামতে শুরু করেন অনেকে। সিঁড়িতে তৈরি হয় হুড়োহুড়ি। আতঙ্ক আর ছোটাছুটির মধ্যেই ঘটে হতাহতের ঘটনা।

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের নানা অব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সুজন ময়মনসিংহ মহানগর শাখার সম্পাদক আলী ইউসুফ। তিনি অভিযোগ করে বলেন, জরুরি মুহূর্তে একটি বড় হাসপাতালের নিরাপত্তা ও রোগী ব্যবস্থাপনায় এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া উদ্বেগজনক।

হাসপাতালের রেজিস্টার, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স, ফায়ার সার্ভিস ও সংশ্লিষ্ট কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ না পাওয়ারা দাবি করেছেন বিভাগীয় কমিশনার হুমায়ূন কবির সরকার।

তিনি বলেন, “পদদলিত হয়ে ছয়জন মারা গেছেন- এমন কোনো তথ্য-প্রমাণ আমরা এখন পর্যন্ত পাইনি। আমরা ফায়ার সার্ভিস, জরুরি বিভাগের চিকিৎসক, নার্স ও অন্য কর্মীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের রেজিস্টারও যাচাই করেছি। পদদলিত হয়ে মৃত্যুর কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।”

বিভাগীয় কমিশনার বলেন, তালিকায় থাকা একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। বাকি চারজনের মধ্যে দুজন স্বাভাবিকভাবে মারা গেছেন বলে তাদের পরিবারের সদস্যরা নিশ্চিত করেছেন।

“অপর দুজনের মৃত্যুর কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তদন্তের পর এ বিষয়ে বিস্তারিত জানা যাবে। হাসপাতালে স্বাভাবিকভাবে রোগী মারা যেতে পারে। তবে পদদলিত হয়ে মৃত্যুর তথ্যটি অসত্য”, বলেন তিনি।

বিভাগীয় কমিশনারের বক্তব্যের কিছুক্ষণ পর রাত দেড়টার দিকে রেঞ্জ ডিআইজির মিডিয়া শাখার মেসেঞ্জার গ্রুপে প্রাথমিকভাবে দুজনের প্রাণহানির খবর শোনা যাচ্ছে বলে জানানো হয়।

এরপর মৃত দাবি করা আহত জাহানারাকে সাংবাদিকদের সামনে আনা হয়। এ সময় জাহানারা চিৎকার করে তার ভাইয়ের মৃত্যুর বর্ণনা দিতে চাইলে তাকে কথা বলতে দেওয়া হয়নি।

ভবনের সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় হুড়োহুড়ি

হাসপাতালে আগুন লাগার পর আতঙ্কে রোগী ও স্বজনদের মধ্যে দৌড়াদৌড়ির সময় সিঁড়িতে পড়ে দুজনের মৃত্যু হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাদের স্বজন।

তারা হলেন- তারাকান্দার বালিখা গ্রামের শহিদুল ইসলামের স্ত্রী কুলসুম আক্তার (৩৫) এবং ফুলপুরের রাঙামাটিয়া ইউনিয়নের বিষ্ণুরামপুর গ্রামের শাহাজাহান মনির (৪৫)।

সোমবার রাত ১২টার দিকে কুলসুম আক্তারের ননদ নাজমা আক্তার বলেন, “কুলসুম ১২ দিন ধরে তার জন্ডিসে আক্রান্ত ১২ বছর বয়সি ছেলে স্বাধীনকে নিয়ে হাসপাতালের ৩১ নম্বর শিশু ওয়ার্ডে ভর্তি ছিলেন। কুলসুমের সঙ্গে তার ১৮ বছর বয়সি মেয়ে মিমও ছিলেন।”

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে নাজমা বলেন, আগুন লাগার পর হাসপাতালের ভেতরে লোকজন ছোটাছুটি শুরু করলে কুলসুম তার ছেলে ও মেয়েকে নিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামার চেষ্টা করেন। মিম আগে বের হয়ে যান। পরে তিনি ফিরে এসে দেখেন, লোকজন তার ভাই স্বাধীনকে টেনে বের করছেন; কিন্তু মাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না।

নাজমার ভাষ্য, পরে কুলসুমকে উদ্ধার করে অক্সিজেন দেওয়া হয়। তখনো তার নিঃশ্বাস ছিল। খবর পেয়ে নাজমা হাসপাতালে আসার পথে ছিলেন। এর মধ্যেই কুলসুমের মৃত্যু হয়।হাসপাতাল থেকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে তারা মৃতদেহ বাড়িতে নিয়ে গেছেন বলেও জানান নাজমা আক্তার।

অন্যদিকে শাহাজাহান মনির প্রায় ১০ থেকে ১২ দিন ধরে হাসপাতালের নতুন ভবনের তৃতীয় তলায় যক্ষ্মা রোগের চিকিৎসা নিচ্ছিলেন। তার ছেলে পলাশ মোল্লা বলেন, আগুন লাগার সময় তার বাবা, মা হারিসা আক্তার ও খালা জাহানারা আক্তার একসঙ্গে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামছিলেন।

এ সময় পেছন থেকে লোকজনের ধাক্কায় তারা পড়ে যান। পরে তার মা ও খালাকে আহত অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। দুজনই বর্তমানে হাসপাতালের ১০ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন। তিনি তখন হাসপাতালে ছিলেন না। পরে এসে মায়ের কাছে যান। তার বাবার লাশ স্বজনেরা বাড়িতে নিয়ে গেছেন। মোবাইল ফোনে বাবার মৃতদেহের ছবি দেখেছেন তিনি।

অগ্নিকাণ্ডের পর মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তির আরেকটি কারণ হিসেবে উঠে এসেছে হাসপাতালের একটি তালিকা। সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য ও হাসপাতাল ব্যবস্থাপনা কমিটির সহসভাপতি আবু ওয়াহাব আকন্দ বলেন, তালিকায় মৃত হিসেবে থাকা একজন এখনো জীবিত এবং হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

তিনি বলেন, “জাহানারা নামে যে রোগীর নাম মৃতের তালিকায় দেওয়া হয়েছে, তিনি জীবিত। তিনি এখনো চিকিৎসা নিচ্ছেন। তালিকার সঙ্গে বাস্তবতা মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”

অগ্নিকাণ্ডের পর হাসপাতালের দুটি সিঁড়ির মধ্যে একটি বন্ধ থাকায় রোগী ও স্বজনেরা একটি সিঁড়ি দিয়ে বের হওয়ার সময় হুড়োহুড়ির মধ্যে পড়েন বলে অভিযোগও উঠেছে।

এ বিষয়ে বিভাগীয় কমিশনার বলেন, বিষয়টি তারা জেনেছেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিরাপত্তার কারণে কিছু সিঁড়ি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে। তবে এতে কোনো অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা ছিল কিনা, তা খতিয়ে দেখা হবে।

আগুনের পর হুড়োহুড়িতে কয়েকজন আহত হওয়ার কথাও স্বীকার করেছে প্রশাসন। কারও হাত-পা কেটে যাওয়া কিংবা মাথায় আঘাত লাগার মতো ঘটনাও ঘটতে পারে বলে জানান বিভাগীয় কমিশনার।তবে ধোঁয়ায় কারও মৃত্যু হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্চিত কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।

পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি

হাসপাতালের সহকারী পরিচালক মোহাম্মদ মাইনউদ্দিন খান বলেন, সোমবারের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে। কমিটিকে তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে।

হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের প্রধান অধ্যাপক গোলাম রহমান ভূঁইয়াকে কমিটির প্রধান করা হয়েছে । তিনি নিজে সদস্যসচিবের দায়িত্বে আছেন। কমিটিতে গণপূর্ত অধিদপ্তরের দুজন এবং ফায়ার সার্ভিসের একজন প্রতিনিধি রয়েছেন।

তিনি বলেন, লিফটে আগুন লাগার ক্ষেত্রে কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তদন্ত কমিটি আগুন লাগার সম্ভাব্য কারণ খতিয়ে দেখবে। ঘটনায় কারও গাফিলতি ছিল কি না, থাকলে তা চিহ্নিত করা হবে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সুপারিশ করা হবে। তদন্তে অন্য কোনো বিষয় উঠে এলে সেগুলোও বিবেচনায় নেওয়া হবে।

ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক পূর্ণ চন্দ্র মুৎসুদ্দী বলেন, নতুন ভবনের অষ্টম তলার লিফট নিংন্ত্রণ কক্ষে বৈদ্যুতিক শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়। খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ১০টি ইউনিট ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রায় ৩০ মিনিটের চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

আরো..