ঢাকাই চলচ্চিত্রে একসময় নায়িকার নামেই সিনেমা হলের সামনে ভিড় জমত। প্রিয় নায়িকার নতুন সিনেমা মানেই ছিল দর্শকের বাড়তি আগ্রহ, পোস্টার-ব্যানারে ছিল তার মুখ, আর প্রযোজকদের কাছে তারকামূল্য ছিল বিনিয়োগের বড় নিশ্চয়তা। সেই সময়ের মৌসুমী, শাবনূর, পপি কিংবা পূর্ণিমাদের জনপ্রিয়তা এখনো দর্শকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল। কিন্তু সময় বদলেছে।
বদলেছে দর্শকের রুচি, বিনোদনের মাধ্যম এবং চলচ্চিত্রের বাজার। সেই পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মেলাতে না পেরে একসময় আলোচিত অনেক নায়িকাই এখন পড়েছেন অস্তিত্বের সংকটে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে ঢালিউডে নায়িকার সংখ্যা কম নয়, কিন্তু দর্শক টানতে পারেন- এমন নায়িকার সংখ্যা হাতে গোনা। প্রযোজক-পরিচালকদের বড় অভিযোগও সেখানেই।
তাদের ভাষ্য, ইন্ডাস্ট্রিতে নায়িকা আছেন অনেক; সংকট আসলে দর্শকগ্রহণযোগ্য তারকার। কারণ, সিনেমা নির্মাণের শেষ হিসাবটি দর্শকের পছন্দ-অপছন্দেই গিয়ে ঠেকে। যে নায়িকাকে ঘিরে দর্শকের আগ্রহ নেই, তাকে প্রধান চরিত্রে নিয়ে বড় বাজেটের সিনেমা নির্মাণ অনেক প্রযোজকের কাছেই এখন ঝুঁকির বিষয়।
একসময় যেসব নায়িকা সিনেমার পোস্টারে থাকলেই দর্শকের কৌতূহল তৈরি হতো, তাদের অনেকের ক্ষেত্রেই এখন উল্টো চিত্র।
কারও হাতে নিয়মিত সিনেমা নেই, কেউ ব্যস্ত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, কেউ আবার ব্যক্তিজীবনের নানা বিতর্কে আলোচনায় থাকছেন। অভিনয়ের চেয়ে ব্যক্তিগত জীবন, প্রেম-বিয়ে, মামলা কিংবা রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বেশি খবর হওয়ায় তাদের চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারও পড়েছে প্রশ্নের মুখে।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের মতে, দর্শকের সঙ্গে তারকার সম্পর্ক তৈরি হয় পর্দার কাজের মধ্য দিয়ে। সেই সম্পর্ক ধরে রাখতে হলে নিয়মিত ভালো সিনেমায় অভিনয় করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ বিরতি, দুর্বল চিত্রনাট্য, ভুল সিনেমা নির্বাচন কিংবা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড- সব মিলিয়ে অনেক নায়িকাই ধীরে ধীরে দর্শকের মন থেকে দূরে সরে গেছেন। ফলে নতুন প্রজন্মের দর্শকের কাছে তাদের আগের তারকাখ্যাতি আর একইভাবে কাজ করছে না।
নুসরাত ফারিয়া
এই তালিকায় অন্যতম আলোচিত নাম নুসরাত ফারিয়া। একসময় উপস্থাপনা থেকে চলচ্চিত্রে এসে দ্রুতই নিজের অবস্থান তৈরি করেছিলেন তিনি। দেশের পাশাপাশি কলকাতার সিনেমাতেও কাজ করে পরিচিতি পেয়েছিলেন। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে ধারাবাহিকতা দেখা যাচ্ছে না।
ঈদে মুক্তি পাওয়া ‘জ্বীন-৩’ সিনেমায় আব্দুন নূর সজলের সঙ্গে জুটি বেঁধে অভিনয় করেছিলেন ফারিয়া। কিন্তু মুক্তির পর সিনেমাটি দর্শকের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারেনি। মুক্তির এক সপ্তাহের মধ্যেই সিনেপ্লেক্স থেকে সিনেমাটি সরিয়ে নেওয়ার ঘটনা তার ক্যারিয়ার নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। ঈদের ব্যর্থ সিনেমাগুলোর তালিকাতেও জায়গা করে নেয় ছবিটি।
এর আগে ‘মুজিব- একটি জাতির রূপকার’ সিনেমায় শেখ হাসিনার চরিত্রে অভিনয় করে আলোচনায় এসেছিলেন ফারিয়া। পরবর্তী রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সিনেমাটি এবং তার অভিনীত চরিত্র নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হয়। একই সঙ্গে জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের সময় তার ভূমিকা নিয়েও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা আলোচনা-সমালোচনা হয়। এসব বিতর্ক তার দর্শকগ্রহণযোগ্যতায় কতটা প্রভাব ফেলেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা না গেলেও তারকা হিসেবে আগের মতো সর্বজনীন গ্রহণযোগ্যতা যে নেই, সেটি স্পষ্ট।
তার হাতে থাকা ‘ফুটবল একাত্তর’ সিনেমার নামও রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বদলে ‘ঠিকানা বাংলাদেশ’ করা হয়েছে। সিনেমাটির মুক্তি নিয়েও অনিশ্চয়তা রয়েছে। ফলে অভিনয়ের ধারাবাহিকতা ফেরানো তার জন্য এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
অপু বিশ্বাস
একসময় শাকিব খানের সঙ্গে জুটি মানেই ছিল ব্যবসাসফল সিনেমার সম্ভাবনা। সেই জুটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন অপু বিশ্বাস। একসঙ্গে ৭০টিরও বেশি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি ঢালিউডের অন্যতম জনপ্রিয় নায়িকা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। কিন্তু শাকিব খানের সঙ্গে সম্পর্কের অবসানের পর তার ক্যারিয়ারে সেই গতি আর দেখা যায়নি। একসময় যে নায়িকার সিনেমার জন্য দর্শক হলে ছুটে যেতেন, এখন তার নতুন সিনেমা নিয়ে তেমন আগ্রহ তৈরি হয় না। সিনেমায় নিয়মিত না থাকায় পর্দায়ও তার উপস্থিতি কমেছে।
২০২৪ সালে মুক্তি পাওয়া ‘ট্র্যাপ : দ্য আনটোল্ড স্টোরি’ ও ‘ছায়াবৃক্ষ’ সিনেমায় দেখা গেলেও সেগুলো তাকে আগের জায়গায় ফিরিয়ে নিতে পারেনি। বর্তমানে অভিনয়ের পাশাপাশি ইউটিউব ও অনলাইন কনটেন্টে বেশি সক্রিয় অপু। ফলে প্রশ্ন উঠছে- তিনি কি ধীরে ধীরে চলচ্চিত্রের মূল স্রোত থেকে সরে গিয়ে ডিজিটাল মাধ্যমকেই নিজের নতুন কর্মক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিচ্ছেন?
মাহিয়া মাহি
‘ভালোবাসার রঙ’ দিয়ে ২০১২ সালে চলচ্চিত্রে অভিষেকের পর অল্প সময়ের মধ্যেই জনপ্রিয়তা পান মাহিয়া মাহি। তিন দশকের কাছাকাছি সিনেমায় অভিনয় করে তিনি একসময় নির্মাতা-প্রযোজকদের পছন্দের নায়িকায় পরিণত হয়েছিলেন। কিন্তু ক্যারিয়ারের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অভিনয়ের পাশাপাশি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন মাহি। জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেওয়ার চেষ্টা, স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন—সব মিলিয়ে তার পরিচয়ের সঙ্গে রাজনীতিও জড়িয়ে যায়। নির্বাচনে পরাজয়ের পর অবশ্য রাজনীতির মাঠ থেকে সরে এসে আবার অভিনয়ে ফেরার চেষ্টা করছেন তিনি।
তবে আগের সেই তারকাখ্যাতি আর নেই। ২০২৪ সালে ‘রাজকুমার’ সিনেমায় ক্যামিও চরিত্রে দেখা গেলেও সেটি ছিল নিয়মিত নায়িকা হিসেবে প্রত্যাবর্তন নয়। নতুন সিনেমায় তাকে ঘিরে প্রযোজকদের আগ্রহও আগের তুলনায় কম। ফলে মাহির সামনে এখন বড় প্রশ্ন—তিনি কি আবারও নিজের পুরোনো অবস্থান ফিরিয়ে আনতে পারবেন?
পরীমনি
ঢালিউডে তারকাখ্যাতির পাশাপাশি বিতর্কের জন্যও সবচেয়ে বেশি আলোচিত নামগুলোর একটি পরীমনি। সিনেমার চেয়ে ব্যক্তিজীবনের নানা ঘটনা নিয়ে তাকে বেশি আলোচনায় পাওয়া যায়- এমন মন্তব্যও চলচ্চিত্রাঙ্গনে প্রচলিত। প্রেম, বিয়ে, বিচ্ছেদ, মামলা ও নানা বিতর্ক তার ব্যক্তিজীবনকে দীর্ঘদিন ধরে সংবাদমাধ্যমের আলোচনায় রেখেছে। সাম্প্রতিক সময়েও ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে নানা গুঞ্জন তাকে আলোচনায় রেখেছে। ফলে অভিনেত্রী হিসেবে তার কাজের চেয়ে ব্যক্তিজীবনের খবরই অনেক সময় বেশি গুরুত্ব পেয়েছে।
এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারে। তাকে সর্বশেষ ‘মা’ সিনেমায় দেখা যায়, যা মুক্তি পেয়েছিল ২০২৩ সালের মে মাসে। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও বড় পর্দায় তার নিয়মিত উপস্থিতি নেই।
চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্টদের কেউ কেউ মনে করেন, পরীমনিকে নিয়ে সিনেমা নির্মাণ এখন শুধু অভিনয় প্রতিভার প্রশ্ন নয়; তারকাকে ঘিরে তৈরি হওয়া নানা বিতর্কও প্রযোজকদের বিবেচনায় আসে। দর্শক তাকে সিনেমার অভিনেত্রী হিসেবে কতটা দেখতে চান, সেটিও এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।
নিপুণ ও জাহারা মিতু
একসময় নিয়মিত সিনেমায় দেখা যেত নিপুণকে। অভিনয়ের পাশাপাশি চলচ্চিত্র সংগঠন ও নানা কর্মকাণ্ডেও সক্রিয় ছিলেন তিনি। কিন্তু সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় তার অবস্থান নিয়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব তার চলচ্চিত্র ক্যারিয়ারেও পড়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অন্যদিকে জাহারা মিতুর ক্যারিয়ারও প্রত্যাশিত জায়গায় পৌঁছাতে পারেনি। নায়িকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার আগেই বিভিন্ন বিতর্ক ও অযাচিত কর্মকাণ্ডের কারণে তার পথ কঠিন হয়ে যায়। ফলে সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও নিয়মিত বড় পর্দায় জায়গা তৈরি করতে পারেননি তিনি।
নায়িকা সংকট নাকি দর্শক সংকট?
তবে পুরো বিষয়টিকে শুধু নায়িকাদের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত চিত্র পাওয়া যাবে না। চলচ্চিত্র বিশ্লেষকদের মতে, ঢালিউডের সংকট আরও গভীরে। ভালো গল্প, শক্তিশালী চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাণ এবং দর্শকের রুচি অনুযায়ী সিনেমা তৈরির ঘাটতি রয়েছে। ফলে নতুন নায়িকারাও নিজেদের প্রতিষ্ঠার পর্যাপ্ত সুযোগ পাচ্ছেন না।
একদিকে পুরোনো নায়িকারা দর্শক হারাচ্ছেন, অন্যদিকে নতুনদের মধ্যে কেউই এখনো দীর্ঘমেয়াদি তারকা ইমেজ তৈরি করতে পারেননি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের জনপ্রিয়তা আর সিনেমার তারকাখ্যাতি এক বিষয় নয়। অনলাইনে লাখো অনুসারী থাকলেই যে প্রেক্ষাগৃহে দর্শক আসবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
এ কারণেই প্রযোজকেরা এখন তারকা নির্ভরতার বদলে গল্প, নির্মাণমান ও বাজার সম্ভাবনাকে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছেন। নায়িকার নাম দিয়ে সিনেমা চালানোর সেই পুরোনো যুগ অনেকটাই শেষ। দর্শক এখন সিনেমা দেখতে চান গল্পের জন্য, বিনোদনের জন্য এবং ভালো নির্মাণের জন্য।
ফেরার পথ কতটা খোলা?
ব্যক্তিজীবনের বিতর্ক দিয়ে দীর্ঘদিন আলোচনায় থাকা যায়, কিন্তু তারকা হয়ে টিকে থাকতে হলে শেষ পর্যন্ত পর্দাতেই সফল হতে হয়। দর্শক একবার মুখ ফিরিয়ে নিলে তাকে ফিরিয়ে আনতে প্রচারণার চেয়ে ভালো কাজই বেশি কার্যকর।
ঢালিউডের বর্তমান বাস্তবতা তাই স্পষ্ট- নায়িকার অভাব যতটা নয়, তার চেয়ে বড় সংকট দর্শকের আস্থা ও আগ্রহ ধরে রাখার মতো তারকার। একসময় যারা ছিলেন সিনেমার সাফল্যের অন্যতম নিশ্চয়তা, তাদের অনেকেই এখন সেই জায়গা হারিয়েছেন। ফলে বড় পর্দায় আগের সেই দাপট ফিরিয়ে আনতে হলে তাদের সামনে একটাই পথ- বিতর্ক নয়, ভালো সিনেমা দিয়ে দর্শকের মন জয় করা।