ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে অংশ নিতে ইতালিতে গিয়ে হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন। তাঁর অভিযোগ, একদল বাংলাদেশি তাঁর দিকে পানি, কোমল পানীয় ও ডিম ছুড়ে মেরেছেন। শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার পাশাপাশি তাঁর মুঠোফোন ফেলে দেওয়া হয়েছে। ঘটনার সময় সঙ্গে থাকা তাঁর ভাইয়ের শিশুসন্তানকেও ছাড় দেওয়া হয়নি। পরে স্থানীয় থানায় অভিযোগ করেন বাঁধন।
বাঁধনের অভিযোগ, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে তাঁর সক্রিয় ভূমিকার কারণেই তাঁকে লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। হামলাকারীদের কয়েকজন নিজেদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ও নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের কর্মী এবং ‘বঙ্গবন্ধুর সৈনিক’ হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন বলে জানান তিনি।
ঘটনার পর নিজের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে লাইভে এসে বিস্তারিত জানান বাঁধন। পরে হামলা ও হেনস্তার কয়েকটি ভিডিওও প্রকাশ করেন তিনি।
প্রকাশিত ভিডিওতে কয়েকজনকে বাঁধনের দিকে তেড়ে যেতে, তাঁর সঙ্গে ধস্তাধস্তি করতে এবং উত্তেজিতভাবে কথা বলতে দেখা যায়। তাঁদের কয়েকজন বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলে আখ্যা দেন। ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে একজনকে বাঁধনকে দেখিয়ে বলতে শোনা যায়, “সে একজন ‘জুলাই জঙ্গী’। সে এখন ভেনিসে, আমরা ভেনিস ছাত্রলীগ এই দেশদ্রোহী ‘জঙ্গি’কে ধরেছি। ” তাঁকে ‘দেশকে ধ্বংস করেছে’ এমন অপবাদ-আখ্যা দিয়েও হেনস্তা করা হয়। পরে সঙ্গে থাকা তাঁর ভাই তাঁকে নিরাপদ স্থানে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন।
ফেসবুক লাইভে বাঁধন বলেন, ‘এখানে আমি আমার ভাইয়ের পরিবারের সঙ্গে পার্কে গিয়েছিলাম। সেখানে আমাদের অনেক বাঙালি ভাই এসে আমাকে ফিজিক্যালি হ্যারাস করেছে। আমার শরীরে পানি, কোক ছুড়ে মেরেছে। এতে আমি একদম ভিজে যাই।’ বাঁধন জানান, তাঁর ওপর হাত তোলা হয়েছে এবং কানের পাশেও আঘাত করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘তারা আমার শরীরে হাত তুলেছে, আমার ফোন ফেলে দিয়েছে। আমার কানের পাশে আঘাত করেছে।’
ঘটনার সময় বাঁধনের ভাইয়ের শিশুসন্তানও তাঁদের সঙ্গে ছিল। প্রকাশিত একটি ভিডিওতে শিশুটির কথা উল্লেখ করে হামলাকারীদের থামানোর চেষ্টা করতে শোনা যায়। জবাবে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘কিসের আবার বাচ্চা, ওকে জয় বাংলা বলতে হবে।’ বাঁধনকে ‘জুলাই জঙ্গি’ বলার পাশাপাশি তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েও হামলাকারীদের আক্রমণাত্মক মন্তব্য করতে শোনা যায় ভিডিওতে।
বাঁধন বলেন, ‘তারা বলেছে, আমি জুলাই যোদ্ধা। ইয়েস, আই অ্যাম। আমি অবশ্যই জুলাইয়ের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘তারা বলেছে যে তারা বঙ্গবন্ধুর সৈনিক। তারা আমাকে বলেছে যে ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু’ বলতে জোর করে। তো এবং তারা সেগুলো ভিডিও করেছে এবং সেগুলো তারা লাইভ করছিল, আপলোড করছিল।’
হামলার সময় বাঁধনের ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি। বাঁধন বলেন, ‘আমার গায়ে হাত তোলা হয়েছে। আমার ভাইয়ের স্ত্রীকেও ধাক্কা দেওয়া হয়েছে।’ ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে বাঁধন বলেন, ‘একজন আজমেরী হক বাঁধনকে দমানো এত সহজ হবে না। আপনারা আজ সারা বিশ্বের মানুষকে দেখালেন, বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বকারী একজন অভিনেত্রীকে হেনস্তা করা হলো।’
হামলাকারীদের উদ্দেশে তিনি আরও বলেন, ‘আপনাদের এই অসংলগ্ন আচরণ থেকে বেরিয়ে আসা উচিত ছিল, আপনারা তা করতে পারেননি। আপনারা ভেবেছেন, এভাবে করেই হয়তো পরবর্তীকালে নিজেদের জায়গাটা ফের সুগঠিত করতে পারবেন। সেটা আমার মনে হচ্ছে না।’
বাঁধন আরও বলেন, আওয়ামী লীগের কর্মীরা হয়তো জানেন না, তিনি যে সিনেমাটি নিয়ে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে এসেছেন, সেটির পরিচালক রুবাইয়াত হোসেন। রুবাইয়াত হোসেনের বাবা আওয়ামী লীগের একজন মন্ত্রী ছিলেন উল্লেখ করে বাঁধন বলেন, ‘আপনারা একটু খবর নিয়ে দেখবেন। সো আমি তার সাথে কাজ করেছি এবং জুলাইয়ের পরেই কাজ করেছি।’
ভিডিও বার্তায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়ের কথাও উল্লেখ করেন বাঁধন। তিনি জানতে পেরেছেন, সজীব ওয়াজেদ জয়ও ভেনিসে আছেন। তাঁর কাছে এই ঘটনা পৌঁছে দেওয়ার কথাও বলেন অভিনেত্রী।
ঘটনার পর বাঁধনকে স্বাভাবিক অবস্থায় দেখা যায়নি। তাঁর চোখে-মুখে আতঙ্কের ছাপ দেখা যায়। আঘাতে তাঁর মুখ ফুলে ও লাল হয়ে যায়। সোমবার মধ্যরাতে ফেসবুক লাইভে এসে তিনি পুরো ঘটনার বিস্তারিত জানান। ঘটনার পর ভেনিসের একটি থানায় অভিযোগ করেছেন বাঁধন।
ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে বাঁধন
৮৩ তম ভেনিস আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে রুবাইয়াত হোসেন পরিচালিত ‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ সিনেমার প্রদর্শনীতে অংশ নিতে ইতালিতে গিয়েছেন বাঁধন। বর্তমানে তিনি মেস্ত্রে শহরে অবস্থান করছেন। সোমবার রাতে ভাই ও তাঁর পরিবারের সঙ্গে স্থানীয় একটি পার্কে গেলে হামলা ও হেনস্তার ঘটনা ঘটে।
‘দ্য ডিফিকাল্ট ব্রাইড’ ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবের প্রতিযোগিতামূলক অরিজন্তি বিভাগে জায়গা পেয়েছে। ৬ সেপ্টেম্বর সালা দারসেনা থিয়েটারে সিনেমাটির ওয়ার্ল্ড প্রিমিয়ার হয়। সিনেমাটির মুখ্য চার নারী চরিত্রে অভিনয় করেছেন জাইনীন করিম, রিকিতা নন্দিনী শিমু, সুনেরাহ্ বিনতে কামাল ও আজমেরী হক বাঁধন।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার আন্দোলনে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন বাঁধন। আন্দোলনের পক্ষে দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমে কথা বলেছিলেন তিনি। সেই রাজনৈতিক ভূমিকার কারণেই এই হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে অভিযোগ করেছেন অভিনেত্রী।