সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদকে দেশে ফিরিয়ে আনতে আনুষ্ঠানিক উদ্যোগ শুরু করেছে সরকার। এ প্রক্রিয়ায় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), পুলিশ সদরদপ্তরের ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) এবং ইন্টারপোল সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, বেনজীরকে বাংলাদেশে ফেরাতে প্রথমে প্রত্যর্পণ (এক্সট্রাডিশন) প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন করবে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে কূটনৈতিক চ্যানেলে সেই প্রস্তাব সংযুক্ত আরব আমিরাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলা, গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং প্রয়োজনীয় আইনি নথিপত্র প্রস্তুতের দায়িত্ব পালন করছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুবাইয়ের প্রচলিত আইন অনুযায়ী, গ্রেপ্তারের দিন থেকে ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দিতে হবে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাংলাদেশ থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র পাওয়ার পর বেনজীরকে হস্তান্তরের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আদালত। বর্তমানে তার বিরুদ্ধে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ এবং গ্রেপ্তারের ধাপ সম্পন্ন হয়েছে।
পুলিশের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বাংলাদেশের সঙ্গে ভারত, থাইল্যান্ড ও দক্ষিণ আফ্রিকার বন্দিবিনিময় চুক্তি থাকলেও সংযুক্ত আরব আমিরাতের সঙ্গে এমন কোনো চুক্তি নেই। তবে অতীতে পারস্পরিক আইনি সহায়তা (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স-এমএলএ) ব্যবস্থার মাধ্যমে আমিরাত থেকে একাধিক পলাতক আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনার নজির রয়েছে।
২০১৪ সালের অক্টোবরে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যে নিরাপত্তা সহযোগিতা, দণ্ডপ্রাপ্ত আসামি স্থানান্তর এবং ঢাকায় আমিরাতের দূতাবাসের জন্য জমি হস্তান্তরসহ তিনটি গুরুত্বপূর্ণ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছিল। এসব চুক্তিও বর্তমান প্রক্রিয়ায় সহায়ক হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার জাতীয় সংসদে দেওয়া এক বিবৃতিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমিরাতের আইনি কাঠামো অনুসরণ করে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে বেনজীর আহমেদকে প্রত্যর্পণের আনুষ্ঠানিক অনুরোধ জানানো হবে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ পাচারসহ একাধিক মামলা বিচারাধীন রয়েছে এবং দ্রুত তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, “এটি বাংলাদেশ পুলিশের একটি ঐতিহাসিক সাফল্য। এর মাধ্যমে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার পথ আরও সুগম হবে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়।”
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও জানান, বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর বেনজীর আহমেদকে গ্রেপ্তারের জন্য ইন্টারপোলের সহযোগিতা চেয়ে ২০২৫ সালে আবেদন করা হয়। পরে একই বছরের ১১ এপ্রিল ইন্টারপোল তার বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারি করে। সেই নোটিশের ভিত্তিতেই দুবাই পুলিশ তাকে আটক করে।
পুলিশ সদরদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে বাংলাদেশ অন্তত ২৫ জনের বিরুদ্ধে রেড নোটিশ জারির আবেদন করেছে। তবে এখন পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের মধ্যে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধেই রেড নোটিশ কার্যকর হওয়ার তথ্য নিশ্চিত হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, বেনজীরকে দেশে ফিরিয়ে আনতে হলে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের শক্তিশালী আইনি ভিত্তি ও নির্ভুল নথিপত্র উপস্থাপন করতে হবে। অন্যথায় তিনি আমিরাতের আদালতে আইনি সুযোগ নেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন।
তারা আরও জানান, অতীতে রেড নোটিশ জারির পরও কিছু আসামিকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে একাধিক দেশের পাসপোর্ট ব্যবহার কিংবা জটিল আইনি প্রক্রিয়ার কারণে অনেক ক্ষেত্রে প্রত্যর্পণ বিলম্বিত হয়েছে। তবে বেনজীর আহমেদের ক্ষেত্রে বাংলাদেশি পাসপোর্ট ব্যবহার করে সংযুক্ত আরব আমিরাতে প্রবেশের তথ্য পাওয়া গেছে, যা প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে সহজ করতে পারে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তাদের মতে, বাংলাদেশকে আমিরাতের আদালতের কাছে স্পষ্টভাবে প্রমাণ করতে হবে যে বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলো রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত নয়; বরং দুর্নীতি, অবৈধ সম্পদ অর্জন, জালিয়াতি ও অর্থ পাচারের মতো গুরুতর অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কিত। একই সঙ্গে তাকে দেশে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা হবে—এ বিষয়েও সন্তুষ্ট করতে হবে আমিরাতের কর্তৃপক্ষকে।