কাউনিয়ায় ক্র্যাচে ভর দিয়ে হাঁটেন
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ এক পা প্রায় অচল, অন্য পাটিও দুর্বল। হাঁটতে হয় ক্র্যাচে ভর দিয়ে। অথচ জীবিকার তাগিদে সেই একরামুল হকই উঠে যান গাছের মগডালে। কখনো এক গাছ থেকে আরেক গাছে লাফিয়ে লাফিয়ে কাটেন ডালপালা। ঝুঁকিপূর্ণ এই কাজ করেই স্ত্রী, সন্তান ও বাবা-মাসহ পরিবারের সদস্যদের মুখে খাবার তুলে দিচ্ছেন তিনি।
৩৩ বছর বয়সী একরামুল হকের বাড়ি রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার দক্ষিণ মদামুদন এলাকায়। মাত্র ১৫ বছর বয়স থেকেই গাছের ডালপালা কাটার কাজ করছেন তিনি। এ কাজ করে মাসে আয় করেন প্রায় ১২ থেকে ১৪ হাজার টাকা। পাশাপাশি সমাজসেবা অধিদপ্তর থেকেও কিছু সহায়তা পান।
পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে, একরামুল স্বাভাবিকভাবেই জন্মেছিলেন। মাত্র তিন বছর বয়সে পোলিও আক্রান্ত হয়ে একটি পায়ের কর্মক্ষমতা হারান তিনি। অন্য পাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। স্থানীয় একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করলেও পরে আর পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারেননি।
শারীরিক প্রতিবন্ধকতা সত্তে¡ও কারও কাছে হাত না পেতে নিজের কর্মসংস্থানের পথ বেছে নিয়েছেন একরামুল। প্রতিদিন ক্র্যাচে ভর দিয়ে গ্রামে গ্রামে ঘুরে কাজ খোঁজেন। গাছ কাটার কাজ পেলেই ক্র্যাচ রেখে উঠে পড়েন গাছের গায়ে। মুহুর্তেই পৌঁছে যান মগডালে। প্রয়োজনে এক গাছ থেকে আরেক গাছেও লাফিয়ে যান।
একরামুলের বাবা আবদুল করিম বলেন, “ছেলে ছোটবেলায় পোলিওতে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধী হয়েছে। তাকে বলেছি, জীবনে দশজনের কাছে হাত পেতে খাওয়ার চেয়ে নিজের কাজ করে খাওয়া ভালো। এরপর সে গাছে ওঠা শিখেছে। এখন গাছ কাটার কাজ করেই সংসার চালায়।”
মা মনোয়ারা বেগম বলেন, “অনেক টাকা খরচ করেও ছেলেকে সুস্থ করতে পারিনি। চিকিৎসার জন্য অনেক জায়গায় নিয়েছি। এখন আল্লাহর ওপর ভরসা করে সে গাছ কাটার কাজ করে।”
একরামুলের গাছে ওঠার দৃশ্য স্থানীয়দের বিস্মিত করলেও তার নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন তারা। স্থানীয় এক ব্যক্তি বলেন, “একরামুল যতক্ষণ গাছের ওপর থাকে, ততক্ষণ আমরা চিন্তায় থাকি। কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে বড় বিপদ হতে পারে। আমরা তাকে সাবধান করি। কিন্তু সে বলে, আল্লাহ তার সহায়।”
স্ত্রী, সন্তান, মা-বাবা, তিন ভাই ও এক বোন নিয়ে একরামুলের পরিবার। পরিবারের বড় একটি দায়িত্ব তার কাঁধে। তার স্বপ্ন, সংসারের অভাব ঘোচানো এবং সন্তানদের ভালোভাবে মানুষ করা।