পদার্থবিজ্ঞানে ২০২৬ সালের নোবেল পুরস্কার লাভ করেছেন বেলজীয় বংশোদ্ভূত বেলজিয়ান-মার্কিন কণা-পদার্থবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন।
আজ মঙ্গলবার সুইডেনের রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর নাম ঘোষণা করে।
অ্যান্টার্কটিকার দক্ষিণ মেরুতে অবস্থিত পৃথিবীর বৃহত্তম ‘আইসকিউব নিউট্রিনো অবজারভেটরি’ নির্মাণে অনন্য সাধারণ নেতৃত্ব এবং মহাজাগতিক উৎস থেকে আসা উচ্চ-শক্তির নিউট্রিনো কণা আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এই সম্মানজনক পুরস্কারে ভূষিত করা হয়েছে।
১৯৮৮ সালে বিজ্ঞানী হালজেন প্রথম প্রস্তাব করেছিলেন যে, দক্ষিণ মেরুর গভীর ও স্বচ্ছ আদিম হিমবাহের বরফকে কাজে লাগিয়ে মহাবিশ্বের রহস্যময় আধানহীন ‘নিউট্রিনো’ কণা শনাক্ত করা সম্ভব। তাঁর এই ধারণার ওপর ভিত্তি করে পরবর্তীতে গড়ে ওঠা আইসকিউব অবজারভেটরি সফলভাবে মহাজাগতিক নিউট্রিনো শনাক্ত করতে সক্ষম হয়, যা জ্যোতির্বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ নতুন এক দিগন্তের সূচনা করেছে।
বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস হালজেন বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন-ম্যাডিসন বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক এবং প্রাথমিক কণা পদার্থবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে কর্মরত আছেন।
নোবেল ফাউন্ডেশনের ১২৫তম বার্ষিকী উপলক্ষে এ বছর পুরস্কারের মোট অর্থ বাড়িয়ে ১২ মিলিয়ন (১ কোটি ২০ লাখ) সুইডিশ ক্রোনা (প্রায় ১২ লাখ মার্কিন ডলার) করা হয়েছে। এককভাবে মনোনীত হওয়ায় পুরস্কারের সম্পূর্ণ অর্থ, একটি স্বর্ণপদক এবং সম্মাননা সনদ তিনি একাই পাবেন।
আগামী ১০ই ডিসেম্বর আলফ্রেড নোবেলের প্রয়াণ দিবসে সুইডেনের স্টকহোমে আনুষ্ঠানিকভাবে তাঁর হাতে এই পুরস্কার তুলে দেওয়া হবে।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ১৯০১ সাল থেকে প্রতিবছর এই পুরস্কার প্রদান করে। সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ডিনামাইটের উদ্ভাবক আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর পাঁচ বছর পর থেকে তাঁর নামে এবং রেখে যাওয়া অর্থে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। ১৯৬৯ সালে এতে যুক্ত হয় অর্থনীতি।
প্রতিবছর আলফ্রেড নোবেলের মৃত্যুর দিবস ডিসেম্বরের ১০ তারিখ বিজয়ীদের হাতে পুরস্কারের অর্থ তুলে দেওয়া হয়। প্রতি ক্ষেত্রে পুরস্কার বিজয়ীরা একটি স্বর্ণপদক, শংসাপত্রসহ একটি ডিপ্লোমা এবং বর্তমানে ১১ মিলিয়ন সুইডিশ ক্রোনার পান।
নোবেল পুরস্কারের জন্য প্রতিবছর ৩০০ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়। এরপর যাচাই-বাছাই শেষে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
১৯০১ সাল থেকে শুরু করে ২০২৬ সাল পর্যন্ত পদার্থবিজ্ঞানে মোট ১২০ বার নোবেল পুরস্কার হয়েছে। এই দীর্ঘ সময়ে সর্বমোট ২৩০ জন বিজ্ঞানী পদার্থবিদ্যায় বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ এই মেডেল লাভ করেছেন। একজন পেয়েছেন দু’বার। তিনি হলেন মার্কিন পদার্থবিজ্ঞানী জন বারডিন। তিনি ১৯৫৬ (ট্রানজিস্টর আবিষ্কার) এবং ১৯৭২ সালে (অতিপরিবাহিতা বা বিসিএস তত্ত্ব) দুবার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পান।
এ পর্যন্ত মাত্র ৫ জন নারী পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। এঁরা হলেন, মেরি ক্যুরি (১৯০৩), মারিয়া গোয়েপার্ট-মেয়ার (১৯ ১৯৬৩), ডোনা স্ট্রিকল্যান্ড (২০১৮), অ্যান্ড্রেয়া গেজ (২০২০) এবং অ্যান ল’হুইলিয়ার (২০২৩)।
১৯০১ সালে ইতিহাসের সর্বপ্রথম পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন জার্মানির কিংবদন্তি পদার্থবিদ ভিলহেম কনরাড রঞ্জন, চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে সবচেয়ে বৈপ্লবিক আবিষ্কারগুলোর অন্যতম ‘এক্স-রে’ বা রঞ্জনরশ্মি আবিষ্কারের স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে এককভাবে এই সম্মাননা দেওয়া হয়।
মানুষের নাগালে থাকা সাধারণ আলোক তরঙ্গের বাইরে অদৃশ্য এক শক্তিশালী বিকিরণ ব্যবহার করে শরীরের ভেতরের হাড় ও কাঠামোর ছবি তোলার এই পদ্ধতি মানবজাতির চিকিৎসাসেবা ও রোগ নির্ণয় প্রক্রিয়াকরণকে চিরতরে বদলে দেয়।
১১৯তম নোবেল (২০২৫): কোয়ান্টাম টানেলিং ও ভবিষ্যতের কম্পিউটার
গতবছর ২০২৫ সালে পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান যৌথভাবে তিন বিজ্ঞানী: ব্রিটেনের জন ক্লার্ক, ফ্রান্সের মিশেল এইচ. ডেভোরেট এবং যুক্তরাষ্ট্রের জন এম. মার্টিনিস।
রয়্যাল সুইডিশ একাডেমি অব সায়েন্সেস ‘ম্যাক্রোস্কোপিক কোয়ান্টাম মেকানিক্যাল টানেলিং’ এবং বিদ্যুৎ সার্কিটে শক্তির কোয়ান্টায়ন সংক্রান্ত যুগান্তকারী পরীক্ষার জন্য তাঁদের সম্মানিত করে।
তাঁদের এই গবেষণা প্রমাণ করে যে, সাধারণত অতি-ক্ষুদ্র কণার জগতে দৃশ্যমান অদ্ভুত কোয়ান্টাম আচরণগুলো মানুষের হাত দিয়ে ছোঁয়া যায় এমন বড় সার্কিটেও তৈরি করা সম্ভব।
এই আবিষ্কারটি বর্তমান বিশ্বের বহুল আলোচিত সুপার-ফাস্ট কোয়ান্টাম কম্পিউটিং এবং হ্যাকিং-মুক্ত কোয়ান্টাম ক্রিপ্টোগ্রাফি বা তথ্য সুরক্ষার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছে।