https://www.a1news24.com
১৮ই অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ১২:৫২

বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণ দিবস আজ

বাংলা ব্যান্ডসংগীতের কিংবদন্তি আইয়ুব বাচ্চুর প্রয়াণ দিবস আজ ১৮ অক্টোবর। ২০১৮ সালের এই দিনে না ফেরার দেশে পাড়ি জমান ‘রূপালি গিটার’-এর জাদুকর। নিজের অসাধারণ কণ্ঠ, গিটার বাজানোর অনন্য দক্ষতা এবং জনপ্রিয় অসংখ্য গানের মাধ্যমে তিনি জয় করেছিলেন কোটি শ্রোতার হৃদয়। সংগীতজীবনে সাফল্যের পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন তিনি। তবে জীবদ্দশায় তাঁর দেখা কিছু স্বপ্ন অপূর্ণই থেকে গেছে।

আইয়ুব বাচ্চু ছিলেন স্বপ্নবাজ একজন সংগীতশিল্পী। নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি অন্যদেরও স্বপ্ন দেখতে উৎসাহিত করতেন তিনি। তাঁর দেখানো পথে সংগীতজগতে জায়গা করে নিয়েছেন অনেক শিল্পী। মঞ্চে গান পরিবেশনের পাশাপাশি গিটারে অসাধারণ নৈপুণ্য দেখিয়ে দর্শকদের মুগ্ধ করতেন এই শিল্পী। কনসার্টে তাঁর পরিবেশনা ছিল ভক্তদের কাছে বিশেষ আকর্ষণ। অথচ দেশি-বিদেশি নামকরা শিল্পীদের নিয়ে বিশাল একটি কনসার্ট আয়োজনের স্বপ্ন পূরণ করে যেতে পারেননি তিনি।

এক সাক্ষাৎকারে নিজের স্বপ্নের কনসার্টের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছিলেন আইয়ুব বাচ্চু। তাঁর ইচ্ছা ছিল রাজধানীর মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে আয়োজন করা হবে সেই কনসার্ট। সেখানে বাংলাদেশের জনপ্রিয় শিল্পীদের পাশাপাশি অংশ নেবেন আন্তর্জাতিক অঙ্গনের খ্যাতিমান সংগীতশিল্পীরা। বিদেশি শিল্পীদের মধ্যে তিনি মার্কিন গায়ক ও গিটারিস্ট স্টিভ ভাই, জো সাত্রানি, কার্লোস সান্তানা এবং ব্রিটিশ ড্রামার আয়েন পেজের নাম উল্লেখ করেছিলেন। বাংলাদেশের শিল্পীদের মধ্যে তাঁর পরিকল্পনায় ছিলেন জেমস, বেজবাবা সুমন ও মানাম আহমেদ।

স্বপ্নের সেই আয়োজনের ব্যাপ্তি বোঝাতে আইয়ুব বাচ্চু বলেছিলেন, ‘আমরা একটা স্লট বাজাবো, ঘণ্টা তিনেক ধরে। আর দর্শক থাকবে ১৫ লাখ। তাহলে সেটা হবে স্বপ্নের কনসার্ট।’ বিশাল দর্শকসমাগমে দেশি-বিদেশি শিল্পীদের নিয়ে এক মঞ্চে সংগীত পরিবেশনের এই পরিকল্পনা ছিল তাঁর অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু মৃত্যুর কারণে সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ পায়নি।

কেবল বিশাল কনসার্ট আয়োজনই নয়, নতুন প্রজন্মের সংগীতশিল্পীদের জন্য একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার স্বপ্নও ছিল আইয়ুব বাচ্চুর। গিটারের প্রতি তাঁর ভালোবাসা ছিল আজীবনের। বিভিন্ন নামিদামি গিটার সংগ্রহের পাশাপাশি তিনি নিয়মিত গিটার বাজাতেন। নিজের অভিজ্ঞতা ও সংগীতের প্রতি ভালোবাসাকে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলেন তিনি।

তাঁর পরিকল্পনা ছিল এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে ছেলেমেয়েরা গিটারসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র বাজানো শিখতে পারবে। প্রশিক্ষণ শেষে সেখান থেকে একক শিল্পী কিংবা ব্যান্ড গড়ে উঠবে, যারা বাংলা গানে নিজেদের প্রতিভার স্বাক্ষর রাখবে। তবে এই উদ্যোগও বাস্তবায়ন করে যেতে পারেননি তিনি।

১৯৬২ সালের ১৬ আগস্ট চট্টগ্রামে জন্মগ্রহণ করেন আইয়ুব বাচ্চু। ছোটবেলা থেকেই সংগীতের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। পরিবারের অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাবার কাছ থেকে ১৯৭৩ সালে গিটার পান তিনি। সেই গিটারকে সঙ্গী করেই ধীরে ধীরে সংগীতশিল্পী হয়ে ওঠেন। কলেজজীবনে বন্ধুদের নিয়ে ‘গোল্ডেন বয়েজ’ নামে একটি ব্যান্ড গঠন করেন। ১৯৭৭ সালে যোগ দেন ‘ফিলিংস’ ব্যান্ডে, যেখানে জেমসের সঙ্গে একই দলে কাজ করার অভিজ্ঞতা হয় তাঁর।

১৯৮০ সালে আইয়ুব বাচ্চু যোগ দেন ‘সোলস’ ব্যান্ডে। দীর্ঘ সময় সেখানে কাজ করার পর ১৯৯১ সালে গড়ে তোলেন নিজের ব্যান্ড ‘এলআরবি’। ওই বছরের এপ্রিলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম কনসার্ট করে দলটি। পরবর্তী সময়ে ‘এলআরবি ১’ ও ‘এলআরবি ২’ অ্যালবাম প্রকাশের পর ‘সুখ’ অ্যালবামের মাধ্যমে ব্যাপক জনপ্রিয়তা পায় ব্যান্ডটি। পরে ‘তবুও’, ‘ঘুমন্ত শহরে’, ‘আমাদের বিস্ময়’, ‘অচেনা জীবন’, ‘স্পর্শ’ ও ‘যুদ্ধ’সহ একাধিক অ্যালবাম শ্রোতাদের উপহার দেয় এলআরবি।

ব্যান্ডের বাইরেও একক শিল্পী হিসেবে আইয়ুব বাচ্চুর জনপ্রিয়তা ছিল ব্যাপক। ‘রক্ত গোলাপ’, ‘ময়না’, ‘কষ্ট’, ‘সময়’, ‘একা’, ‘প্রেম তুমি কি!’, ‘পথের গান’ ও ‘জীবন’সহ তাঁর একাধিক একক অ্যালবাম রয়েছে। সিনেমাতেও প্লেব্যাক করেছেন তিনি।

মৃত্যুর পরও শ্রোতাদের ভালোবাসায় বেঁচে আছেন আইয়ুব বাচ্চু। ২০২৬ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদকে ভূষিত করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। জন্মশহর চট্টগ্রামের প্রবর্তক মোড়ে তাঁর স্মরণে স্থাপন করা হয়েছে গিটার ভাস্কর্য। তাঁর গান, গিটারের সুর এবং অপূর্ণ স্বপ্নগুলো আজও বাংলা সংগীতাঙ্গনে তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে।

আরো..