বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সংকট মোকাবিলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও আর্থিক খাতের সংস্কারে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন। ব্যাংককে চলমান বিশ্বব্যাংক ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভার ফাঁকে বুধবার (১৪ অক্টোবর) দেশ দুটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে পৃথক বৈঠকে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে সহযোগিতা চাওয়া হলে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যায়। বাংলাদেশ প্রতিনিধি দলের একাধিক কর্মকর্তা এ তথ্য জানিয়েছেন।
কর্মকর্তারা জানান, চীনের এক্সিম ব্যাংক বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। এ বিষয়ে আলোচনার জন্য আগামী সপ্তাহে ব্যাংকটির চেয়ারম্যানের ঢাকা সফরের কথা রয়েছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট বাংলাদেশের ঋণ ব্যবস্থাপনাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
আইএমএফের ঋণ কর্মসূচিতে যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কারণে দেশটির সমর্থনকে বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। যুক্তরাষ্ট্র থেকে উড়োজাহাজ, জ্বালানি তেল ও নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য আমদানির প্রেক্ষাপটে বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্য ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে মার্কিন অনুদান ও বিশেষ সহযোগিতাও চাওয়া হয়েছে।
বৈঠক শেষে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের উন্নতি হয়েছে। বাংলাদেশ দেশটি থেকে উড়োজাহাজ কেনার পাশাপাশি সয়াবিনসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি বাড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্রের আরও সহায়তা পাওয়া উচিত। তিনি বলেন, অতীতে আমরা যুক্তরাষ্ট্র থেকে তেমন কিছু পাইনি। কিন্তু বাংলাদেশ-যুক্তরাষ্ট্র সম্পর্ক যেভাবে এগিয়েছে, সেই প্রেক্ষাপটে আমরা আরও সহায়তা প্রত্যাশা করছি।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, আইএমএফ, বিশ্বব্যাংক ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা মনে করছে, বাংলাদেশ বর্তমান অর্থনৈতিক সংকট ও উচ্চ মূল্যস্ফীতির পরিস্থিতি উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে। এর সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবও যুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো সরকারের সংস্কার উদ্যোগে আস্থা রাখছে। আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে সহযোগিতার বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
বার্ষিক সভার বৈঠকগুলোতে বাংলাদেশ জানিয়েছে, প্রথাগত সার্বভৌম ঋণের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ইকুইটি বিনিয়োগ ও সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ বাড়ানো হবে। চীনের এক্সিম ব্যাংকের সহযোগিতায় যৌথ বিনিয়োগের সুযোগও খোঁজা হচ্ছে।
সরকারের অগ্রাধিকার হচ্ছে রাজস্ব আয় বাড়ানো, ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতির চাপ থেকে সাধারণ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া। এ জন্য করের হার না বাড়িয়ে করের আওতা সম্প্রসারণ, কর ফাঁকি বন্ধ এবং রাজস্ব নীতি প্রণয়ন ও রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব আলাদা করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
ব্যাংক খাতের সংস্কারে খেলাপি ঋণ কমানো, দুর্বল ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি পুনর্গঠন ও আমানতকারীদের স্বার্থ সুরক্ষায় সময়সীমাভিত্তিক পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। বন্ধ কলকারখানা চালু এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ বাড়াতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ অর্থায়ন প্যাকেজের মাধ্যমে বিনিয়োগ ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদ্যোগও রয়েছে।
রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বিগত সরকারের রেখে যাওয়া ভঙ্গুর অর্থনীতি স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির সঙ্গে মোকাবিলা করছে বর্তমান সরকার। বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) ও যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্টসহ আন্তর্জাতিক অংশীদাররা সরকারের সংস্কার কৌশলে আস্থা প্রকাশ করেছে।
মূল্যস্ফীতি ও বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ থেকে নিম্ন আয়ের মানুষকে সুরক্ষা দিতে ফ্যামিলি কার্ড ও ফার্মার্স কার্ডের মতো কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে সরকার। অর্থনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি এসব উদ্যোগের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা ধরে রাখার পরিকল্পনা রয়েছে।
এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠীকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির বড় সুযোগ হিসেবে দেখছে আইএমএফ। গতকাল বুধবার বার্ষিক সভার এক সংবাদ সম্মেলনে সংস্থাটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভার উপস্থিতিতে এ বিষয়ে বক্তব্য তুলে ধরা হয়।
আইএমএফ বলেছে, তরুণদের সম্ভাবনা কাজে লাগাতে শিক্ষা, দক্ষতা উন্নয়ন ও স্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বিকাশ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং পরিবর্তিত শ্রমবাজারের উপযোগী প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী অর্থনীতির সুযোগ না হয়ে নীতিনির্ধারকদের জন্য চাপে পরিণত হতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল অর্থায়ন নতুন সুযোগ তৈরি করলেও শ্রমবাজারে পরিবর্তন এবং আয়বৈষম্য বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে বলে সতর্ক করেছে সংস্থাটি। প্রযুক্তির সুফল সবার কাছে পৌঁছাতে ডিজিটাল অবকাঠামো, টেকসই জ্বালানি ও দক্ষ জনশক্তিতে বিনিয়োগের পরামর্শ দিয়েছে তারা।
রাজস্ব আয় বাড়ানো, ঋণের চাপ সামলানো ও সরকারি ব্যয়ের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য করের আওতা সম্প্রসারণ এবং অযৌক্তিক কর অব্যাহতি কমানোর তাগিদ দিয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটির মতে, জ্বালানি ও অন্যান্য পণ্যে ঢালাও ভর্তুকির পরিবর্তে প্রকৃত সুবিধাভোগীদের লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা দেওয়া উচিত।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভার তৃতীয় দিনে ‘ফিসক্যাল মনিটর’ বিষয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এতে বক্তব্য দেন আইএমএফের ফিসক্যাল অ্যাফেয়ার্স বিভাগের পরিচালক রদ্রিগো ভালদেসসহ সংস্থাটির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
আইএমএফের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢালাও ভর্তুকির সুবিধা অনেক সময় দরিদ্র মানুষের চেয়ে বেশি ভোগক্ষমতাসম্পন্ন জনগোষ্ঠী বেশি পায়। তাই নিম্ন আয়ের মানুষ, ঝুঁকিপূর্ণ পরিবার ও গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য সুনির্দিষ্ট সহায়তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে কর সংস্কার ও ভর্তুকি পুনর্বিন্যাসের সময় দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ না পড়ার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখতে হবে।