চরে চরে নবান্নের আমেজ
সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার চরাঞ্চলে আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। ধান কাটাকে ঘিরে চরজুড়ে বইতে শুরু করেছে নবান্নের আগাম উৎসবের আমেজ। চলতি মৌসুমে আগাম জাতের আমনের বাম্পার ফলনে খুশি কৃষকেরা। মাঠের পর মাঠ পাকা ধান কাটা, মাড়াই ও ঘরে তোলার ব্যস্ততায় মুখর হয়ে উঠেছে চরাঞ্চল।
সরেজমিনে উপজেলার ব-দ্বীপ নামে পরিচিত ঢুসমারা চরে গিয়ে দেখা যায়, মাঠের পর মাঠ পাকা আমন ধান কাটতে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। জমিতে চলছে চারটি হারভেস্টার মেশিন। শ্রমিক সংকট ও মজুরি বৃদ্ধি পাওয়ায় আধুনিক প্রযুক্তির এই যন্ত্রের প্রতি ঝুঁকছেন কৃষকেরা। হারভেস্টার মেশিনে একই সঙ্গে ধান কাটা, মাড়াই ও সংগ্রহ করা সম্ভব হওয়ায় সময় ও খরচ দুটোই সাশ্রয় হচ্ছে। এতে কমছে কৃষকের শ্রমনির্ভরতা ও আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি।
ঢুসমারা চরের কৃষক কোব্বাত আলী জানান, অক্টোবরের শুরু থেকেই আগাম জাতের আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে, যা চলবে পুরো মাসজুড়ে। মূল মৌসুমের আমন ধান কাটা শুরু হবে নভেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। তিনি বলেন, “এ বছর বড় দুই দফা বন্যায় ভেবেছিলাম ফসল রক্ষা করা সম্ভব হবে না। কিন্তু আল্লাহর রহমতে পানি দ্রুত নেমে যাওয়ায় এবং মারাত্মক রোগবালাই না থাকায় এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। এক দোন (২৫ শতক) জমিতে প্রায় ১২ থেকে ১৪ মণ ধান পেয়েছি।”
অপর কৃষক তাজুল ইসলাম বলেন, সার, ডিজেল ও কীটনাশকের দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় ধান উৎপাদনে খরচ আগের চেয়ে বেশি হচ্ছে। তবে ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। তিনি আরও বলেন, আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর জমি প্রস্তুত করে শীতকালীন ফসল চাষ করা হবে। ইতোমধ্যে অনেক কৃষক ধান কাটার পর জমিতে মরিচ চাষ শুরু করেছেন। কেউ কেউ আগাম ভুট্টা চাষের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন। এতে একই জমিতে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
ঢুসমারা চরের জমির মালিক শহিদুল ইসলাম ভুট্টু জানান, তিনি তাঁর সব জমি বর্গা দিয়েছেন। এবার ধানের ফলন ভালো হওয়ায় তিনি লাভবান হবেন বলে আশা করছেন। তবে উৎপাদন ভালো হলেও ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশায় রয়েছেন। উপজেলা কৃষি বিভাগ জানায়, কাউনিয়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় চলতি আমন মৌসুমে ১১ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমিতে চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে চাষ হয়েছে ১১ হাজার ৪৬০ হেক্টর জমিতে। এ মৌসুমে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৩৫৫ মেট্রিক টন।
উপজেলা কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন জানান, “মৌসুমের শুরুতে কিছুটা খরা ও অনাবৃষ্টি এবং চরাঞ্চলে দুই দফা বন্যা হলেও বর্তমানে ধানের ক্ষেতের অবস্থা ভালো। আগাম জাতের আমনের উৎপাদনও আশানুরূপ হয়েছে। ফলে স্থানীয় কৃষক ও কৃষি বিভাগ এবার বাম্পার ফলনের আশা করছে।”
কৃষি কর্মকর্তা আরও জানান, আগাম জাতের আমন ধান কাটার পর কৃষকেরা জমিতে ভুট্টা, আলু, মরিচসহ বিভিন্ন ধরনের আগাম শাকসবজি ও শীতকালীন ফসল চাষ করেন। এতে কৃষকেরা একই জমি থেকে একাধিক ফসল উৎপাদনের সুযোগ পান। কৃষকদের উৎপাদন বৃদ্ধি ও কৃষি কার্যক্রমে সহযোগিতা করতে কৃষি বিভাগ সব সময় পাশে রয়েছে।
আগাম আমন ধান ঘরে তোলার পরপরই শীতকালীন ফসল চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন চরাঞ্চলের কৃষকেরা। কোথাও চলছে মরিচ চাষ, কোথাও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে ভুট্টা ও অন্যান্য শীতকালীন ফসলের। ফলে একদিকে যেমন ধান কাটাকে ঘিরে চরজুড়ে নবান্নের আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে, অন্যদিকে নতুন ফসলের স্বপ্নে আশাবাদী হয়ে উঠছেন কৃষকেরা।
তবে উৎপাদন খরচ বৃদ্ধির চাপ ও ধানের ন্যায্যমূল্য পাওয়া নিয়ে উদ্বেগও রয়েছে তাঁদের মধ্যে। ভালো ফলনের পাশাপাশি বাজারে ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করা গেলে কৃষকেরা আরও বেশি লাভবান হবেন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।