নিজস্ব প্রতিবেদক: রাজধানীর তিনটি মেট্রোরেল ও একটি ইলেকট্রিক ট্রেনসহ মোট ১২টি প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক)। এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ৬৮ হাজার ৭৮০ কোটি ৪০ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ৪৮ হাজার ২৫৬ কোটি ৩০ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ১ লাখ ২০ হাজার ৪৬৬ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। অনুমোদিত প্রকল্পের মধ্যে নতুন সাতটি এবং সংশোধিত পাঁচটি।
বুধবার (১৬ সেপ্টেম্বর) বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় এসব প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়।
অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় ব্যয়ের প্রকল্প ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-১) প্রথম সংশোধন। বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর পর্যন্ত এই প্রকল্পের সংশোধিত ব্যয় ধরা হয়েছে ১ লাখ ১৪ হাজার ৩৯৪ কোটি ৮৯ লাখ টাকা। জাপানের অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন ৩১ দশমিক ২৪ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পের ব্যয় সংশোধনের তথ্য পরিকল্পনা কমিশন ও সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের সাম্প্রতিক নথিভিত্তিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে।
এ ছাড়া হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ ঢাকা ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্টের (লাইন-৫) নর্দার্ন রুটের প্রথম সংশোধনে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ হাজার ৮৪৮ কোটি ৩৬ লাখ টাকা। মূল প্রকল্পের ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় বেড়েছে ১১৭ দশমিক ৮৭ শতাংশ।
গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫ হাজার ৫০৩ কোটি ৭৭ লাখ টাকা। এর মধ্যে ১৩ দশমিক ১০ কিলোমিটার অংশ পাতালপথে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এ প্রকল্পে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক ও দক্ষিণ কোরিয়া ঋণ সহায়তা দেবে।
রাজশাহী সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৯৪৩ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০২৬ সালের জুলাই থেকে ২০২৮ সালের ডিসেম্বর মেয়াদে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব করা হয়েছে।
চট্টগ্রাম সড়ক জোনের আওতায় জেলা মহাসড়কসমূহ যথাযথ মান ও প্রশস্ততায় উন্নীতকরণ তৃতীয় পর্যায়ের প্রকল্পে ব্যয় হবে ১ হাজার ৪৫৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দুটি প্রকল্পের মধ্যে বরিশাল সেনানিবাস স্থাপনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে ব্যয় ধরা হয়েছে ১ হাজার ১৫৩ কোটি ৬০ লাখ টাকা। খুলনা নৌ অঞ্চলে নৌ সদস্যদের আবাসন সুবিধাসহ অন্যান্য অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় হবে ৩৭৪ কোটি ১৫ লাখ টাকা। দুটি প্রকল্পেই সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন থাকবে।
খুলনা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্পের প্রথম সংশোধনে ব্যয় ২ হাজার ৩৩৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৫ হাজার টাকা থেকে বেড়ে ২ হাজার ৬০৪ কোটি ৫৩ লাখ ৮ হাজার টাকা করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকল্পটির মেয়াদ জুন ২০২৭ পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা-জয়দেবপুর সেকশনে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন চালুর প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৮২২ কোটি ৫১ লাখ টাকা। এর মধ্যে সরকারের অর্থায়ন ৯৪২ কোটি ৯ লাখ টাকা এবং প্রকল্প ঋণ ২ হাজার ৮৮০ কোটি ৪২ লাখ টাকা। ৫২ দশমিক ৩২ কিলোমিটার রেলপথে বৈদ্যুতিক ট্র্যাকশন ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে দেশে প্রথমবারের মতো রেলপথ বিদ্যুতায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনে ব্যয় ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি ৭০ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি ২৯ লাখ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ প্রকল্পটির ব্যয় বেড়েছে ৪ হাজার ৯৯০ কোটি ৫৯ লাখ টাকা বা ৮৯ দশমিক ৪৪ শতাংশ।
বস্ত্র ও চামড়া খাতের শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা উন্নয়নের ‘দ্য ইমপ্রুভড ওয়ার্কিং কন্ডিশন অ্যান্ড সোশ্যাল প্রটেকশন ফর ওয়ার্কার্স ইন দ্য টেক্সটাইল অ্যান্ড লেদার সেক্টর’ প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর।
মনপুরা দ্বীপাঞ্চলে বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন ও সম্প্রসারণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধনও অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটির আগের ব্যয় ছিল ১৩০ কোটি ২২ লাখ টাকা।
একনেক সভায় পরিকল্পনা মন্ত্রী কর্তৃক ৫০ কোটি টাকার কম ব্যয়ের অনুমোদিত আরও ১৫টি প্রকল্পের বিষয়ে অবহিত করা হয়। এসব প্রকল্পের মধ্যে ভূমি ব্যবস্থাপনা অটোমেশন, বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির জাতীয় সদর দপ্তর নির্মাণ, ভাসানচরে সবুজ বেষ্টনী ও কক্সবাজারে বনায়ন, দেশি মুরগি গবেষণা ও সংরক্ষণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলে টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্ক স্থাপন, ঝুঁকিপূর্ণ সেতু প্রতিস্থাপন, সিলেট বিভাগের ডিজিটাল এলিভেশন মডেল তৈরি, সৈয়দপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজের অবকাঠামো উন্নয়ন, খুলনা মিলিটারি কলেজিয়েট স্কুলের অবকাঠামো উন্নয়ন, বরগুনা ও দিনাজপুর জেলা স্টেডিয়াম উন্নয়ন এবং সিলেট-১০ নম্বর অনুসন্ধান কূপ খনন প্রকল্প রয়েছে।
সভায় অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী ড. আবদুল মঈন খান, সড়ক পরিবহন ও সেতু, রেলপথ এবং নৌপরিবহন মন্ত্রী শেখ রবিউল আলম, পানি সম্পদ মন্ত্রী মো. শহীদউদ্দীন চৌধুরী এ্যানি, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, কৃষি মন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন এবং পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি অংশ নেন। এ ছাড়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারাও সভায় উপস্থিত ছিলেন।