https://www.a1news24.com
৩রা সেপ্টেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, দুপুর ২:১৮

উত্তম কুমারের জন্মশতবর্ষ: ফিরে দেখা বাংলাদেশে তার জনপ্রিয়তা ও অলিভিয়ার সেই অধ্যায়

বাংলা চলচ্চিত্রের ইতিহাসে কিছু নাম কেবল অভিনয়শিল্পীর পরিচয়ে আটকে থাকে না। তারা হয়ে ওঠেন আবেগ। উত্তম কুমার তেমনই একজন। ১৯২৬ সালের ৩ সেপ্টেম্বর কলকাতায় জন্ম নেয়া অরুণ কুমার চট্টোপাধ্যায় পরবর্তী সময়ে বাঙালির কাছে পরিচিত হন ‘মহানায়ক’ উত্তম কুমার নামে। আজ তার জন্মের ১০০ বছর পূর্ণ হচ্ছে।

শতবর্ষে এসে উত্তম কুমারকে শুধু পশ্চিমবঙ্গের চলচ্চিত্রের নায়ক হিসেবে ভাবা যাবে না। তার জনপ্রিয়তার সীমানা বহু আগেই পেরিয়ে গিয়েছিল এ দেশেও। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছিলেন ভালোবাসার এক তারকা হিসেবে। তার মৃত্যুর চার দশকেরও বেশি সময় পরও দুই বাংলায় তার সিনেমা নিয়ে দর্শকের ভালোবাসা আজও আছে। অভিনেতার প্রতি ভক্তদের ভালোবাসা কলকাতার সিনেমায় আটকে ছিল না সেটা ছবিয়েছে বাঙালির জীবনেও।

বাংলাদেশে উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার একটি ঐতিহাসিক শিকড়ও রয়েছে। ষাটের দশকের মাঝামাঝি কলকাতার চলচ্চিত্র পূর্ব পাকিস্তানে প্রদর্শন বন্ধ হওয়ার আগ পর্যন্ত ঢাকার দর্শকেরা উত্তম-সুচিত্রা জুটির বহু সিনেমা দেখেছেন। নারী ও পুরুষ উভয় শ্রেণীর দর্শকের কাছে উত্তম কুমার অমর আজও। তিনি যখন বক্স অফিস দাপিয়ে বেড়িয়েছেন তখন তার প্রতি মানুষের ভালোবাসার কমতি ছিল না আর এখন নতুন প্রজন্মও তাকে ভালোবাসতে শিখেছে।

উত্তম কুমারের রোমান্টিক নায়ক-ইমেজ, ব্যক্তিত্ব, পোশাক, সংলাপ বলার ধরন এবং পর্দার উপস্থিতি তাকে নারী দর্শকদের কাছেও বিশেষ আকর্ষণের কেন্দ্রে পরিণত করেছিল। বাংলাদেশেও তার অসংখ্য নারী ভক্ত ছিল যাদের কাছে উত্তম কুমার ছিলেন পর্দার এক আদর্শ প্রেমিক-নায়ক।

উত্তম কুমার আর বাংলাদেশের অলিভিয়া
বাংলাদেশের সিনেমায় উত্তম কুমার কাজ করেননি কিন্তু এ দেশের একজন নায়িকার সঙ্গে অভিনয় করেছিলেন। উত্তম কুমারের সঙ্গে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সম্পর্কের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অধ্যায়টি তৈরি হয় একজন বাংলাদেশি অভিনেত্রীকে ঘিরে অলিভিয়া গোমেজ।

উত্তম কুমার বাংলাদেশের কোনো চলচ্চিত্রে অভিনয় করেননি। কিন্তু ১৯৭৬ সালে পীযূষ বসু পরিচালিত ভারতীয় বাংলা চলচ্চিত্র ‘বহ্নিশিখা’-য় তার সহশিল্পী ছিলেন বাংলাদেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী অলিভিয়া। বেঙ্গল ফিল্ম আর্কাইভের নথিতে বহ্নিশিখা-র অভিনয়শিল্পীদের তালিকায় উত্তম কুমার ও অলিভিয়া দুজনের নামই রয়েছে। সিনেমাটি ১৯৭৬ সালের ২৬ নভেম্বর কলকাতার কয়েকটি প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায়।

অলিভিয়া গোমেজ ছিলেন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের সত্তর ও আশির দশকের আলোচিত মুখ। ঢাকায় বেড়ে ওঠা এই অভিনেত্রী ১৯৭২ সালে চলচ্চিত্রের মাধ্যমে অভিনয়ে আসেন। ১৯৭৬ সালে ‘বহ্নিশিখা’-য় উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় তার ক্যারিয়ারের অন্যতম অধ্যায় হয়ে আছে। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপ্রেমীদের কাছে অলিভিয়ার আবদান যেন বেড়ে যায় উত্তমের সঙ্গে জুটি বেধে। তিনি শুধু একজন জনপ্রিয় বাংলাদেশি নায়িকা নন, তিনি ছিলেন দুই বাংলার জনপ্রিয় তারকার যোগসূত্র। সিনেমাটি মুক্তির পর দুই বাংলায় দারুণ আলোচনা শুরু হয়। আর সেই আলোচনা যেন এখনও চলছে।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের এক সময়ের গ্ল্যামারাস নায়িকা অলিভিয়া গোমেজ এবং ভারতীয় বাংলা সিনেমার মহানায়ক দুজনের একসঙ্গে পর্দায় উপস্থিতি আজ ঐতিহাসিক কৌতূহলের বিষয়। উত্তম কুমারের সঙ্গে অভিনয় করা অলিভিয়ার সেই অধ্যায় এখন হয়তো অনেকটাই বিস্মৃত। কিন্তু জন্মশতবর্ষে উত্তম কুমারকে ফিরে দেখার সময় সেটিই মনে করিয়ে দেয় দুই বাংলার চলচ্চিত্র আলাদা শিল্প-পরিসরে বেড়ে উঠলেও দর্শকের আবেগ অনেক সময় একই জায়গায় এসে মিশেছে।

মহানায়ক সীমান্ত মানেননি
উত্তম কুমারের জনপ্রিয়তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ হচ্ছে তার জন্য দর্শকের ভালোবাসা সীমানা মানেনি। তিনি পশ্চিমবঙ্গের অভিনেতা ছিলেন কিন্তু তিনি বাংলাদেশের মানুষের কাহে ভালোবাসা। এ দেশের অনেক তারকা তাকে দেখে অভিনয়ের প্রতি আগ্রহ বাড়িয়েছে। আজ তিনি নতুন প্রজন্মের কাছে আদর্শ। তার পর্দার প্রেম, হাসি, দুঃখ, ব্যক্তিত্ব এবং অভিনয় পৌঁছে গিয়েছিল বাংলাদেশের ঘরে ঘরে। একসময় কলকাতার সিনেমা ঢাকার প্রেক্ষাগৃহে চলেছে।

পরে সেটা বন্ধ হয়ে গেলেও কিন্তু তার সিনেমা মানুষ ঠিকই দেখেছে ভিসিআর কিংবা টেলিভিশনের পর্দায়। সীমানা বা নতুন নিয়ম দিয়ে তার প্রতি দর্শকের ভালোবাসা কমেনি। সময়ের সঙ্গে নতুন প্রজন্মও তাকে ভালোবেসেছে নতুন ভাবে। অভিনেতার অভিনয় দেখেছে প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিভিন্ন মাধ্যমে। উত্তম আজ না থাকলেও তিনি রয়েছেন দর্শকের মনে। আজকের দিনেও তাকে ভালোবেসে অনেকেই তার সিনেমা দেখবে কিংবা আয়োজন করে তাকে স্মরণ করবে।

আরো..