https://www.a1news24.com
২৪শে আগস্ট, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, বিকাল ৪:৫৭

ইমাম-উলামা পরিষদের আপত্তির মুখে কনসার্ট বন্ধ, কী বলছেন শিল্পীরা

দুই দিনের ব্যবধানে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও কিশোরগঞ্জে কনসার্ট বাতিলের ঘটনায় দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। কোনো পক্ষের আপত্তি বা হুমকির মুখে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়াকে শিল্পীরা দেখছেন সংস্কৃতিচর্চার স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার জন্য অশনিসংকেত হিসেবে।

শিল্পীদের মতে, কোনো অনুষ্ঠান নিয়ে আপত্তি থাকলে আলোচনা ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে সমাধান করা যেতে পারে। কিন্তু অনুষ্ঠান শুরুর আগে সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর তা বাতিল করা হলে শিল্পী, আয়োজক, যন্ত্রশিল্পী ও সংশ্লিষ্ট সবার আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি তৈরি হয় অনিশ্চয়তা।

সংগীত পরিচালক শেখ সাদী খান বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতসমৃদ্ধ এলাকায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধের ঘটনা সেখানকার ঐতিহ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তাঁর মতে, শব্দ নিয়ে আপত্তি থাকলে শব্দ কমিয়ে অনুষ্ঠান করার ব্যবস্থা করা উচিত, অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া নয়।

তিনি বলেন, সংস্কৃতি একটি জাতির পরিচয়ের অন্যতম ভিত্তি। তাই সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে কোনো গোষ্ঠী বা মহলের উগ্র আচরণের সুযোগ থাকা উচিত নয়। সরকারের প্রতি তাঁর আহ্বান, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার বিরুদ্ধে উচ্চপর্যায় থেকে স্পষ্ট ও কঠোর বার্তা দেওয়া হোক।

কণ্ঠশিল্পী সাবিনা ইয়াসমীনও ঘটনাগুলোকে উদ্বেগজনক বলে মনে করেন। তাঁর ভাষায়, একটি অনুষ্ঠান কারও পছন্দ না হলে সেটি না দেখার অধিকার তাঁর রয়েছে; কিন্তু পছন্দ না হওয়ার কারণে অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়ার যৌক্তিকতা নেই।

সাবিনা বলেন, কোনো সরকারি সংস্থার আপত্তি থাকলে অনুষ্ঠান আয়োজনের আগেই তা জানানো উচিত। সব প্রস্তুতি শেষ হওয়ার পর হঠাৎ অনুষ্ঠান বন্ধ করে দিলে শুধু শিল্পী নয়, আয়োজকসহ সংশ্লিষ্ট সবার বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতি হয়। এ ধরনের ঘটনা চলতে থাকলে শিল্পীদের মধ্যে হতাশা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হবে বলেও মনে করেন তিনি।

ব্যান্ড তারকা হামিন আহমেদ মনে করেন, কিশোরগঞ্জ ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়; গত কয়েক বছরে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে বাধা দেওয়ার প্রবণতা ধীরে ধীরে বেড়েছে। তাঁর মতে, অতীতে এ ধরনের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণেই একটি গোষ্ঠী আরও উৎসাহিত হয়েছে।

হামিনের দাবি, দুই জেলার সাম্প্রতিক ঘটনা দ্রুত, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। কোনো গোষ্ঠী আপত্তি বা হুমকি দিলেই প্রশাসনের দায়িত্ব অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া নয়; বরং শিল্পী, আয়োজক ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে অনুষ্ঠান নির্বিঘ্নে আয়োজন করাই প্রশাসনের দায়িত্ব।

তিনি আরও বলেন, দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ সংগীতের সঙ্গে যুক্ত ও সংগীতপ্রেমী। তাই ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো সংগীতের ঐতিহ্যবাহী এলাকায় কনসার্টকে ঘিরে এমন পরিস্থিতি তৈরি হওয়া অত্যন্ত বেদনাদায়ক।

কণ্ঠশিল্পী বেবী নাজনীনও মনে করেন, কনসার্ট বন্ধের ঘটনা শিল্পীদের নিরুৎসাহিত করতে পারে। তাঁর মতে, একজন শিল্পী, খেলোয়াড়, কবি বা অন্য যেকোনো পেশার মানুষ যেন নিরাপদে নিজের কাজ করতে পারেন, সেই পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

বেবী নাজনীন বলেন, শিল্পীদের আয়ের গুরুত্বপূর্ণ একটি উৎস হলো কনসার্ট। তাই বারবার অনুষ্ঠান বাতিল হলে তাঁদের পেশাগত ও আর্থিক ক্ষতি হবে। তিনি প্রতিটি ঘটনার গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান।

কণ্ঠশিল্পী নাজমুন মুনিরা ন্যান্‌সির মতে, কোনো একটি পক্ষ আপত্তি করলেই প্রশাসনের অনুষ্ঠান বাতিল করে দেওয়া উচিত নয়। কোনো আপত্তি যৌক্তিক কি না, তা যাচাই করে নিয়মশৃঙ্খলা মেনে সমাধান করতে হবে।

তিনি বলেন, একজনের ব্যক্তিগত অপছন্দের কারণে অন্যদের সাংস্কৃতিক অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে না। নাচ, গান, আবৃত্তি, অভিনয় ও যাত্রাপালার মতো শিল্পমাধ্যম দেশের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অংশ। তাই এগুলোকে টিকিয়ে রাখতে রাষ্ট্রের আরও দায়িত্বশীল ভূমিকা প্রয়োজন।

ন্যান্‌সির মতে, কোনো অনুষ্ঠানে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা বা হুমকি তৈরি হলে তা মোকাবিলা করে শিল্পী ও দর্শকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের দায়িত্ব। নিরাপত্তার অজুহাতে বৈধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেওয়া দীর্ঘমেয়াদে সংস্কৃতির জন্য ক্ষতিকর।

পাঁচ শিল্পীই মূলত একটি বিষয়ে একমত—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর আপত্তির কারণে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড থেমে থাকা উচিত নয়। বৈধ ও নিয়মতান্ত্রিক অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। তাঁদের প্রত্যাশা, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর তদন্তের পাশাপাশি ভবিষ্যতে যাতে আপত্তি বা হুমকির মুখে কনসার্ট বন্ধ করার প্রবণতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সরকার কার্যকর পদক্ষেপ নেবে।

আরো..