আন্তর্জাতিক ডেস্ক: বাংলাদেশি আখ্যা দিয়ে সীমান্ত পথে নারী-পুরুষ-শিশুদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়ার মধ্যেই ভারত এখন ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ দেশে ফেরত পাঠাতে ঢাকার ‘দ্রুত’ সহযোগিতা চাইছে।দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেছেন, বাংলাদেশে ঝুলে থাকা নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির প্রত্যাশা করে দিল্লি, যাতে ‘অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের’ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন করা যায়।
তিনি বলেন, ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী যে কোনো বিদেশি নাগরিককে আইন অনুযায়ী অবশ্যই তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো হবে।বৃহস্পতিবার নয়াদিল্লিতে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সাপ্তাহিক ব্রিফিংয়ে কথা বলছিলেন জয়সওয়াল। সম্প্রতি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় জয়ের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমানের মন্তব্য নিয়ে একটি প্রশ্নের জবাব দেন তিনি।
মুখপাত্র বলেন, “আমরা গত কয়েক দিন ধরে এই ধরনের (পুশব্যাক) কিছু মন্তব্য লক্ষ্য করেছি। এই মন্তব্যগুলোকে ভারত থেকে অবৈধ বাংলাদেশিদের প্রত্যাবাসনের মূল ইস্যুর প্রেক্ষিতে দেখা উচিত। এর জন্য অবশ্যই বাংলাদেশের সহযোগিতা প্রয়োজন।”
“আমরা আশা করি বাংলাদেশ এ বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে, যাতে ভারতে থাকা অবৈধ বিদেশি নাগরিকদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার মাধ্যমে এবং সুচারুভাবে পরিচালিত হতে পারে।”
ছাত্রজনতার অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের অগাস্টে আওয়ামী লীগের সরকার পতনের পর মুহাম্মদ ইউনূস নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্কের অবনতি হয়।
এরপর ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে অভিযান চালিয়ে সন্দেহভাজন অবৈধ অভিবাসীদের আটক করে তাদের ‘বাংলাদেশি’ আখ্যা দিয়ে সীমান্ত পথে বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া শুরু হয়।
এখন পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বিজেপির বড় বিজয়ের পর ভারত থেকে বাংলাদেশে আবার ‘পুশব্যাক’ বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। রাজ্যের প্রভাবশালী বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী এর আগেও একাধিকবার ‘অবৈধ বাংলাদেশিদের’ বাংলাদেশের দিকে ঠেলে পাঠানোর হুমকি দিয়েছেন।
সম্প্রতি আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মাও বাংলাদেশ নিয়ে বিরূপ মন্তব্য করেন।
১৫ এপ্রিল এবিপি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে হিমন্ত বিশ্ব শর্মা বলেন, “আমি সবসময় ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যেন ভারত ও বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নত না হয়। সে ক্ষেত্রে বিএসএফ ও সেনা সীমান্তে পাহারায় থাকে। তার ফলে অনুপ্রবেশকারীরা বাংলাদেশ থেকে আসতে পারে না। যখন সম্পর্ক ভালো থাকে, সেই সময়টা আসামের কাছে উদ্বেগের।”
সাক্ষাৎকারে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান মুহাম্মদ ইউনূসের প্রসঙ্গ টেনে আনেন হিমন্ত৷ তিনি বলেন, “ভগবানের কাছে প্রার্থনা করি, ইউনূসের সময় যে পরিস্থিতি ছিল, সেটাই যেন এখন থাকে।”
তার এই বক্তব্য নিয়ে ঢাকায় ভারতের ভারপ্রাপ্ত হাই কমিশনারকে তলবও করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
এসব বিষয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান মঙ্গলবার বলেন, “যখন আসামের মুখ্যমন্ত্রী কথাটি বলেছিলেন, স্বীকার করেছিলেন তিনি কিছু কাজ (পুশব্যাক) করেছেন, আপনারা দেখেছেন, আমরা সেটাতে কড়া প্রতিবাদ দিয়েছি। সে বিষয়ে যা যা ব্যবস্থা আমরা নেব।”
পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ওই বক্তব্যে জবাবে রণধীর জয়সওয়াল বিষয়টি নিয়ে বৃহস্পতিবার প্রতিক্রিয়া দেন। তিনি বলেন, “এই ধরনের মন্তব্যের প্রেক্ষাপটটি বোঝা আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ; আমাদের মূল সমস্যার দিকেই নজর দেওয়া উচিত। আমি ইতোমধ্যে অবৈধ বাংলাদেশি অভিবাসীদের তথ্য ভাগ করেছি, যা তাদের নাগরিকত্ব নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশকে দেওয়া হয়েছে, যাতে তাদের মসৃণভাবে প্রত্যাবাসন করা সম্ভব হয়।
“আপনারা জানেন যে আমাদের নীতি হল, দেশের মাটিতে অবৈধভাবে বসবাসকারী যে কোনো বিদেশি নাগরিককে আমাদের আইন, পদ্ধতি এবং প্রতিষ্ঠিত দ্বিপক্ষীয় ব্যবস্থা ও সমঝোতা অনুযায়ী অবশ্যই নিজ দেশে ফেরত পাঠাতে হবে। আমরা প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশ নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়াটি দ্রুত সম্পন্ন করবে, যাতে অবৈধ অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াটি নির্বিঘ্নে সম্পন্ন হয়।”
তার দাবি, ২ হাজার ৮৬০টির বেশি নাগরিকত্ব যাচাইয়ের মামলা বাংলাদেশের কাছে ঝুলে রয়েছে, যার মধ্যে বেশ কিছু মামলা পাঁচ বছরের বেশি সময় ধরে পড়ে আছে।
তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে আরেক এক প্রশ্নের জবাবে জয়সওয়াল বলেন, “ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে ৫৪টি অভিন্ন নদী রয়েছে। জল সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় নিয়ে আলোচনার জন্য আমাদের একটি সুসংগঠিত দ্বিপক্ষীয় কাঠামো রয়েছে এবং এই ব্যবস্থাগুলোর অধীনে নিয়মিত বিরতিতে বৈঠক অব্যাহত রয়েছে।”
সূত্র: দ্য হিন্দু, এএনআই, দ্য প্রিন্ট