ঐতিহ্য রক্ষায় জরুরি পদক্ষেপের দাবি স্থানীয়দের
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি: সংস্কার ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো ঐতিহাসিক জোড়া শিবমন্দির এখন ধ্বংসের ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয় ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ধর্মীয় ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ এই নিদর্শনটি দ্রুত সংরক্ষণ করা না হলে অচিরেই বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন এলাকাবাসী ও সচেতন মহল।
প্রাচীন এই জোড়া শিবমন্দির শুধু একটি ধর্মীয় উপাসনালয় নয়, বরং ফকিরহাট অঞ্চলের অতীত ঐতিহ্য, স্থাপত্যশৈলী এবং সামাজিক ইতিহাসের এক মূল্যবান সাক্ষ্য বহন করে চলেছে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এটি স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। কিন্তু সময়ের নির্মম আঘাত, প্রাকৃতিক ক্ষয় এবং দীর্ঘদিনের অবহেলায় আজ সেই ঐতিহ্যবাহী স্থাপনাটি চরম বিপর্যয়ের মুখোমুখি।
মন্দিরের গায়ে থাকা নামফলক সূত্রে জানা গেছে, ১১০৫ বঙ্গাব্দে এই জোড়া শিবমন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়। সে হিসেবে মন্দিরটির বয়স প্রায় তিন শতাব্দীরও বেশি। দীর্ঘ এই সময়ে বহু প্রজন্মের মানুষের স্মৃতি, বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠানের ধারক হয়ে রয়েছে এটি। প্রতি বছর চৈত্র সংক্রান্তিতে এখানে শিব পূজা, আরাধনা, প্রসাদ বিতরণ এবং বিভিন্ন ধর্মীয় অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। দূর-দূরান্ত থেকে ভক্তরা এসে অংশ নেন এসব আয়োজনে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—যে স্থাপনাটি মানুষের ভক্তি ও ঐতিহ্যের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে, সেই মন্দিরটির বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত নাজুক।
গতকাল রোববার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, মন্দিরের বাইরের দেয়ালে নোনা ধরেছে। ফলে দেয়ালের পলেস্তারা খসে খসে পড়ছে। জায়গায় জায়গায় ইট উন্মুক্ত হয়ে পড়েছে। টেরাকোটার সূক্ষ্ম কারুকাজ, যা একসময় মন্দিরটির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছিল, তা এখন ক্ষয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও অলঙ্করণ পুরোপুরি মুছে গেছে।
মন্দিরের কাঠের তৈরি প্রাচীন নকশা করা দরজাগুলোও ভেঙে পড়ার উপক্রম হয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কাঠে ঘুণ ধরেছে, দরজার কপাট ঢিলে হয়ে গেছে। সামান্য ঝড়-বৃষ্টিতেই তা ভেঙে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা স্থানীয়দের।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, মন্দিরের গম্বুজে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। ছাদের ফাঁক গলে বটগাছ ও বিভিন্ন আগাছা জন্ম নিয়েছে। এসব গাছের শেকড় মন্দিরের দেয়াল ও ছাদের ভেতরে প্রবেশ করে কাঠামোকে দুর্বল করে তুলছে। ফলে যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।
মন্দিরের অভ্যন্তরে থাকা দুটি শিবলিঙ্গও যথাযথ সংরক্ষণ ও নিরাপত্তার বাইরে রয়েছে। বৃষ্টির পানি চুঁইয়ে পড়া, ধুলাবালি জমা এবং অবহেলার কারণে সেগুলোরও ক্ষতি হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সমির চক্রবর্তী বলেন, “এই মন্দির আমাদের এলাকার গর্ব। ছোটবেলা থেকে দেখে আসছি এখানে পূজা হয়, মেলা হয়, মানুষ আসে। কিন্তু এখন মন্দিরের যে অবস্থা, তা দেখে খুব কষ্ট লাগে। দ্রুত সংস্কার না করলে এটি আর টিকবে না।”
অরবিন্দু দাস বলেন, “সরকার যদি একটু নজর দিত, তাহলে এতদিনে মন্দিরটি রক্ষা পেত। স্থানীয় মানুষ নিজেরা সামান্য রং করে দেয়, পরিষ্কার রাখে, কিন্তু বড় ধরনের সংস্কার তো আমাদের পক্ষে সম্ভব না।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব থাকা সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দৃশ্যমান নয়। মাঝে মধ্যে কিছু মানুষ স্বেচ্ছাশ্রমে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা করলেও তা স্থাপনাটি রক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জরুরি সংস্কার, সংরক্ষণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ।
মন্দিরের পুরোহিত বিষ্ণুপদ চক্রবর্তী বলেন, “এখানে নিয়মিত শিব পূজাসহ বিভিন্ন পূজা-অর্চনা হয়। প্রতিদিন ভক্তরা দর্শনে আসেন। কিন্তু মন্দিরের অবস্থা দিন দিন খারাপ হচ্ছে। আমরা খুব চিন্তিত। দ্রুত সংস্কার না করলে এটি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।”
ঐতিহ্য সচেতন ব্যক্তিরা বলছেন, বাগেরহাট ঐতিহাসিক স্থাপনার জন্য দেশজুড়ে পরিচিত। ষাট গম্বুজ মসজিদ, খানজাহান আলীর মাজার, প্রাচীন দীঘি ও নানা নিদর্শনের পাশাপাশি ফকিরহাটের এই জোড়া শিবমন্দিরও গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বহন করে। অথচ যথাযথ তালিকাভুক্তি ও সংরক্ষণের অভাবে এটি উপেক্ষিত হয়ে আছে।
তাদের মতে, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আওতায় এনে মন্দিরটিকে জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। প্রথম ধাপে কাঠামোগত জরিপ, ফাটল মেরামত, গাছের শেকড় অপসারণ, টেরাকোটা পুনরুদ্ধার এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা উচিত। পরবর্তীতে এটি পর্যটন সম্ভাবনাময় স্থান হিসেবেও গড়ে তোলা যেতে পারে।
স্থানীয় সচেতন মহলের ভাষ্য, একটি প্রাচীন স্থাপনা ধ্বংস হওয়া মানে শুধু ইট-পাথরের ক্ষতি নয়; হারিয়ে যায় একটি জনপদের ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও পরিচয়। তাই এই জোড়া শিবমন্দির রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া সময়ের দাবি।
এ বিষয়ে বাগেরহাট প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের কাস্টোডিয়ান মো. যায়েদ বলেন, “বিষয়টি সরেজমিন পরিদর্শন শেষে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হবে।”
এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এবং শতবর্ষের সাক্ষী এই ঐতিহ্যবাহী জোড়া শিবমন্দিরকে ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা করবে।