টাকার বিনিময়ে মূল ট্রলার ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ বন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সুন্দরবন থেকে ফিরে:দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের পূর্ব বন বিভাগের নিষিদ্ধ অভয়ারণ্য এলাকায় অবৈধ উপায়ে কাঁকড়া শিকারের সময় দুই জেলেকে আটক করেছে বন বিভাগ। এসময় কাঁকড়া ধরার কাজে ব্যবহৃত দুটি নৌকা ও বিপুল পরিমাণ নিষিদ্ধ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। তবে অভিযানের পর জব্দ হওয়া কাঁকড়া বোঝাই মূল ট্রলার ও এর মালিকসহ কয়েকজন প্রভাবশালী জেলেকে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে ছেড়ে দেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের কিছু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে।
শনিবার সন্ধ্যায় সুন্দরবনের শেলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন নিষিদ্ধ শেলার খালে এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। রোববার দুপুরে আটক দুই জেলের বিরুদ্ধে বন আইনে মামলা দায়ের শেষে তাদের বাগেরহাট আদালতে পাঠানো হয়েছে।
স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় বছরের নির্দিষ্ট সময় অভয়ারণ্য এলাকায় সব ধরনের প্রবেশ ও বনজ সম্পদ আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকে। কিন্তু সরকারের এই নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে একদল অসাধু চোরা শিকারি শেলা টহল ফাঁড়ি সংলগ্ন নিষিদ্ধ খালে প্রবেশ করে অবৈধভাবে কাঁকড়া শিকার করছিল।
তারা খালের বিভিন্ন পয়েন্টে ‘চারো’ নামে পরিচিত বাঁশ ও জাল দিয়ে তৈরি বিশেষ ফাঁদ পেতে নির্বিচারে কাঁকড়া ধরছিল। এতে সুন্দরবনের পরিবেশ ও জলজ প্রাণীর প্রজনন মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শনিবার সন্ধ্যায় শেলা টহল ফাঁড়ির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান ও ফরেস্ট গার্ড আলাউদ্দিনের নেতৃত্বে বন বিভাগের একটি দল অভিযান চালায়। বন বিভাগের নৌযান খালের মুখে পৌঁছালে অবৈধ শিকারিরা পালানোর চেষ্টা করে। পরে চারদিক থেকে ঘেরাও করে সোহান শেখ ও ডালিম শেখ নামে দুই জেলেকে হাতেনাতে আটক করা হয়।
স্থানীয় জেলেদের দাবি, এসময় ঘটনাস্থল থেকে কাঁকড়া শিকারের কাজে ব্যবহৃত দুটি নৌকা, সাড়ে তিন শতাধিক নিষিদ্ধ চারো এবং কাঁকড়া বোঝাই একটি বড় ইঞ্জিনচালিত ট্রলার জব্দ করা হয়। আটক দুই জেলের বাড়ি রামপাল উপজেলার পেড়িখালী এলাকায়।
তবে অভিযান সফল হওয়ার পরই শুরু হয় ভিন্ন নাটকীয়তা। স্থানীয়দের অভিযোগ, জব্দ হওয়া কাঁকড়া বোঝাই মূল ট্রলারটি রামপাল উপজেলার পেড়িখালী এলাকার প্রভাবশালী কাঁকড়া ব্যবসায়ী শাহাদৎ মোড়লের মালিকানাধীন বলে শনাক্ত করা হয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকার একাধিক বাসিন্দা ও জেলেরা অভিযোগ করেন, ট্রলারটি ফাঁড়িতে আনার পর থেকেই শুরু হয় তদবির ও দেনদরবার। পরে গভীর রাতে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে শাহাদৎ মোড়লের কাঁকড়া বোঝাই ট্রলার এবং এর সঙ্গে থাকা কয়েকজন মূল অভিযুক্তকে ছেড়ে দেওয়া হয়। পুরো ঘটনাটি ধামাচাপা দিতে শুধুমাত্র দুই সাধারণ দিনমজুর জেলে সোহান ও ডালিমকে আটক দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
এ ঘটনায় সুন্দরবন সংলগ্ন মোংলা ও রামপাল এলাকার সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বন ধ্বংসের মূল হোতারা অর্থের জোরে বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে, অথচ দরিদ্র জেলেদেরই আইনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনের নেতারা গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, সুন্দরবনের অভয়ারণ্য রক্ষা করা বন বিভাগের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। কিন্তু রক্ষকরাই যদি টাকার বিনিময়ে অপরাধীদের ছেড়ে দেয়, তবে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও অস্তিত্ব ভয়াবহ হুমকির মুখে পড়বে। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত দাবি করেছেন।
তবে শেলা টহল ফাঁড়ির দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মিজানুর রহমান আর্থিক লেনদেন কিংবা কাঁকড়া বোঝাই ট্রলার এবং মূল অভিযুক্ত শাহাদৎ মোড়লকে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, জব্দকৃত আলামত ও আটক আসামিদের বিরুদ্ধে বন আইনে যথাযথ মামলা দায়ের করে আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।
তবে জব্দ তালিকায় কাঁকড়া বোঝাই মূল ট্রলারের উল্লেখ না থাকার বিষয়ে বন বিভাগের কর্মকর্তারা কোনো সন্তোষজনক ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।