https://www.a1news24.com
৩রা অক্টোবর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ, সন্ধ্যা ৬:৫০

দুর্দিনে রংপুরের কাউনিয়ার বাদ্যযন্ত্র কারিগররা, পূজার মৌসুমেও নেই কাজ

সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ দরজার সামনে বসে কাঠের গায়ে শেষ আঁচড় দিচ্ছিলেন এক কারিগর। পাশে পড়ে আছে তৈরি করা কয়েকটি ঢোল, খোল ও বাদ্যযন্ত্রের কাঠামো। দোকানের তাকজুড়ে সাজানো নানা ধরনের দেশীয় বাদ্যযন্ত্র। অথচ যে মৌসুমে এসব বাদ্যযন্ত্র তৈরির ব্যস্ততায় কারিগরদের দম ফেলার সময় থাকার কথা, সেই দূর্গাপূজার সময়ও যেন নেমে এসেছে নীরবতা।

এ চিত্র রংপুরের কাউনিয়ার বাদ্যযন্ত্র তৈরির কারিগরদের। একসময় পূজা, বিয়ে, পালাগান, যাত্রা কিংবা লোকসংগীতের আসর মানেই ছিল ঢাক-ঢোল ও দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের কদর। এখন আধুনিক বাদ্যযন্ত্র, ডিজিটাল মিউজিক এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন কমে যাওয়ায় সেই চাহিদা অনেকটাই কমেছে। ফলে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এই পেশায় থাকা পরিবারগুলো পড়েছে অনিশ্চয়তায়।

কাউনিয়ার রংপুর-কুড়িগ্রাম সড়কের ‘শিবু তাল তরঙ্গ’ দোকানের কারিগর সুবাস চন্দ্র দাস প্রায় ২৫ বছর ধরে বাদ্যযন্ত্র তৈরি করছেন। তার পরিবার এ পেশায় রয়েছে প্রায় ৩০ বছর। তিনি বলেন, দূর্গাপূজার সময় আগে ৩০ থেকে ৩৫টি কাজ পাওয়া যেত। কিন্তু এবার এখন পর্যন্ত ১০টি কাজও পাননি। তার কথায়, “আগে সারা বছরই কমবেশি কাজ থাকত। এখন অনেক সময় বসে থাকতে হয়। পূজার সময়ও কাজ কম।”

আরেক কারিগর শিবু চন্দ্র দাস জানান, এক যুগ আগেও বর্ষাকাল ছাড়া প্রায় সারা বছর তাদের ব্যস্ততা থাকত। বর্তমানে মাঝে মধ্যে শুধু খোল তৈরি বা পুরোনো বাদ্যযন্ত্র মেরামতের কাজ আসে। শুধু কারিগরদের আয় কমেনি, এর সঙ্গে কমেছে লোকসংগীতের অনেক আয়োজনও।

কণ্ঠশিল্পী সতীশ চন্দ্র বলেন, রংপুরের ভাওয়াইয়া, পল্লীগীতি, বাউল, কবিগান ও পালাগানের আসর আগের মতো চোখে পড়ে না। এসব আয়োজন কমে যাওয়ায় হাতে তৈরি বাদ্যযন্ত্রের চাহিদাও কমেছে।তিস্তা ডিগ্রি কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক আঃ ছালাম বলেন, গ্রামগঞ্জে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কমে যাওয়ায় দেশীয় বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহারও কমেছে। এসব বাদ্যযন্ত্র টিকিয়ে রাখতে সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার পাশাপাশি আধুনিকায়ন প্রয়োজন।

কাউনিয়ার সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনছার আলী জানান, বর্তমানে উপজেলায় মাত্র দুটি দোকানে ৪ থেকে ৬ জন কারিগর বাদ্যযন্ত্র তৈরির সঙ্গে যুক্ত আছেন। উদ্যোগ নেওয়া না হলে ঐতিহ্যবাহী এসব বাদ্যযন্ত্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে শুধু স্মৃতি হয়ে থাকতে পারে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পাপিয়া সুলতানা বলেন, আধুনিকতার কারণে ঢাক-ঢোল, তবলা, একতারা ও দোতারার চাহিদা কমেছে। কারিগরদের জীবনমান উন্নয়নে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিশেষ ভাতার ব্যবস্থা করার চেষ্টা করা হবে।

কাউনিয়ার এসব কারিগরের কাছে বাদ্যযন্ত্র শুধু একটি পণ্য নয় এটি তাদের পারিবারিক ঐতিহ্য ও জীবিকার অংশ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই ঐতিহ্যের বাজার সংকুচিত হচ্ছে। পূজার ঢাকের শব্দ হয়তো এখনও শোনা যায়, কিন্তু সেই ঢাক তৈরির কারিগরের জীবনে আগের মতো ব্যস্ততার শব্দ নেই।

আরো..