সারওয়ার আলম মুকুল, কাউনিয়া (রংপুর) প্রতিনিধি ঃ মৌসুমের শুরুতে পাটের বাজারে ভালো দাম থাকলেও কাঁচা পাট রপ্তানিতে বিধিনিষেধ, পাটকলগুলোর চাহিদা কমে যাওয়া এবং বাজারে প্লাস্টিকের আধিপত্যে রংপুরের কাউনিয়ায় পাটের দামে ধস নেমেছে। উৎপাদন খরচ বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় লোকসানের আশঙ্কায় পড়েছেন প্রান্তিক পাটচাষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। এতে একসময়ের সোনালি আঁশের সুদিন ফেরার সম্ভাবনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
স্থানীয় বাজার সূত্রে জানা গেছে, মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৫ হাজার ২০০ থেকে ৫ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হলেও বর্তমানে গুণগত মানভেদে তা নেমে এসেছে ৪ হাজার ৫০০ থেকে ৪ হাজার ৮০০ টাকায়। ব্যবসায়ী শাজাহান বাদশা জানান, বড় পাটকলগুলো পর্যাপ্ত পাট না কেনায় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা সংগৃহীত পাট বিক্রি করতে পারছেন না। ফলে তাঁদের পুঁজি আটকে যাচ্ছে এবং ব্যবসায়িক লোকসানের ঝুঁকি বাড়ছে।
কৃষক আলামিন জানান, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীদের প্রভাবের কারণে কৃষকেরা ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। কাঁচা পাটের সঠিক দাম নিশ্চিত করতে ডিজিটাল প্রকিউরমেন্ট ও মূল্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হলেও কাউনিয়ার কৃষকেরা এর সুফল পাচ্ছেন না। কৃষকদের তথ্যমতে, সার, বীজ, শ্রমিকের মজুরি, সেচ ও পাট জাগ দেওয়ার খরচ বেড়ে যাওয়ায় বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় আগের তুলনায় প্রায় ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেড়েছে। অথচ বর্তমান বাজারদরে উৎপাদন খরচ তুলতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে তাঁদের।
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সাইয়েদুল জানান, পণ্যে পাটের মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করার আইন থাকলেও মাঠপর্যায়ে প্লাস্টিক ও পলিথিনের অবাধ ব্যবহার চলছে। ফলে পাটের তৈরি ব্যাগ ও মোড়কের চাহিদা কমছে। অন্যদিকে কৃত্রিম ফাইবারের আধিক্য এবং পুরোনো প্রযুক্তির কারণে দেশীয় পাটশিল্পও প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে।
পাট খাতের উন্নয়নে সরকার ২ হাজার ৩২০ কোটি টাকার বিশেষ তহবিল বা প্রকল্প অনুমোদন করেছে। এর আওতায় রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলের রপ্তানিমুখী বহুমুখী পাটপণ্য উৎপাদনকারী ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য ২৫০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি পাটচাষিদের বিনামূল্যে উচ্চফলনশীল বীজ, সার ও প্রশিক্ষণ দেওয়ার উদ্যোগ রয়েছে। তবে এসব উদ্যোগের সুফল কাউনিয়ার প্রান্তিক চাষিদের কাছে কতটা পৌঁছেছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
কৃষি কর্মকর্তা মোঃ সালাহউদ্দিন জানান, চলতি মৌসুমে খরা, অতিবৃষ্টি ও বন্যায় পাটের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয়েছে। প্রতিকূল আবহাওয়ায় অনেক কৃষক নির্ধারিত সময়ের আগেই পাট কাটতে বাধ্য হয়েছেন। এতে গাছের উচ্চতা স্বাভাবিকের তুলনায় ২ থেকে ৫ ফুট কমেছে এবং বিঘাপ্রতি ফলন ২ থেকে ৪ মণ পর্যন্ত কমেছে। গংশ্লিষ্টদের মতে, পাটের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে বাজার ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, পাটকলগুলোর ক্রয় সক্ষমতা বৃদ্ধি, কাঁচা পাট রপ্তানির নীতিগত স্থিতিশীলতা এবং পাটজাত পণ্যের ব্যবহার বাড়াতে কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।