যুক্তরাষ্ট্রকে ঘিরে নতুন আশঙ্কা
ইরানে যুদ্ধ পরিস্থিতির মধ্যে সাধারণ নাগরিকদের সামরিকভাবে সংগঠিত করার উদ্যোগ নতুন পর্যায়ে পৌঁছেছে। ‘জনফাদা’ নামে পরিচিত এই অভিযানের আওতায় নারীসহ স্বেচ্ছাসেবীদের সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হয়েছে। তেহরানের ইমাম হোসেইন চত্বরে ইতোমধ্যে একটি প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু করা হয়েছে। সেখানে প্রশিক্ষণের অংশ হিসেবে গুলি চালানো, অস্ত্র ব্যবহারের প্রাথমিক শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম ব্যবহারের প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে।
ইরানের সরকারি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, জনফাদা অভিযানে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা ৩১ মিলিয়নে পৌঁছেছে। আয়োজকদের দেওয়া হিসাবে নিবন্ধনকারীদের প্রায় ৩২ শতাংশ নারী এবং ৬৮ শতাংশ পুরুষ। তাদের মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি মানুষের বয়স ৪৬ বছরের নিচে। নিবন্ধনকারীদের ২৬ শতাংশ সামরিক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত কাজে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। অন্যরা উদ্ধারকাজ, সামাজিক সেবা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড এবং আর্থিক সহায়তার মতো বিভিন্ন ক্ষেত্রে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন।
তবে এই ৩১ মিলিয়নের হিসাব নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন রয়েছে। স্বাধীনভাবে করা একটি প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে দাবি করা হয়েছে, নিবন্ধন ব্যবস্থায় চার মিলিয়নেরও কম স্বতন্ত্র ও বৈধ ব্যবহারকারী শনাক্ত করা গেছে। ফলে ৩১ মিলিয়ন মানুষের নিবন্ধনের সরকারি দাবি সরাসরি মোট সক্রিয় বা সামরিকভাবে প্রশিক্ষণ নেওয়া মানুষের সংখ্যা হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। অর্থাৎ এখানে নিবন্ধন, অংশগ্রহণ এবং বাস্তবে প্রশিক্ষণে যোগ দেওয়া মানুষের সংখ্যা আলাদা করে দেখা জরুরি।
সামরিক প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া মানুষের সংখ্যার ক্ষেত্রেও বিভিন্ন সংখ্যা পাওয়া যাচ্ছে। ইরানের আয়োজকেরা তেহরানে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষ সামরিক প্রশিক্ষণের জন্য নিবন্ধন করেছেন বলে জানিয়েছে। ইউরোপীয় সংবাদ সংস্থার সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রায় পাঁচ লাখ অংশগ্রহণকারীকে নিয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু হয়েছে। ফলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছয় লাখ প্রশিক্ষণার্থীর সংখ্যা এখন পর্যন্ত স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া সংখ্যা নয়।
জনফাদা অভিযানের সাম্প্রতিক পরিবর্তনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি এখন শুধু জনসমর্থন দেখানোর কর্মসূচি হিসেবে সীমাবদ্ধ নেই। ইরানের বাসিজ বাহিনীর তত্ত্বাবধানে স্বেচ্ছাসেবীদের বিভিন্ন স্তরে প্রশিক্ষণ ও সংগঠিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আয়োজকেরা এক হাজার জাতীয় প্রতিরোধ ব্যাটালিয়ন গঠনের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন। প্রশিক্ষণকে প্রাথমিক, মধ্যবর্তী ও উন্নত—এই তিন স্তরে ভাগ করার কথাও বলা হয়েছে।
নারীদের জন্যও আলাদা প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ইরানের সরকারি সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, নারীরাও এসব প্রশিক্ষণে অংশ নিতে পারবেন এবং তাদের জন্য পৃথক প্রশিক্ষণ পরিকল্পনা রাখা হয়েছে। অন্যদিকে ইরানভিত্তিক একটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নারীদের জন্য বিশেষায়িত প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থাও করা হয়েছে। তেহরান প্রদেশে বিপুলসংখ্যক নারীর অংশগ্রহণে সামরিক মহড়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৮ সেপ্টেম্বর তেহরানে জনফাদা অভিযানের বড় একটি সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। ইরানের সরকারি সূত্র এটিকে তিন লাখ ১৩ হাজার মানুষের মহড়া হিসেবে উল্লেখ করেছে। সেখানে নারী, তরুণ এবং বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ অংশ নেন। অংশগ্রহণকারীদের একটি অংশ সামরিক পোশাক পরে এবং অস্ত্র হাতে মিছিলে অংশ নেয়। সরকারি প্রচারণায় এই আয়োজনকে দেশের প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং জনগণের প্রস্তুতির প্রতীক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে।
এরপর ২৫ সেপ্টেম্বর তেহরানে হাজার হাজার মোটরসাইকেল আরোহীর আরেকটি বড় কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এটিও জনফাদা অভিযানের অংশ হিসেবে আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে নিরাপত্তা বাহিনী, বাসিজ সদস্য, সাধারণ নাগরিক এবং বিভিন্ন বয়সের মানুষ অংশ নেন। আয়োজকদের বক্তব্য অনুযায়ী, এই কর্মসূচির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় প্রতিরক্ষার জন্য জনগণের প্রস্তুতি প্রদর্শন করা।
২৩ সেপ্টেম্বর তেহরানে প্রথম জনফাদা সামরিক প্রশিক্ষণকেন্দ্র চালু হওয়ার পর পরিস্থিতি আরও স্পষ্ট হয়েছে। সেখানে প্রশিক্ষণের জন্য নির্দিষ্ট অবকাঠামো তৈরি করা হয়েছে এবং ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য শহর ও প্রদেশেও একই ধরনের কেন্দ্র চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের মধ্যে স্থানীয় নিরাপত্তা, যুদ্ধকালীন প্রস্তুতি, পর্যবেক্ষণ, উদ্ধারকাজ এবং অস্ত্র ব্যবহারের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই উদ্যোগের পেছনে ইরানের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। একটি মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জনফাদা কর্মসূচি শুধু বিদেশি হামলা মোকাবিলার প্রস্তুতি নয়, বরং যুদ্ধকালীন সময়ে অভ্যন্তরীণ সমর্থন সংগঠিত করারও একটি ব্যবস্থা। একই বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাসিজের নেতৃত্বে এই কর্মসূচির বিস্তার নিয়ে ইরানের সরকারি কাঠামোর ভেতরেও কিছু উদ্বেগের কথা উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগ স্বাধীনভাবে সম্পূর্ণভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সামরিক উত্তেজনাও অব্যাহত রয়েছে। সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে দুই দেশের মধ্যে পরোক্ষ আলোচনার খবর পাওয়া গেছে। আলোচনায় হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেওয়া, মার্কিন অবরোধ শিথিল করা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে সমঝোতার বিষয় উঠে এসেছে। অর্থাৎ একদিকে সামরিক প্রস্তুতি বাড়ছে, অন্যদিকে কূটনৈতিক যোগাযোগও চালু রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ইরানে নতুন করে বড় ধরনের হামলা হতে পারে—এই আশঙ্কার কিছু ভিত্তি আছে, তবে এটিকে নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক হবে না। রয়টার্সের ২ সেপ্টেম্বরের প্রতিবেদনে চারজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বরাত দিয়ে বলা হয়েছিল, যুক্তরাষ্ট্রের প্রশাসনের কিছু কর্মকর্তা ৩ নভেম্বরের নির্বাচনের পর সামরিক তৎপরতা বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন। একই প্রতিবেদনে স্পষ্ট করা হয়, পূর্ণমাত্রার সংঘাত আবার শুরু হবে—এমন সিদ্ধান্ত তখন নেওয়া হয়নি।
পরবর্তী সময়ে প্রকাশিত আরেক প্রতিবেদনে দেখা যায়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে এবং নভেম্বরের নির্বাচনের পর পরিস্থিতি কোন দিকে যাবে তা নিয়ে ওয়াশিংটনে আলোচনা চলছে। তবে এটিও নিশ্চিত করে না যে নির্বাচনের পর অবশ্যই বড় ধরনের হামলা শুরু হবে। বরং কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনাও একই সময়ে সক্রিয় রয়েছে।
ইরানে স্থল অভিযান চালানোর আশঙ্কার কথাও বিভিন্ন মহলে আলোচিত হয়েছে। কিন্তু বর্তমান নির্ভরযোগ্য তথ্যের ভিত্তিতে যুক্তরাষ্ট্র স্থলবাহিনী নিয়ে বড় আকারের অভিযান শুরু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে—এমন নিশ্চিত প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। বরং সাম্প্রতিক আলোচনায় কূটনৈতিক সমাধানের পথ খোলা রাখার কথাও এসেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ২৮ সেপ্টেম্বরও যুদ্ধ দ্রুত শেষ করার বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন এবং মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে যোগাযোগ চলার কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী জানিয়েছে, ইরানের বিরুদ্ধে নতুন হামলা হলে তারা কঠোর জবাব দেবে। সাম্প্রতিক সময়ে হরমুজ প্রণালিকে কেন্দ্র করে সংঘাত, জাহাজ চলাচলে বাধা, অর্থনৈতিক অবরোধ এবং পাল্টাপাল্টি সামরিক হুমকি পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
সব মিলিয়ে জনফাদা অভিযানের সাম্প্রতিক বিস্তার ইরানে বেসামরিক জনগণকে যুদ্ধকালীন প্রস্তুতির সঙ্গে যুক্ত করার একটি বড় উদ্যোগে পরিণত হয়েছে। সরকারি হিসাবে নিবন্ধনকারীর সংখ্যা কয়েক কোটি হলেও সেই সংখ্যা বাস্তবে সক্রিয় সদস্য বা প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত মানুষের সংখ্যা বোঝায় না। প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে পাঁচ লাখের মতো সংখ্যার দাবি পাওয়া গেলেও ছয় লাখের সংখ্যা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত নয়। নারীদের সামরিক প্রশিক্ষণের বিষয়টি অবশ্য সাম্প্রতিক কার্যক্রম ও সরকারি ঘোষণায় স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ইরান একই সময়ে দুটি পথে এগোচ্ছে। একদিকে সাধারণ মানুষকে সংগঠিত করে প্রতিরক্ষা প্রস্তুতি বাড়ানো হচ্ছে, অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে পরোক্ষ আলোচনার পথও খোলা রাখা হয়েছে। নভেম্বরের মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর সামরিক তৎপরতা বাড়তে পারে—এমন আলোচনা থাকলেও তা এখনো সম্ভাবনা ও নীতিগত বিবেচনার পর্যায়ে রয়েছে। তাই ‘নির্বাচনের পর নিশ্চিত হামলা’ কিংবা ‘নিশ্চিত স্থল অভিযান’ হিসেবে বিষয়টি তুলে ধরা তথ্যগতভাবে যথাযথ হবে না।